দেখে নিন ইংরেজিতেও রচনা

বাংলার কৃষক রচনা [PDF]

আমাদের কৃষি নির্ভর দেশে কৃষকদের বর্তমান অবস্থা কেমন? অর্থনীতিতে তাদের কতখানি অবদান? আমাদের বাংলার কৃষকরা অর্থনৈতিক অবস্থার দিক দিয়ে কতখানি স্বচ্ছল? তাদের কৃষি কাজে বিভিন্ন সমস্যা গুলি কি ও তার সমাধান কি হতে পারে , তা নিয়েই আমাদের আজকের বিষয় বাংলার কৃষক রচনা।

বাংলার কৃষক প্রবন্ধ রচনা বৈশিষ্ট্য চিত্র

ভূমিকা:

ছোটবেলা পড়াশোনার সময় আমরা সাধারণ জ্ঞানের বইতে বেশকিছু সম্প্রদায়ের মানুষকে সমাজ বন্ধু হিসেবে চিনেছিলাম। সমাজ বন্ধুদের সেই তালিকায় সবার আগে যে সম্প্রদায়ের নাম উঠে আসে তারা হল কৃষক। কৃষকরা হলেন আমাদের সমাজের ভিত্তি। তাদের কাঁধে ভর করেই সমগ্র সমাজের প্রাথমিক প্রয়োজন মেটে।

কৃষকরা যে ফসল ফলান সেই ফসলের ওপর নির্ভর করেই সমগ্র সভ্যতা জীবন ধারণ করে, মানুষ প্রাণ আহরণ করে; আবার সেই কৃষকদের ফসলই মানুষের লজ্জা নিবারণের বস্ত্র তৈরিতেও কাজে লাগে। তাই কৃষকদের অবদান আমাদের জীবনে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি।

অন্যদিকে আমাদের মাতৃভূমি বাংলা চিরকালই সেই কৃষকদের স্নেহের লালন ক্ষেত্র। সে কারণে এই বাংলার বুকে দাঁড়িয়ে বাংলার কৃষকদের নিয়ে এক চিলতে আলোচনা সর্বকালেই প্রাসঙ্গিক।

বাংলা ও কৃষক সমাজ:

বাংলার কৃষক সমাজের চরিত্র বরাবরই উপমহাদেশের অন্যান্য অংশের তুলনায় কিছুটা আলাদা। উপমহাদেশের এই অংশে কৃষক প্রকৃতই সমাজের বন্ধু হিসেবে একেবারে অবস্তুবাদী জীবন ধারণ করে থাকে। বাংলার কৃষক সচরাচর ব্যবসায় লিপ্ত হয় না; বলা ভালো সে তার অতি সরল চরিত্রের বশবর্তী হয়ে ব্যাবসায়িক জটিলতা থেকে দূরত্ব বজায় রাখে।

বাংলার কৃষক সাধারণত ক্ষুদ্র ও মাঝারি মাপের কৃষক হিসেবে পরিচিতি পায়। বিশাল আকার জমি কৃষিশ্রমিকের মাধ্যমে চাষ করানো বাংলার কৃষকের সাধারণ চরিত্রের মধ্যে পড়ে না। তারা নিজের জমি নিজের হাতে চাষ করতে ভালোবাসে, তারা ভালোবাসে নিজের খাদ্যদ্রব্য যথাসম্ভব নিজে উৎপাদন করতে।

অন্যদিকে সাধারণ বাঙালিও বাংলার কৃষক সমাজের প্রতি যথেষ্ট আবেগপ্রবণ। তারা কৃষকদের ততখানিই শ্রদ্ধা করে যতখানি তাদের প্রাপ্য। এইভাবে আম বাঙালি ও বাংলার সাধারণ কৃষকের মধ্যে পারস্পারিক মানবিক বন্ধন গড়ে উঠে বাংলার কৃষির চাকা নিরন্তর সচল থাকে। 

বাঙালির কৃষি:

বাংলার কৃষক সমাজ সম্পর্কে জানতে গেলে সর্বপ্রথম বাঙালির কৃষি সম্পর্কে আলোচনা করা প্রয়োজন। ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যান্য অংশের মতো বাংলার বুকেও বিভিন্ন প্রকারের কৃষিকাজ দেখা যায়। এখানকার কৃষকেরা এক ফসলি, দুই ফসলি এবং বহু ফসলি জমিতে বিভিন্ন কৃষিজ দ্রব্যের চাষ করে থাকেন। তবে বাংলার অন্যতম প্রধান উৎপাদিত ফসল হলো ধান ও পাট।

গাঙ্গেয় পলি দ্বারা বাংলার ভূমি অতি উর্বর হওয়ার কারণে এখনকার অসংখ্য কৃষক বাঙালির প্রধান খাদ্যশস্য ধান এবং কৃষি তন্তু পাট উৎপাদনে উৎসাহিত হয়ে থাকেন। তাছাড়াও বাংলার বুকে সারা বছর জুড়েই বিভিন্ন প্রকার সবজির চাষও হয়ে থাকে। বাঙালির কৃষিতে জলের অভাব জনিত সমস্যারও খুব একটা সম্মুখীন হতে হয় না। তার প্রধান কারণ হলো বাংলার নদীমাতৃক চরিত্র।

বাংলার কৃষকেরা কৃষির জন্য প্রয়োজনীয় জল সাধারণত নদী থেকেই সংগ্রহ করে থাকেন। এছাড়া ভূ-প্রকৃতিগত দিক থেকে বাংলা বৈচিত্র্যময় হওয়ার কারণে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে নানা প্রকারের ফসলের চাষ দেখা যায়। যেমন বাংলার দক্ষিনে সামুদ্রিক উপকূল অঞ্চলের মাটিতে নারকেল, কাজুবাদাম ইত্যাদির চাষ দেখা যায়। অন্যদিকে উত্তরে পাহাড়ি পাথুরে জমিতে বাংলার কৃষকেরা চা-এর নতুন অর্থকরী ফসলের চাষ করে থাকেন। 

বাংলার কৃষি এবং অর্থনীতি:

বাংলার সামগ্রিক অর্থনীতি বহুলাংশে কৃষির উপর নির্ভর করে থাকে। সমগ্র ভারতবর্ষে ধান এবং পাট চাষে বাংলা বাংলা প্রথম স্থান অধিকার করেছে। প্রতিবছর বাংলার মানুষের প্রাথমিক প্রয়োজন মিটিয়ে লক্ষ লক্ষ কুইন্টাল ধান সমগ্র ভারতে রপ্তানি করা হয়। এছাড়া বাংলার বুকে উৎপাদিত কৃষিতন্তু পাট সমগ্র ভারতবর্ষের বিভিন্ন পাটনির্ভর শিল্প ক্ষেত্রগুলিকে কাঁচামাল সরবরাহ করে।

এছাড়া বাংলা প্রতিবছর প্রচুর পরিমাণে আলু ভারতের বিভিন্ন অংশে রপ্তানি করে থাকে। তাছাড়া বাংলার উত্তরে পাহাড়ি অঞ্চলে উৎপাদিত হওয়া দার্জিলিংয়ের চা স্বাদে ও গন্ধে পৃথিবী বিখ্যাত। এই চা রপ্তানি করে প্রতিবছর বাংলা বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা লাভ করে থাকে।

এইভাবে কৃষিদ্রব্যকে ব্যবহার করে বাংলার অর্থনীতি ব্যাপকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। আর এই কৃষিদ্রব্যগুলিকে সার্থকভাবে ফলানোর পিছনে সর্বাত্মক অবদান যাদের, তারা হলেন বাংলার কৃষক। তাই একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে বাংলার কৃষকেরা বহুলাংশে বাংলার অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। 

আধুনিক যুগে বাংলার কৃষক:

বাংলার কৃষকেরা সাধারণ ঐতিহ্যগতভাবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি মাপের কৃষক হলেও বর্তমানে বিশেষ করে সমগ্র উপমহাদেশজুড়ে সবুজ বিপ্লবের পর থেকেই বাংলার কৃষক সমাজের চরিত্রে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। তারপর বিশ শতকের আশির দশক নাগাদ কৃষকদের মধ্যে পাট্টা বিলি হওয়ার পর থেকে কৃষকদের হাতে প্রচুর পরিমাণে ব্যক্তিগত জমি এসে যায়।

সবুজ বিপ্লবের ফলে প্রাপ্ত কৃষি প্রযুক্তি দ্বারা নিজস্ব জমিতে চাষের মাধ্যমে বাংলার কৃষকেরা প্রচুর পরিমাণে ফসল উৎপাদন করতে থাকে। সময়ের সাথে সাথে ফসলের উৎপাদন যত বাড়ে, ততই বাড়তে থাকে কৃষিদ্রব্যকে কেন্দ্র করে ব্যবসার গুরুত্বও।

এইভাবে বাংলায় অসংখ্য কৃষকরা ক্ষুদ্র ও মাঝারি মাপের চাষির মানদণ্ড ছাড়িয়ে বৃহৎ চাষী হিসেবে উঠে এসে আধুনিক ব্যাবসায়িক কাজকর্মেও লিপ্ত হয়। তবে একথা অনস্বীকার্য যে আজও বাংলার সিংহভাগ কৃষকই আপন ঐতিহ্যগত চরিত্রকে বজায় রেখে অবস্তুবাদমূলক কৃষিকাজ দ্বারা জীবন ধারণ করে চলেছে।

কৃষক ও রাজনীতি:

বাঙালির জীবন সংক্রান্ত আলোচনা সম্ভবত রাজনীতি ছাড়া অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বাংলার কৃষক সমাজও এই আধুনিক রাজনৈতিক পরিসরের বাইরে নয়। আধুনিক ভারতবর্ষে বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই কৃষক সমাজে রাজনীতির প্রবেশ ঘটেছে। বাংলার কৃষকেরাও কালের স্রোতে ভাসতে ভাসতে বিভিন্ন রাজনৈতিক মঞ্চে যোগদান করেছেন। সময়ের সাথে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক কৃষক সমিতি ও মঞ্চ।

সেইসব মঞ্চ থেকে কৃষকেরা ঐক্যবদ্ধভাবে তাদের দাবি-দাওয়া পেশ করেছেন। এমনকি সময়ের সাথে সাথে কৃষক পরিবারের মধ্যে থেকেও উঠে এসেছেন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দেশনেতা। প্রমাণ হয়েছে যে বাংলার কৃষকেরা লাঙ্গল চালিয়ে ফসল ফলাতে জানে, তারা মাথা খাটিয়ে দেশ চালানোর ক্ষেত্রেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে।

বাংলায় কৃষক আন্দোলন:

বাংলার কৃষকরা সাধারণভাবে অত্যন্ত সরল ও শান্তিপ্রিয় প্রকৃতির। তাদের বিরুদ্ধে নানা সময়ে বিভিন্ন শোষণ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলেও তারা পেশা ধর্ম থেকে বিচ্যুত হয়ে আন্দোলনে নামেন নি। কিন্তু সবকিছুরই একটি নির্দিষ্ট সীমা থাকে। কৃষকদের সেই অসীম ধৈর্য ও সহ্যের সীমা যখন অতিক্রান্ত হয়, তখনই নিজেদের জীবন রক্ষার তাগিদে তারা আন্দোলনে অবতীর্ণ হয়। বাংলার কৃষকেরা সেই কোম্পানির শাসনের আমল থেকে কৃষক আন্দোলনের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে।

বাংলা উনবিংশ শতকে দেখেছে নীলকর সাহেবদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে কৃষক সমাজের আন্দোলন, এরপর বিংশ শতকে দেখেছে তেভাগার মতন আন্দোলন। তারপর সময় যত গড়িয়েছে, বাংলার কৃষক সমাজ ততই রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। এরপর আর বিক্ষিপ্ত আন্দোলন নয়, বাংলা দেখেছে সমাজবন্ধু কৃষকদের অধিকার রক্ষার জন্য সংগঠিতভাবে আন্দোলন করতে।

কৃষক সমাজের সমস্যাবলী:

বাংলা তথা সমগ্র উপমহাদেশের কৃষক সমাজ তাদের জীবন ও জীবিকা ধারণের ক্ষেত্রে প্রতিমুহূর্তে অসংখ্য ছোট-বড় সমস্যার সম্মুখীন হয়। এই সকল সমস্যাবলী কৃষকদের জীবন ধারণ, জাতীয় উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং সর্বোপরি সমগ্র জাতির অগ্রগতিকে বাধা দান করে। এ প্রসঙ্গে সর্বপ্রথম উল্লেখ করতে হয় নিজের রক্ত জল করে কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার ঘটনাকে।

ন্যায্যমূল্যের অভাবে প্রতিবছর বাংলা তথা সমগ্র দেশের অসংখ্য কৃষকের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। এছাড়া উল্লেখ করতে হয় কৃষিক্ষেত্রে মহাজনী সুদের কারবারের কথা। সরকারের তরফ থেকে কাঙ্খিত সাহায্য না পেয়ে বহু কৃষক বিভিন্ন সুদখোর মহাজনদের থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হয়।

তারপর সেই ঋণ শোধ করতে না পেরে দেনার দায়ে ডুবে আত্মহত্যা করা ছাড়া নিরীহ কৃষকের কাছে আর কোন পথ খোলা থাকেনা। এছাড়া বিভিন্ন অঞ্চলে প্রয়োজনীয় সেচের জল না পাওয়া, ন্যায্যমূল্যে ফসলের বীজ কিনতে না পারা, ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রক্রিয়াগত বাধা ইত্যাদি কৃষক সমাজের জ্বলন্ত সমস্যা।

সমস্যা সমাধান:

কোন দেশকে সার্বিকভাবে উন্নতি করতে গেলে সেই দেশের কৃষক সমাজকে সবার আগে উন্নত হতে হয়। তাই কৃষক সমাজের সমস্যাবলী দূর করতে না পারলে দেশের সার্বিক অগ্রগতি সম্ভব নয়। এই চরম সত্য অনুধাবন করতে পেরে স্বাধীনতার পর থেকেই দেশের নেতৃবৃন্দ কৃষক সমাজের সমস্যাগুলিকে দূর করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে সবার প্রথমে উল্লেখ করতে হয় বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকে ভারতবর্ষে ঘটে যাওয়া সবুজ বিপ্লবের কথা।

এই সবুজ বিপ্লবের আঁচ এসে পড়েছিল বাংলার কৃষকদের ওপরেও। এছাড়া কৃষকদের প্রাথমিক সমস্যা দূরীকরণের জন্য জমিদারি প্রথার অবলুপ্তি এবং পশ্চিমবঙ্গের কৃষকদের জমির পাট্টাদানের কথাও উল্লেখ করতে হয়।

তাছাড়া বর্তমানে প্রতিবছর সরকারের তরফ থেকে কৃষকদের প্রয়োজনীয় ঋণদান এবং ফসল ফলানোর জন্য উপযোগী যন্ত্রাদি ও বীজ কেনার জন্য বিভিন্ন প্রকার ছাড় দেওয়া হয়ে থাকে। কৃষকদের আয় নিশ্চিত করার জন্য দেওয়া হয়ে থাকে ন্যূনতম সমর্থন মূল্য। 

উপসংহার:

কৃষকরা হল সমাজের প্রধান চালিকাশক্তি। তাই এই চালিকা শক্তি দুর্বল হয়ে পড়লে প্রকৃতপক্ষে সমগ্র সমাজের দুর্বলতা অবশ্যম্ভাবী। সে কারণে কৃষকদের উন্নতির জন্য বাংলা তথা সমগ্র দেশকে সক্রিয়ভাবে সচেষ্ট হতে হবে। তবেই একটি দেশ সেই প্রাথমিক চালিকা শক্তির ওপর নির্ভর করে কাঙ্খিত উন্নতির শিখরে আরোহণ করতে পারবে, নচেৎ নয়।


বাংলার কৃষক প্রবন্ধ রচনাটি পড়ে আপনার কেমন লাগলো আপনার ব্যাক্তিগত মতামত কমেন্টের মাধ্যমে আমাদের জানান। আমরা সব সময় সচেষ্ট থাকি সবার থেকে সুন্দর ও আপনার মনের মতো করে একটি রচনা তুলে ধরার। এখানে নেই এমন রচনা পাওয়ার জন্য রচনাটির নাম কমেন্ট করে জানান। দ্রুততার সঙ্গে আমরা উক্ত রচনাটি যুক্ত করার চেষ্টা করবো।সম্পূর্ণ রচনাটি পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

Print Friendly, PDF & Email

রাকেশ রাউত

রাকেশ রাউৎ বাংলা রচনা ব্লগের নির্বাহী সম্পাদক। ইনি শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী একজন মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার। ইনি বাংলা রচনার সম্পাদকীয় দলকে লিড করেন। রাকেশ দীর্ঘ ৫ বছর যাবৎ বাংলা কনটেন্ট এডিটিং এর সাথে যুক্ত আছেন। ইনি বাংলা রচনা ছাড়াও নামকরণ এবং বাংলা জীবনীর মতো নামকরা সাইটের সম্পাদকীয় দলের একজন অন্যতম সদস্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট