স্বদেশপ্রেম (বাংলাদেশ) প্রবন্ধ রচনা [PDF]

লিখেছেন: Rakesh Routh

আমাদের জন্মভূমি দেশকে আমরা সবাই খুব ভালোবাসি।দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকেই মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন কত বীর যোদ্ধা।রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার স্বাধীন দেশকে আমরা কতটুকু ভালোবাসি?দেশপ্রেমের নামে রাজনীতির খেলায় মগ্ন এক শ্রেণীর মানুষ।দেশকে ভালোবেসে দেশকে উন্নতির শিখরে পৌঁছে দিতে হলে প্রথমেই বোঝা দরকার দেশ প্রেমের প্রকৃত অর্থ। এ নিয়ে আজকের বিষয় স্বদেশপ্রেম (বাংলাদেশ) প্রবন্ধ রচনা।

স্বদেশ প্রেম বাংলাদেশ রচনা বৈশিষ্ট্য চিত্র

ভূমিকা:

" জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী"- জননী এবং জন্মভূমি স্বর্গের থেকেও মহৎ। মায়ের মতোই জন্মভূমি বা স্বদেশের প্রতিও মানুষ নাড়ির টান অনুভব করে। নিজের দেশকে ভালবাসে না, এমন মানুষ চিরকালই নিন্দার যোগ্য।

নিজের দেশ, তা যেমনই হোক না কেন, সেটি আমাদের কাছে অতি প্রিয়। এই অনুভব থেকেই দ্বিজেন্দ্রলাল রায় লিখেছেন-

" এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি।"

এই স্বদেশপ্রেম চিরকালই মানুষের কাছে এক মহৎ গুন হিসেবে চিহ্নিত হয়। কবি জীবনানন্দ দাশ তাই বলে গেছেন-

" আবার আসিব ফিরে ধানসিড়িটির তীরে এই বাংলায়।"

দেশপ্রেমের স্বরূপ:

"স্বদেশপ্রেম থেকে বিশ্বপ্রেম, যে নিজের দেশকে

ভালোবাসে, সে বিশ্বপ্রেমিক, মানব-প্রেমিক

মানবতাবাদী।" 

সমুদ্রগুপ্ত

স্বদেশপ্রেম তথা দেশের প্রতি ভালোবাসা এক কথায় বলতে গেলে সমস্ত মানব সভ্যতার এক স্বভাবজাত গুণ। যেকোন মানুষই নিজ জন্মভূমিতে আকাশ,‌‌ বাতাস, পরিবেশ, মানুষ এসবের মাঝেই বড় হয়ে উঠতে চায়।

মানুষের শরীরের সমস্ত অঙ্গে, শিরায়-শিরায় দেশের উপাদান মিশে আছে। ফলে দেশ ও দশের প্রতি তার যে ভালবাসা তা কৃতজ্ঞতা ও কর্তব্যের রূপ নেয়। বস্তুত নিজের জন্মভূমির প্রতি ভালোবাসার মধ্যেই  দেশপ্রেম লুকিয়ে আছে।

একারনেই জন্মভূমির ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য তার কাছে আপন হয়ে ওঠে। এই ভালোবাসাকেই স্বদেশপ্রেম বলে। চিন্তা ভাবনা ও দেশের কাজে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়াকেই স্বদেশপ্রেম বলে।

বিশেষভাবে বলতে গেলে দেশের প্রতি শর্তহীনভাবে কাজ, কৃতজ্ঞতা, দায়িত্ব, কর্তব্য, একাত্মবোধ - এসবই স্বদেশপ্রেমের মূল বৈশিষ্ট্য।

নিজ দেশের প্রতি প্রেম যেন উদার ও খাঁটি হয়। সেটা যেনো জীবনের প্রতি ভালোবাসাকেও ছাপিয়ে যায়। 

এডউইন আর্নল্ডের ভাষায়- 

"জীবনকে ভালোবাসি সত্যিই, কিন্তু দেশের চেয়ে বেশী নয়।"

কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত তাই লিখেছেন-

“মিছা মনিমুক্তা হেম স্বদেশের প্রিয় প্রেম

তার চেয়ে রত্ন নাই আর।”

দেশপ্রেমের অভিব্যাক্তি:

দেশ ও দশের প্রতি মানুষের যে ভালবাসা, যে বন্ধন, আকর্ষণ তা থেকেই স্বদেশপ্রেমের উদ্ভব। এ কারণে প্রত্যেক মানুষের কাছে তার জন্মভূমি শুধু যে সকল দেশের সেরা তা নয়, তার কাছে তার জন্মভূমি স্বর্গের থেকেও মহৎ বলে মনে হয়।

এই চেতনাই জেগেছিল জীবনানন্দ দাশের মনে এবং তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে এভাবে-

" বাংলার রূপ আমি দেখিয়াছি, তাই

আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর।"

 প্রত্যেক মানুষের মধ্যে এই স্বদেশপ্রেম আবেগ লুকিয়ে থাকে। এই আবেগ লাগে দেশের সকল মানুষের মধ্যে ঐক্য স্থাপন  করতে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের মধ্যে এই স্বদেশপ্রেম ভাবনার উদ্ভব ঘটে।

এই আবেগ প্রত্যেক মানুষের রক্তে রক্তে প্রবাহমান। এ জন্যই আমাদের কন্ঠে এটি প্রতিধ্বনিত হয়-

"সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি আমার এই দেশেতে জন্ম যেন এই দেশেতেই মরি।"

এই দেশকে ভালবেসে প্রাণ দিতেও দ্বিধা বোধ করে না মানুষ। বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের পাতা ওল্টালেই দেখতে পাওয়া যায়, দেশপ্রেমকে ভিত্তি করে প্রাণ বিসর্জন করেছেন বহু সংখ্যক মানুষ।

ছাত্রজীবনে দেশপ্রেমের শিক্ষা:

এই স্বদেশপ্রেম সমস্ত মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হলেও সকল মানুষকেই এই গুণটি অর্জন করতে হয়। তাই সমস্ত মানুষদের ছাত্রজীবন থেকেই যে  দেশপ্রেমের দীক্ষা গ্রহণ করা উচিত, তা বলা বাহুল্য।

প্রত্যেক মানুষকেই দেশের মাটি ও মানুষকে ভালোবাসা উচিত। প্রত্যেক ব্যক্তির ছাত্রজীবনে যে দেশপ্রেম সৃষ্টি হয় তা তাদের মনে আজন্মকাল লালিত পালিত হয়। এ কথা না বললেই চলে যে, আজকের ছাত্র-ছাত্রীরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ।

ভবিষ্যতে নিজ‌ নিজ দেশের ভালো-মন্দ তাদের উপরই অর্পিত হবে। এজন্য সবার আগে দেশের বিপদে-আপদে ও প্রয়োজনে ছাত্র-ছাত্রীদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। তাদেরকেই অগ্রনী ভূমিকা পালন করতে হবে।

যদি প্রয়োজন হয় তবে দেশের স্বার্থে ছাত্রদেরকে তাদের জীবন উৎসর্গ করতে হবে। যেমনটি কিছু বছর আগে ছাত্ররা করেছিল, ১৯৫২ সালে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য আন্দোলন করে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে এবং ১৯৭১ সালে যুদ্ধে অকাতরে নিজের প্রাণ উৎসর্গ করে।

স্বদেশপ্রেম ও রাজনীতি:

মূলত রাজনৈতিক ক্ষেত্রের মূল উদ্দেশ্যই হলো দেশপ্রেম। এর প্রতিটি ক্ষেত্রেই রাজনীতির বিচলন। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের জন্য মূলত কাজ করে থাকে রাজনীতিবিদরা। তবে বর্তমান যুগে রাজনীতির চেহারা অন্য।

অধিকাংশ রাজনীতিবিদরা নিজেদের স্বার্থের উদ্দেশ্যেই কাজ করে থাকে এবং তারা সমাজের কল্যাণের কাজ থেকে বিরত থাকে বললেই চলে। দেশের স্বার্থে, কল্যাণে নিজেকে আত্মত্যাগ করেন এমন কোনো রাজনীতিবিদের উপস্থিতি এখন প্রায় নেই বললেই চলে। বর্তমান সময়ে কোনো মানুষই নিজ স্বার্থ, সুবিধা ছাড়া অন্য কিছু ভাবে না। তাই বর্তমান সমাজ ক্রমে অবনতির পথে বর্ধিত হচ্ছে।

উপসংহার:

প্রত্যেক মানুষেরই জন্মভূমি ভীষণ প্রিয় এবং সেই জন্মভূমি রক্ষার দায়িত্বও প্রত্যেক মানুষের। তবে একটি কথা সকলকে মনে রাখতে হবে যে নিজের দেশকে রক্ষা করার নামে অপর মানুষকে আক্রমণ করা মানবতাবিরোধী কর্ম।

স্বদেশপ্রেমের মতো এত পবিত্র গুণ এই জগতে আর কোথাও নেই। এ জন্য জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষেরই উচিত স্বদেশকে ভালোবাসা। যে মানুষ বা ব্যক্তি প্রকৃত দেশপ্রেমী, তিনি সকলের কাছে পরম পূজনীয়। যে ব্যক্তি নির্বিঘ্নে দেশ ও জাতির কল্যাণে নিজেকে আত্মত্যাগ করতে এক মুহুর্তও ভাববে না, সে ব্যক্তিই বিশ্ববরেণ্য।

বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়--

" সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে।

সার্থক জনম মা গো, তোমায় ভালোবেসে"


স্বদেশপ্রেম বাংলাদেশ প্রবন্ধ রচনাটি পড়ে আপনার কেমন লাগলো আপনার ব্যাক্তিগত মতামত কমেন্টের মাধ্যমে আমাদের জানান।আমরা সব সময় সচেষ্ট থাকি সবার থেকে সুন্দর ও আপনার মনের মতো করে একটি রচনা তুলে ধরার।

এখানে নেই এমন রচনা পাওয়ার জন্য রচনাটির নাম কমেন্ট করে জানান।দ্রুততার সঙ্গে আমরা উক্ত রচনাটি যুক্ত করার চেষ্টা করবো।সম্পূর্ণ রচনাটি পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

Print Friendly, PDF & Email
লেখক পরিচিতি
Rakesh Routh
রাকেশ রাউৎ বাংলা রচনা ব্লগের নির্বাহী সম্পাদক। ইনি শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী একজন মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার। ইনি বাংলা রচনার সম্পাদকীয় দলকে লিড করেন। রাকেশ দীর্ঘ ৫ বছর যাবৎ বাংলা কনটেন্ট এডিটিং এর সাথে যুক্ত আছেন। ইনি বাংলা রচনা ছাড়াও নামকরণ এবং বাংলা জীবনীর মতো নামকরা সাইটের সম্পাদকীয় দলের একজন অন্যতম সদস্য।

পরবর্তী পড়ুন

আমার প্রিয় শিক্ষক রচনা [সঙ্গে PDF]

আমাদের প্রত্যেকের বিদ্যালয়ে অনেক শিক্ষক থাকেন, তাঁরা প্রত্যেকেই আমাদের শিক্ষাদানের মধ্য দিয়ে জীবনের সঠিক পথ প্রদর্শনে সহয়তা করেন। তাঁরা প্রত্যেকেই […]

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রচনা [সঙ্গে PDF]

বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে দেশের সমস্ত মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে যিনি অন্যতম ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনি আর কেউ নন,বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু […]

উন্নয়ন বনাম পরিবেশ রচনা [সঙ্গে PDF]

মানুষ যেদিন প্রথম পাথরে পাথর ঘষে আগুন জ্বালাতে শিখেছিল সেদিন থেকেই শুরু হয়েছিল এক পরিবেশ বনাম উন্নয়ন নামের এক মহাযুদ্ধ। […]

ছাত্র সমাজ ও রাজনীতি বা ছাত্রজীবনে রাজনীতি রচনা [সঙ্গে PDF]

ছাত্ররাজনীতি আসলে ভালো নাকি মন্দ তা নিয়ে বিতর্কের অন্ত নেই। ইতিহাস খুঁজলে দেখা যাবে বিগত এক শতাব্দী ধরে রাজনীতির নামে […]

বাংলার সংস্কৃতি রচনা [সঙ্গে PDF]

সভ্যতা ও সংস্কৃতি, আমাদের জীবনের এই দুটি অংশ পরস্পরের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে রয়েছে যে তা বিশ্লেষণ করা যায় না।সভ্যতার ক্রমবিকাশের […]

ভারতের স্বাধীনতা দিবস রচনা [সঙ্গে PDF]

ভারতমাতার বহু বীর সন্তান অনেক রক্তের বিনিময়ে দীর্ঘ সংগ্রামের পর স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন আমাদের। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ ই আগস্ট ইংরেজ […]

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Proudly Owned and Operated by Let Us Help You Grow Online ©️