একজন শ্রেষ্ঠ বাঙালি বিজ্ঞানী প্রবন্ধ রচনা [ আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু ] (PDF)

লিখেছেন: Rakesh Routh

বাঙালিদের স্বভাবের জন্য ঘরকুনে অপবাদ থাকলেও কিছু বাঙালি মানুষদের দেখলেই বোঝা যায় বাঙালিদের বহুমুখী প্রতিভা। এমনই এক প্রতিভাবান প্রখ্যাত বাঙালি বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু।তাঁকে নিয়েই আজকের রচনার বিষয় একজন শ্রেষ্ঠ বাঙালি বিজ্ঞানী প্রবন্ধ রচনা।

একজন শ্রেষ্ঠ বাঙালি বিজ্ঞানী প্রবন্ধ রচনা বৈশিষ্ট্য চিত্র

ভূমিকা:

"ভারতের কোন্ বৃদ্ধ ঋষির তরুণ মূর্তি তুমি

হে আর্য আচার্য জগদীশ।"

রবীন্দ্রনাথ

ঊনবিংশ শতাব্দীতে ভারতের জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যে নবজাগরণ এসেছিল, বিজ্ঞানাচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু তার মূর্ত প্রতীক। উত্তরপুরুষদের অকর্মণ্যতায় প্রাচীন ভারতের দর্শন ও বিজ্ঞান সাধনার সকল দুয়ার অবরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল।

সেই সাধনার সে আরাধনার যজ্ঞশালার রূদ্ধদ্বার উন্মুক্ত করবার জন্যে আবির্ভূত হলেন প্রাচীন ভারতীয় ঋষির আধুনিক রূপ মূর্তি আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু। তার সাধনায় প্রাচ্যের দর্শন ও পাশ্চাত্যের বিজ্ঞানের মধ্যে রচিত হল নতুন সেতুবন্ধন।

সংক্ষিপ্ত জীবনী:

৩০শে নভেম্বর, ১৮৫৮ সাল। ঢাকার রাড়িখালে  জগদীশ চন্দ্র বসুর জন্ম। পিতা ভগবান চন্দ্র বসু ছিলেন ফরিদপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। মাতা বামাসুন্দরী বসু। পিতার স্বদেশানুরাগ ও স্বদেশী ‌শিল্প প্রতিষ্ঠার উৎসাহ এবং মায়ের দেওয়া রামায়ণ, মহাভারতের জ্ঞান জগদীশ চন্দ্র বসুর জীবনে অনেক পরিবর্তন এনেছিল।

শৈশবে গ্রামের পাঠশালায় অধ্যয়ন‌কালে সাধারণ মানুষের শিশু সন্তানদের অভিজ্ঞতা এবং শিল্পী‌ কারিগরদের ‌কর্ম কুশলতা তাঁর জীবনে‌ অসামান্য প্রভাব ফেলেছিল। ফরিদপুরের বাংলা স্কুলে শিক্ষা লাভের পর জগদীশ চন্দ্র ভর্তি  হলেন কলকাতার হেয়ার স্কুলে এবং তারপর সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে।

এখানে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে বি. এ. পাস‌ করেন। তারপর লন্ডনে প্রাণীবিদ্যা ও‌ উদ্ভিদবিদ্যার শিক্ষা গ্রহণ করেন। তবে তার অধ্যয়ন জীবন কাটে প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপনা করে।

বিজ্ঞানে তাঁর অবদান:

পরাধীন দেশের বৈজ্ঞানিক হওয়ার অভিশাপে তাকে বিজ্ঞান সাধনায় সহস্র দুঃখ অপমানের বোঝা মাথায় নিয়ে অগ্রসর হতে হয়। বিদ্যুৎ তরঙ্গ নিয়ে তার আবিষ্কার বিস্মিত করল তৎকালীন বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের।

রবীন্দ্রনাথ পাঠালেন পরাধীন ভারত জননীর 'অশ্রুসিক্ত আশীর্বাদ'। বেতারযন্ত্র আবিষ্কারকের সম্মান প্রকৃতপক্ষে জগদীশ চন্দ্র বসুর প্রাপ্য। তিনি মানুষের বিশ্বাসঘাতকতায় বিরক্ত হয়ে পদার্থবিদ্যার গবেষণা ত্যাগ করে ফিরে এলেন উদ্ভিদবিদ্যার শ্যামল প্রশান্তির মধ্যে।

জড় পদার্থের সকল বিষয়ে তার গবেষণার দ্বারা তিনি লাভ করলেন বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীর স্বীকৃতি। বিশ্ব জগতের সর্বত্রই জড় পদার্থের প্রাণের নির্বাধ‌ প্রকাশ- ভারতের বৈদিক ঋষিদের এই দার্শনিক উপলব্ধি জগদীশ চন্দ্র বসুর বিজ্ঞান সাধনায় প্রমানিত হল।

 রচনাবলী:

জগদীশ চন্দ্র একাধারে বৈজ্ঞানিক, দার্শনিক, ও‌ সাহিত্যিক। আন্তর্জাতিক মহলে অবগতির জন্য জগদীশ চন্দ্র তার মৌলিক প্রবন্ধগুলি ইংরেজিতে লিখলেও বাংলা সাহিত্যে তার অবদান অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। তার 'অব্যক্ত' বইটি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ তাকে চিঠিতে লেখেন-- " যদিও‌ বিজ্ঞানবানীকেই তুমি তোমার সুয়োরাণী করিয়াছ, তবু সাহিত্য সরস্বতী সে পদের দাবী করিতে পারিত-- কেবল‌ তোমার অনবধানেই সে অনাদৃত হইয়া আছে (৮ অগ্রহায়ণ, ১৩২৮)"।

'অব্যক্ত' গ্রন্থটি ১৩২৮(১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে) বঙ্গাব্দে প্রকাশিত হয়। হতমান ভারতবর্ষের সন্তান হিসেবে তিনি যে পরাধীনতা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছেন, সেটির অশ্রুসিক্ত ভাষাই লিপিবদ্ধ আছে তার এই অব্যক্ত গ্রন্থে। তাঁর এই গ্রন্থ প্রকৃতপক্ষে তার দার্শনিক, চেতনা, বিজ্ঞান-মনীষা, ও‌ সাহিত্য প্রতিভার উজ্জ্বল সমাহার।

আজীবন একনিষ্ঠ বিজ্ঞানসেবী জগদীশ চন্দ্র বসু মাতৃভাষায় বিজ্ঞান চর্চার প্রচার ও‌ প্রসারে আজীবন সচেষ্ট ছিলেন। বিজ্ঞান সাধনা বিষয়কে কাব্যিক ভাষায় এবং গভীর দর্শনশাস্ত্রকে তিনি সাহিত্যে প্রকাশ করেছেন। তাঁর স্মরনীয় প্রবন্ধের মধ্যে রয়েছে "স্নায়ুসুত্রে উত্তেজনা প্রবাহ", " ভাগীরথীর উৎস সন্ধানে", প্রভৃতি।

অর্জিত সম্মান ও কৃতিত্ব:

লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ভূষিত করেছিল  ডি. এস্-সি উপাধিতে। কিন্তু তিনি অস্বীকার করে দেন এই দুর্লভ মর্যাদা। অধ্যাপনা বৃত্তি থেকে অবসর গ্রহণের পর  জীবনের সমস্ত সঞ্চয় দিয়ে পরাধীন ভারতের বিজ্ঞানের গবেষণার দৈন্য দশা দূর করে নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচনের উদ্দেশ্যে তিনি ১৯১৭ সালের ৩০শে নভেম্বর স্থাপন করলেন‌ "বসু-বিজ্ঞান মন্দির"।

অবশেষে বিজ্ঞানের কক্ষ কক্ষান্তরে বিচরণ করে তার রহস্য পুরীর দ্বার একে একে উন্মুক্ত হয়। বিজ্ঞান লক্ষীর সেবায় বহু তরুণ প্রতিভাকে অনুপ্রাণিত করে এবং ভারতের বিপুল সম্ভাবনাময় বিজ্ঞান সাধনার দ্বারোদ্ঘাটন করে এই বিজ্ঞান বীর পরলোক গমন করেন।

কিন্তু ভারতের বিজ্ঞান লক্ষীর পদতলে উৎসর্গীকৃত প্রাণ  এই মহামনীষী তার উত্তর সাধকদের জন্যে বিজ্ঞান সাধনার যে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে গেছেন, তা কোনোকালে ব্যর্থ হবার নয়।

উপসংহার:

জগদীশ চন্দ্রের বিজ্ঞান সাধনা দুঃখের সাধনা। বিশ্ব বিজ্ঞানের এই মহান সাধক পরাধীনতার দুঃসহ জ্বালা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেও দীনহীনা ভারতীয় জননীর লাজ দূর করে তিনি পরিয়েছেন মহিমার গৌরব মুকুট।

স্বার্থান্বেষী বিদেশীদের চক্রান্তে তার বিজ্ঞান সাধনা বহু তিক্ত অভিজ্ঞতার সঞ্চয়ে বেদনাভারাবনত। এই মহান বিজ্ঞান সাধকের সেই রাত্রির তপস্যা দিনে দিনে স্বাধীন ভারতের সফল স্বপ্নের মধ্যে লাভ করুক চরম সফলতা


একজন শ্রেষ্ঠ বাঙালি বিজ্ঞানী প্রবন্ধ রচনাটি পড়ে আপনার কেমন লাগলো কমেন্ট করে জানাবেন।আপনার একটি কমেন্ট আমাদের অনেক উৎসাহিত করে আরও ভালো ভালো লেখা আপনাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ায় জন্য।বানান ভুল থাকলে কমেন্ট করে জানিয়ে ঠিক করে দেওয়ার সুযোগ করে দিন।সম্পূর্ণ রচনাটি পড়ার জন্য আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

Print Friendly, PDF & Email
লেখক পরিচিতি
Rakesh Routh
রাকেশ রাউৎ বাংলা রচনা ব্লগের নির্বাহী সম্পাদক। ইনি শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী একজন মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার। ইনি বাংলা রচনার সম্পাদকীয় দলকে লিড করেন। রাকেশ দীর্ঘ ৫ বছর যাবৎ বাংলা কনটেন্ট এডিটিং এর সাথে যুক্ত আছেন। ইনি বাংলা রচনা ছাড়াও নামকরণ এবং বাংলা জীবনীর মতো নামকরা সাইটের সম্পাদকীয় দলের একজন অন্যতম সদস্য।

পরবর্তী পড়ুন

আমার প্রিয় শিক্ষক রচনা [সঙ্গে PDF]

আমাদের প্রত্যেকের বিদ্যালয়ে অনেক শিক্ষক থাকেন, তাঁরা প্রত্যেকেই আমাদের শিক্ষাদানের মধ্য দিয়ে জীবনের সঠিক পথ প্রদর্শনে সহয়তা করেন। তাঁরা প্রত্যেকেই […]

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রচনা [সঙ্গে PDF]

বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে দেশের সমস্ত মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে যিনি অন্যতম ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনি আর কেউ নন,বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু […]

উন্নয়ন বনাম পরিবেশ রচনা [সঙ্গে PDF]

মানুষ যেদিন প্রথম পাথরে পাথর ঘষে আগুন জ্বালাতে শিখেছিল সেদিন থেকেই শুরু হয়েছিল এক পরিবেশ বনাম উন্নয়ন নামের এক মহাযুদ্ধ। […]

ছাত্র সমাজ ও রাজনীতি বা ছাত্রজীবনে রাজনীতি রচনা [সঙ্গে PDF]

ছাত্ররাজনীতি আসলে ভালো নাকি মন্দ তা নিয়ে বিতর্কের অন্ত নেই। ইতিহাস খুঁজলে দেখা যাবে বিগত এক শতাব্দী ধরে রাজনীতির নামে […]

বাংলার সংস্কৃতি রচনা [সঙ্গে PDF]

সভ্যতা ও সংস্কৃতি, আমাদের জীবনের এই দুটি অংশ পরস্পরের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে রয়েছে যে তা বিশ্লেষণ করা যায় না।সভ্যতার ক্রমবিকাশের […]

ভারতের স্বাধীনতা দিবস রচনা [সঙ্গে PDF]

ভারতমাতার বহু বীর সন্তান অনেক রক্তের বিনিময়ে দীর্ঘ সংগ্রামের পর স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন আমাদের। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ ই আগস্ট ইংরেজ […]

2 comments on “একজন শ্রেষ্ঠ বাঙালি বিজ্ঞানী প্রবন্ধ রচনা [ আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু ] (PDF)”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Proudly Owned and Operated by Let Us Help You Grow Online ©️