দেখে নিন ইংরেজিতেও রচনা

স্বদেশপ্রেম (বাংলাদেশ) প্রবন্ধ রচনা [PDF]

আমাদের জন্মভূমি দেশকে আমরা সবাই খুব ভালোবাসি।দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকেই মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন কত বীর যোদ্ধা।রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার স্বাধীন দেশকে আমরা কতটুকু ভালোবাসি?দেশপ্রেমের নামে রাজনীতির খেলায় মগ্ন এক শ্রেণীর মানুষ।দেশকে ভালোবেসে দেশকে উন্নতির শিখরে পৌঁছে দিতে হলে প্রথমেই বোঝা দরকার দেশ প্রেমের প্রকৃত অর্থ। এ নিয়ে আজকের বিষয় স্বদেশপ্রেম (বাংলাদেশ) প্রবন্ধ রচনা।

স্বদেশ প্রেম বাংলাদেশ রচনা বৈশিষ্ট্য চিত্র

ভূমিকা:

সৃষ্টির সেই আদি লগ্ন থেকে মানুষ যখন জীবনধারণের জন্য ঐক্যবদ্ধ হতে শিখলো, সেই দিন থেকে এই পৃথিবীর বুকে জাতির গোড়াপত্তন হয়ে গিয়েছিল। তারপর সময়ের বিবর্তনে মানুষ খাদ্য সংগ্রহকারী থেকে খাদ্য উৎপাদনকারীর পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে, সেই সঙ্গে মানুষের যাযাবর তকমা ঘুচে গিয়ে মানুষ শিখেছে একটি নির্দিষ্ট স্থানে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করতে।

কোন নির্দিষ্ট জায়গায় স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপনের সাথে সাথে সুপ্রাচীন যুগে গড়ে ওঠা ঐক্যবদ্ধ জাতি সময়ের এবং সুযোগের সঙ্গে আরও বিকশিত হয়েছে। দীর্ঘদিন কোন একটি নির্দিষ্ট ভূমিতে বংশানুক্রমে জীবনযাপনের ফলে সেই অঞ্চলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে সভ্যতা; যা সময়ানুক্রমে স্বদেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। আর সেই স্বদেশে নিয়ত জীবনযাপনকারী মানুষের জন্মভূমির প্রতি আবেগ পরিচিতি পেয়েছে স্বদেশ প্রেম রূপে।

স্বদেশ প্রেমের সংজ্ঞা:

এককথায় স্বদেশ প্রেম বলতে বোঝায় স্বদেশের প্রতি সংশ্লিষ্ট দেশবাসীর ভালোবাসার আবেগকে। কিন্তু খানিকটা গভীরে গিয়ে পর্যালোচনা করলেই বোঝা যাবে স্বদেশ প্রেম নেহাতই কোন ভুঁইফোড় সস্তা আবেগের বিষয় নয়। এই আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দীর্ঘকালীন সভ্যতার ইতিহাস, জীবন সংগ্রাম তথা দেশীয় সংস্কৃতির দোত্যনা। মানুষ যেখানে বংশানুক্রমে বসবাস করে, যেখানে মানুষের জন্ম হয় সেই ভূমির প্রতি মানুষের টান নাড়ির টানের অনুরূপ।

সেই ভূমির সংস্কৃতিতে গড়ে ওঠে মানুষের রুচিবোধ ও জীবনচর্যা। তাই এই আবেগকে অবজ্ঞা করা পৃথিবীর যেকোন মানুষ মাত্রই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এই আবেগের মাধ্যমে মানুষ ও স্বদেশভূমি পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে এক অলঙ্ঘ্য বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে থাকে। এই স্বদেশপ্রেম দ্বারা মানুষ নিজের জন্মভূমির ইতিহাস সংস্কৃতি তথা সভ্যতার প্রতি গর্ব অনুভব করে। 

সংকীর্ণ ও প্রগতিশীল স্বদেশ প্রেম:

পৃথিবীর প্রতিটি বিষয়েরই ভাল ও মন্দ দুটি দিক রয়েছে। সাধারণ মানুষের পরম আবেগ স্বদেশ প্রেমও তার ব্যতিক্রম নয়। পৃথিবীর ইতিহাসে শঙ্খিনী এবং প্রগতিশীল এই দুই ধরনের স্বদেশপ্রেম লক্ষ্য করা যায়। ইতিহাসের এই সংকীর্ণ এবং প্রগতিশীল স্বদেশ প্রেম সম্পর্কে জানার পূর্বে শান্তিপূর্ণ স্থিতির জন্য প্রাথমিক শর্তাবলীকে জানা প্রয়োজন। এ পৃথিবী পরিচালিত হয় মানুষের মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতার নীতি দ্বারা।

সে কারণে ‘বাঁচো এবং বাঁচতে দাও’ এই চিরন্তন পালনীয় কর্তব্যের অন্যথা হলেই পৃথিবীর বুকে অশান্তির অভিশাপ নেমে আসে। স্বদেশ প্রেমের ক্ষেত্রেও এই কথা ভীষণভাবে প্রযোজ্য। তাই ‘আমার দেশ শ্রেষ্ঠ’- স্বদেশ সম্বন্ধে এই উক্তি বিবেচিত হয় প্রগতিশীল স্বদেশ প্রেম রূপে; আর ‘একমাত্র আমার দেশই শ্রেষ্ঠ’- স্বদেশের ব্যাপারে এই ধারণা বিবেচিত হয় সংকীর্ণ মানসিকতার প্রতীকরূপে।

একদিকে প্রগতিশীল স্বদেশ প্রেম যেমন স্বজাতির উন্নতি ঘটিয়ে স্বদেশকে আন্তর্জাতিক বিশ্বের দরবারে সম্মানীয় উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়। আর অন্যদিকে সংকীর্ণ দেশপ্রেম স্বার্থান্বেষী মানসিকতার বশবর্তী হয়ে পৃথিবীর বুকে অশান্তির অভিশাপ ডেকে এনে স্বদেশের জন্য আদপে অন্ধকারের বার্তা বয়ে আনে।

এধরনের সংকীর্ণ দেশপ্রেমের উদাহরণ হিসেবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পূর্ববর্তী সময়ে হিটলারের নেতৃত্বাধীন জার্মানি কিংবা ইতিহাসের বুকে দীর্ঘকালব্যাপী রাজত্ব করা উপনিবেশিক মানসিকতাসম্পন্ন ব্রিটেনের কথা উল্লেখ করা যায়। আধুনিক বিশ্বায়িত পৃথিবীতে মানব সভ্যতার উন্নতিকল্পে সর্বদা প্রগতিশীল স্বদেশপ্রেমই কাম্য।

আমার দেশপ্রেম:

আমি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি ছোট দেশ বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরের একজন বাসিন্দা। এ পৃথিবীর অন্যান্য যেকোনো মানুষের মতই নিজের দেশের প্রতি আমার অতুলনীয় স্বদেশ প্রেম বর্তমান। আমি আমার দেশকে নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসি; শ্রদ্ধা করি আমার দেশের ইতিহাস, সমাজ তথা সংস্কৃতিকে।

আমার দেশের ইতিহাস আমায় প্রতিনিয়ত শেখায় জীবন যুদ্ধে সংগ্রাম করতে, আমার দেশের প্রকৃতি আমায় শেখায় জীবনের স্নেহময় হয়ে উঠতে, আমার দেশের সমাজ আমায় শেখায় জীবনের অবিরত সংগ্রামে জয়ী হয়ে উঠতে। একথা সত্য যে বাংলাদেশের মানুষ পৃথিবীর অন্যান্য অংশের তুলনায় স্বদেশ প্রেমের ব্যাপারে খানিকটা বেশিই আবেগপ্রবণ।

তবে সেই আবেগ সংকীর্ণতার নয়, বরং অনেকখানি প্রগতিশীল। প্রগতিশীল এই ব্যাপক দেশপ্রেমের লালনকারী হয়েও আমরা জানি আধুনিক বিশ্বে চলতে গেলে পৃথিবীর প্রতিটি দেশ তথা প্রতিটি সমাজকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলতে হয়। স্বদেশের প্রতি প্রেমের বশবর্তী হয়েই প্রতি মুহূর্তে আমরা বাংলাদেশের নাগরিকেরা নিজের দেশকে জগত সভায় শ্রেষ্ঠ আসনে তুলে ধরার জন্য নিজেদের যথাসম্ভব উৎসর্গ করে চলি।

আমার দেশের স্বাজাত্যপ্রেমের ইতিহাস:

পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় আমার স্বদেশ বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে অনেকখানিই নবীন। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম দ্বারা পরম কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা অর্জনের পর আমরা সবে মাত্র অর্ধশতাব্দীর এসে পৌঁছেছি। তবে এই অর্ধশতাব্দীর মধ্যেই বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে যে সকল নিদর্শন স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে তার পেছনে লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের মানুষের ব্যাপক দেশপ্রেম।

আমরা আমাদের দেশের ইতিহাসকে প্রতিমুহূর্তে পরম শ্রদ্ধা সহকারে স্মরণ করে থাকি। তাছাড়া আমাদের দেশের সকল মানুষের কাছে আমাদের স্বদেশ প্রেমের অপর একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো মাতৃভাষার প্রতি আমাদের প্রেম ও আবেগ।

এই মাতৃভাষা রক্ষার জন্য সংগ্রাম করতে গিয়েই একসময় প্রাণ দিয়েছিলেন আমাদের দেশের অসংখ্য তরুণ নাগরিকেরা। তারপর স্বজাতিকে রক্ষা করার বাসনায় আমাদের দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ একদিন ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামে। দেশের এই সকল ইতিহাস প্রতি মুহূর্তে আমাদের সকলকে দেশকে আরো বেশি করে ভালবাসার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে চলে।

আমার উদ্বেলিত স্বদেশপ্রেমের কারণ:

খুব ছেলেবেলা থেকেই আমার মধ্যে অন্যান্যদের তুলনায় খানিক অধিক স্বদেশপ্রেম জাগরিত হয়েছিল। ছেলেবেলায় এর প্রকৃত কারণ অনুধাবন করতে না পারলেও, কৈশোর ও যৌবনের এই সন্ধিক্ষণে বুঝতে পারি আমার বাড়ির ইতিহাস সচেতন, রুচিশীল ও সংস্কৃতিময় পরিবেশের কারণেই আমার মধ্যে এই স্বাজাত্যপ্রেমের উদ্ভব ঘটেছিল।

বয়স যত বেড়েছে, আমি যত দেশকে কাছ থেকে চিনতে শিখেছি, ততই আমার মধ্যে স্বদেশ প্রেমের আবেগ বৃদ্ধি পেয়েছে। আমার দেশের অনিন্দ্য সুন্দর প্রকৃতি যা আমায় প্রতিমুহূর্তে স্নেহ ও মায়ার জালে জড়িয়ে রাখে, আমার স্বদেশের অবর্ণনীয় ইতিহাস গাঁথা, আমার জাতির প্রাচীন ঐতিহ্য আমায় প্রতি মুহূর্তে স্বদেশপ্রেমের প্রেরণা জোগায়। 

স্বদেশপ্রেমের গুরুত্ব:

যেকোনো মানব সভ্যতার কাঙ্খিত অগ্রগতির পথে স্বদেশপ্রেমের ব্যাপক গুরুত্ব রয়েছে। পৃথিবীতে প্রতি মুহূর্তে যে ব্যাপক অভাবনীয় উন্নতি সাধিত হয়ে চলেছে তার পেছনেও বহুলাংশে স্বদেশপ্রেমের অবদান রয়েছে। প্রতিটি মানুষ চায় তার নিজের দেশের উন্নতিকল্পে কিছু না কিছু অবদান রেখে যেতে। সেই নিমিত্ত প্রত্যেকটি মানুষ জীবনের কর্মযজ্ঞে অগ্রসর হয়।

দেশের জন্য মানুষের এই প্রেরণা আসতে পারে সার্থক স্বদেশ প্রেমের মধ্যে দিয়েই। স্বদেশপ্রেমের বশবর্তী হয়েই প্রতি মুহূর্তে দেশের অসংখ্য বীর সেনানী শত কষ্ট সহ্য করেও দেশকে নিরাপত্তা দান করে চলেছে। দেশপ্রেম দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়েই প্রতিদিন দেশের অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী দেশকে নেতৃত্ব দানের উদ্দেশ্যে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে চলেছে।

সর্বোপরি এই উদ্বেলিত স্বদেশপ্রেম দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েই প্রতিক্ষণে আমাদের দেশের অসংখ্য মানুষ সারা বিশ্বজুড়ে কোনো না কোনোভাবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে চলেছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে ছেলেবেলায় দেশের একজন সার্থক সেনা হতে চাইতাম। তবে শারীরিকভাবে দুর্বল হওয়ার কারণে একজন সার্থক সেনাপ্রধান সক্ষমতা আমি হারিয়েছি। কিন্তু তবুও জীবনে বড় হয়ে কোনো না কোনোভাবে আমি আমার স্বদেশের উন্নতিকল্পে আত্মনিয়োগ করতে চাই। 

উপসংহার:

বাংলাদেশের বুকে স্বদেশ হল প্রতিটি বাংলাদেশেবাসীর কাছে একটি আবেগের নাম; আর স্বদেশ প্রেম সেই আবেগেরই যত্নলালিত বহিঃপ্রকাশ। এই আবেগের দ্বারাই তাড়িত হয়েই বাংলাদেশের বুকে প্রতিমুহূর্তে ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়েছে।

এই আবেগ তাড়িত মানুষের কাঁধে ভর করেই আজ বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশ একটি অত্যন্ত সম্মানজনক জায়গা করে নিয়েছে। এই আবেগই মানুষকে শিখিয়েছে ‘যদি এক মুহূর্তও বাঁচো, দেশের জন্য বাঁচতে শেখো।’ তাই সেই আবেগের সুরেই সুর মিলিয়ে পরিশেষে আমিও বলতে পারি বাংলাদেশ যদি একটি হৃদপিণ্ড হয়, তাহলে তা প্রতিমুহূর্তে স্পন্দিত হয়ে চলেছে প্রতিটি দেশবাসীর শিরায়-শিরায়, ধমনীতে থেকে ধমনীতে।


স্বদেশপ্রেম বাংলাদেশ প্রবন্ধ রচনাটি পড়ে আপনার কেমন লাগলো আপনার ব্যাক্তিগত মতামত কমেন্টের মাধ্যমে আমাদের জানান। আমরা সব সময় সচেষ্ট থাকি সবার থেকে সুন্দর ও আপনার মনের মতো করে একটি রচনা তুলে ধরার। এখানে নেই এমন রচনা পাওয়ার জন্য রচনাটির নাম কমেন্ট করে জানান।দ্রুততার সঙ্গে আমরা উক্ত রচনাটি যুক্ত করার চেষ্টা করবো।সম্পূর্ণ রচনাটি পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

Print Friendly, PDF & Email

রাকেশ রাউত

রাকেশ রাউৎ বাংলা রচনা ব্লগের নির্বাহী সম্পাদক। ইনি শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী একজন মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার। ইনি বাংলা রচনার সম্পাদকীয় দলকে লিড করেন। রাকেশ দীর্ঘ ৫ বছর যাবৎ বাংলা কনটেন্ট এডিটিং এর সাথে যুক্ত আছেন। ইনি বাংলা রচনা ছাড়াও নামকরণ এবং বাংলা জীবনীর মতো নামকরা সাইটের সম্পাদকীয় দলের একজন অন্যতম সদস্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট