দেখে নিন ইংরেজিতেও রচনা

সাম্প্রতিক বিশ্ব ও বাংলাদেশ রচনা [সঙ্গে PDF]

দক্ষিণ এশিয়া তথা বর্তমান বিশ্বে রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সমাজ নীতিতে বাংলাদেশ একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ নাম। আঞ্চলিক তথা আন্তর্জাতিক কোনো ক্ষেত্রেই বর্তমানকালে আর  বাংলাদেশের গুরুত্বকে অস্বীকার করা যায় না।  এই আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক গুরুত্বের পিছনে নিহিত রয়েছে বিশেষ কিছু কারণ।  সেই কারণগুলিই বর্তমান যুগে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রগুলিতে বাংলাদেশের সার্বিক গুরুত্বকে সফলভাবে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে সমর্থ হয়েছে।  সাম্প্রতিক বিশ্বে বাংলাদেশের এই  গুরুত্ব এবং তার কারণ বিষয়ক সবকটি দিককে  তুলে ধরার অভিপ্রায় নিয়ে আমাদের আজকের এই প্রতিবেদনের উপস্থাপনা।

সাম্প্রতিক বিশ্ব ও বাংলাদেশ রচনা বৈশিষ্ট্য চিত্র

ভূমিকা:

পৃথিবীতে মানুষের জীবন আবর্তিত হয় বিশ্বজুড়ে প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল রাজনীতি, সমাজনীতি এবং অর্থনীতির ওপর ভিত্তি করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্বে ঠান্ডা যুদ্ধের প্রাক্কালে পৃথিবী দুইটি পৃথক বিপরীতমুখী শক্তি শিবিরে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। তারপর বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটায় বিশ্ব শক্তির কেন্দ্র হয়ে পড়ে একমুখী। তবে সেই সময় থেকেই বিভিন্ন আলাদা আলাদা বিষয়ের উপর নির্ভর করে মানব সভ্যতার পটভূমি প্রতিনিয়ত বদলে যেতে থাকলে বিশ্বশক্তিও ধীরে ধীরে এককেন্দ্রিকতা থেকে বহুকেন্দ্রিকতার পথে এগিয়ে যায়।

বর্তমান যুগে বিশ্বায়িত পৃথিবীতে পরিস্থিতি এমন যে, কোন দেশ আধুনিক পৃথিবীতে যত ছোটই হোক না কেন, তার মধ্যে যদি কিছুমাত্র সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে তাহলে কোনভাবেই আন্তর্জাতিক বিশ্বে তার গুরুত্বকে অস্বীকার করা যায় না। আধুনিক পৃথিবীতে বাংলাদেশ এমনই একটি ক্ষুদ্র কিন্তু উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কস্বরূপ, যার মধ্যে লুকিয়ে থাকা অনন্ত সম্ভাবনা দ্বারা সে এই বিশ্বায়নের যুগে আধুনিক পৃথিবীতে তাৎপর্যপূর্ণ প্রাসঙ্গিকতা অর্জন করে নিয়েছে।

বাংলাদেশ ও সংক্ষিপ্ত ইতিহাস:

সাম্প্রতিক বিশ্ব এবং বাংলাদেশ সম্পর্কে আলোচনায় বাংলাদেশ ও তার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস সম্পর্কে দু-এক কথা না বললে এই প্রতিবেদন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বুকে ভারতীয় উপমহাদেশের অন্তর্গত বৃহৎ প্রতিবেশীদের মাঝে তুলনামূলকভাবে ছোট একটি দেশ হলো বাংলাদেশ। এই ভূমির মানুষেরা নিজেদের মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম বাংলা ভাষার প্রতি অত্যন্তই আবেগপ্রবন।

১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে নিজেদের অধিকারের দাবিতে পাকিস্তান রাষ্ট্র থেকে পৃথক হয়ে গঠিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র। বাংলাদেশের তিন দিকে রয়েছে ভারতবর্ষের সাথে আন্তর্জাতিক সীমানা এবং দক্ষিনে সীমানা মায়ানমারের সাথে। প্রায় ১৬ কোটি জনসংখ্যার এই রাষ্ট্রটি লোকসংখ্যার দিক থেকে পৃথিবীতে অষ্টম। উত্তরে সিলেট এবং দক্ষিণ চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চল, অন্যদিকে সুন্দরবনের বিস্তৃত বনভূমি, উর্বর কৃষিভূমি ইত্যাদি নিয়ে বাংলাদেশ প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ। 

বর্তমান বিশ্বে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব:

বর্তমানকালে আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক গুরত্ব  অপরিসীম। স্বাধীনতার পর থেকেই অর্থনৈতিকভাবে নিজেকে সমৃদ্ধ করে তোলার লক্ষ্যে প্রাকৃতিক এবং মানব সম্পদে পরিপূর্ণ বাংলাদেশ সুষ্ঠ পরিকল্পনার মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। এই পথে ব্যর্থতা যে আসেনি এমন নয়,  তবে সাফল্যের পরিমাণ নেহাত কম উল্লেখযোগ্য নয়।  স্বাধীনতার পর থেকে দীর্ঘ এই সময়কালে বাংলাদেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার পাশাপাশি এশিয়া মহাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে উঠতেও সক্ষম হয়েছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি তার প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতকেও ছাড়িয়ে গিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই কোন দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সাথে সাথেই বিশ্বের দরবারে বৃদ্ধি পায় তার সামাজিক গুরুত্ব। অন্যদিকে সামাজিক গুরুত্বের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় বাংলাদেশের হৃদয়স্বরূপ বাঙালি জাতির কথা। বাঙালি জাতি আপন প্রতিভা এবং বুদ্ধিমত্তা দ্বারা বিশ্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে প্রতিনিয়ত। এর মধ্যে যেমন রয়েছেন বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য বিজ্ঞানী,  তেমনি রয়েছেন কূটনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ প্রমুখরা যাদের মধ্যে বর্তমান উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় বাংলাদেশের মানুষ।  

বাংলাদেশের জনসংখ্যাগত গুরুত্ব:

 বাংলাদেশের মতন আয়তনে তুলনামূলকভাবে ক্ষুদ্র একটি দেশের কাছে প্রায় ১৮ কোটি জনসংখ্যা  সত্যিই এক দুশ্চিন্তার বিষয়।  তবে সব কিছুরই যেমন একটি খারাপ দিক থাকে,  তেমনি সাথে সাথে একটি ভালো দিকও  থাকতে পারে।  একইভাবে বাংলাদেশের এই বিপুল জনসংখ্যা যেমন দেশের চিন্তার কারণ, তেমনি এই বিপুল জনসংখ্যার উপর ভিত্তি করেই বর্তমান যুগে বাংলাদেশের অর্থনীতি তথা সমাজনীতির চাকা আবর্তিত হয়। বাংলাদেশের এই বিপুল জনসংখ্যার মধ্যে অধিকাংশই হলো যুবক।

বলাই বাহুল্য যুবকরাই সমাজের চালিকাশক্তি,  যে দেশের জনসংখ্যায় যুবার পরিমাণ যত বেশি, সেই দেশ সার্বিক উন্নতির দিক থেকে কত বেশি সুবিধাজনক স্থানে থাকতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়,  সমগ্র বিশ্বে বাংলাদেশ  তার এই বিপুল যুব জনসংখ্যার কারণে গণ্য হয় একটি উৎকৃষ্ট লেবার হাব বা  শ্রমিক সরবরাহের কেন্দ্র হিসেবে।

পৃথিবীর নানা স্থানে লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি শ্রমিক কর্মরত রয়েছে।  তাছাড়া প্রতিবছর বিদেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশী মানুষরা  লক্ষ লক্ষ ডলার বাংলাদেশ পাঠিয়ে আদপে জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নতিতে সাহায্য করে থাকে। সে কারণে  বিপুল এই জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বকে স্বীকার করলেও বাংলাদেশের সার্বিক উন্নতিতে এই জনসংখ্যার অবদানকে অস্বীকার করা যায় না। 

শিল্প ও বাংলাদেশ:

স্বাধীনতার পরবর্তী পর্ব থেকে এই ক’বছরে বাংলাদেশে যে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা টি সবচেয়ে বেশি বিকাশ লাভ করেছে সেটি নিঃসন্দেহে শিল্প। দেশে বিভিন্ন উপাদান কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একের পর এক বৃহৎ এবং ক্ষুদ্র শিল্প। এরই মধ্যে যেগুলি সবচেয়ে বেশি বিকাশ লাভ করেছে সেটি হল গার্মেন্টস শিল্প এবং পাটজাত শিল্প।  গার্মেন্টস শিল্পের ওপর ভিত্তি করেই বর্তমান বাংলাদেশের সমগ্র রপ্তানি বাণিজ্যের সিংহভাগ দাঁড়িয়ে আছে। এই শিল্পকারখানা গুলি প্রতি বছর অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেয়, এবং দেশের জাতীয় আয়ের ক্ষেত্রে একটি বড় অবদান রাখে।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন সমগ্র দেশে প্রায় ৫০ লক্ষের মত মানুষ  সরাসরিভাবে গার্মেন্টস শিল্পের সাথে যুক্ত আছেন, এবং এই শিল্প ক্ষেত্রটি প্রতিবছর বাংলাদেশের মোট জাতীয় আয় বা জিডিপিতে ১১ শতাংশেরও বেশি  অবদান রাখে।  অন্যদিকে সমগ্র দেশজুড়ে ব্যাপকভাবে উৎপাদিত  সোনালী তন্তু পাটকে ভিত্তি করেও গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ধরনের শিল্প।  বাংলাদেশে তৈরি জামাকাপড় কিংবা পাটজাত দ্রব্য গুণমাণে ভালো এবং দামেও সস্তা হওয়ায় বিশ্বের বাজারে এর চাহিদা ব্যাপক। 

দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক গুরুত্ব:

স্বাধীনতার অব্যবহিত পর থেকে এখনো পর্যন্ত জাতীয় উন্নতির ধারাকে সচল হবে অব্যাহত রাখতে পারার জন্য এবং সর্বোপরি  কিছুটা নিজের সুবিধাজনক ভৌগলিক অবস্থানের কারণেও  দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বাংলাদেশের গুরুত্ব উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া জাতীয় পররাষ্ট্র নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি শ্রদ্ধা,  অপর রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের সনদে বর্ণিত নীতিসমূহের প্রতি শ্রদ্ধা ইত্যাদি নীতি অনুসরণের কারনেও সংশ্লিষ্ট মহাদেশীয় অঞ্চলে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে।

তাছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সকলের প্রতি বন্ধুত্ব, কারোর প্রতি বিদ্বেষ নয় এই নীতির উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ আঞ্চলিক রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের বিভিন্ন সময়ে অত্যন্ত দূরদর্শিতার সাথে নিরপেক্ষ থাকতে সক্ষম হয়েছে। এমনকি পাকিস্তানের সাথে লজ্জাজনক সম্পর্কের ইতিহাস থাকলেও বর্তমানে সেই সম্পর্কেকেও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে।

উপসংহার:

যে উন্নতির পথে বাংলাদেশ আজ পা বাড়িয়েছে, সব স্বাভাবিক থাকলে সেই পথ থেকে বাংলাদেশকে  সরিয়ে দেওয়া অসম্ভব।  সে কারণে নিশ্চিতভাবেই আশা করা যায় যে সময়ের সাথে সাথে আঞ্চলিক তথা বিশ্ব রাজনীতি, সমাজ তথা অর্থনীতিতে বাংলাদেশের গুরুত্ব উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে।

তাছাড়া বর্তমানে জনসংখ্যাগত দিক থেকে বাংলাদেশ যে সুবিধাজনক অবস্থানে আজ রয়েছে, আগামীর অদূর ভবিষ্যতে সেই  সুবিধাজনক অবস্থান সংকুচিত হওয়ার  কোন সম্ভাবনা নেই।  সুতরাং বাংলাদেশ যদি নিজের এই বিপুল জনসংখ্যাকে ইতিবাচক উপায়ে জাতীয় উন্নতিতে ব্যবহার করতে  সক্ষম হয়,  তবে অচিরেই এশিয়ার বুকে একটি ব্যাপক গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে বাংলাদেশ সক্ষম হবে। 


সাম্প্রতিক বিশ্ব এবং বাংলাদেশ শীর্ষক উপরিউক্ত এই প্রবন্ধে সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে সবকটি দিককে যথাসম্ভব সংক্ষিপ্ত এবং যথাযথভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হলো। আশাকরি আমাদের এই প্রয়াস আপনাদের ভাল লেগেছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী যথাযথভাবে এটি আপনাদের সহায়তা করতে পারবে।

উপরিউক্ত প্রতিবেদনটি সম্পর্কে আপনাদের মতামত কমেন্টের মাধ্যমে বিশদে আমাদের জানান। আপনাদের মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চেষ্টা করব আপনাদের মতামত অনুযায়ী আমাদের লেখনীকে আরও উন্নত করে তোলার। তাছাড়া যদি এমনই অন্য কোন রচনা পড়তে চান সে বিষয়েও আমাদের অবগত করুন। আমরা অতি সত্বর সেই রচনাটি আপনার কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করব। ধন্যবাদ।

Print Friendly, PDF & Email

রাকেশ রাউত

রাকেশ রাউৎ বাংলা রচনা ব্লগের নির্বাহী সম্পাদক। ইনি শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী একজন মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার। ইনি বাংলা রচনার সম্পাদকীয় দলকে লিড করেন। রাকেশ দীর্ঘ ৫ বছর যাবৎ বাংলা কনটেন্ট এডিটিং এর সাথে যুক্ত আছেন। ইনি বাংলা রচনা ছাড়াও নামকরণ এবং বাংলা জীবনীর মতো নামকরা সাইটের সম্পাদকীয় দলের একজন অন্যতম সদস্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট