শৈশবে ফেলে আসা দিনগুলি বা শৈশব স্মৃতি রচনা [PDF]

লিখেছেন: Rakesh Routh

ছোটবেলার দিন গুলোর কথা মনে করলে আমরা এক পরম সুখ অনুভব করি ও তৃপ্তি পাই।কারণ আমাদের জীবনের একটা রঙিন অধ্যায় শৈশব।আমাদের সকলেরই খুব ইচ্ছে করে শৈশবের ফেলে আসা দিন গুলি ফিরে পেতে। এ নিয়ে আজকের বিষয় শৈশবে ফেলে আসা দিনগুলি বা শৈশব স্মৃতি রচনা।

শৈশব স্মৃতি রচনা বৈশিষ্ট্য চিত্র

ভূমিকা:

শৈশব প্রত্যেকের জীবনের মধুর একটি সময়। শৈশব জীবনের দিন গুলি ছিল দুরন্তপনা, দুষ্টুমি আর সারাদিন ছোটাছুটি করে দৌড়ে বেড়ানোর এক অন্যতম মুহূর্ত। আমার শৈশব যেন আজও আমাকে ডাকে বলে আয়-ফিরে আয়।

সত্যিই আজও বার বার ফিরে যেতে মন চায় ফেলে আসা সেই শৈশবের দিন গুলিতে। মনে পড়ে অবাধে ঘোরা ফেরা আর খেলে বেড়ানো সেই সব দিনগুলির কথা। আপনিও হয়তবা শৈশব শব্দটি পড়েই  স্মৃতির পাতায় হাতড়াতে শুরু করেছেন ফেলে আসা সোনালি দিনগুলোকে।

জীবনের প্রাথমিক পর্যায় শৈশব:

আমাদের বাড়ি গ্রামে। আমার ছেলেবেলা কেটেছে গ্রামেই। গ্ৰামের সোঁদা মাটির গন্ধ। পিয়ারা গাছের সাথে মোটা দড়ি দিয়ে বাঁধা দোলনা, বর্ষাকালে সোনা ব্যাঙের, ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, পুকুরের স্বচ্ছ টলমল জলে তাজা কই, শিঙি ও মাগুর মাছ প্রভৃতির মত সুন্দর প্রকৃতি আজও আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে।

শহরের এই ইট কাঠ পাথরের চার দেয়ালের মধ্যে থেকে যখন হতাশাটা গভীর হয়ে আসে তখন আমি চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাই সেই আমার ছেলেবেলার কাটানো মুহূর্তগুলো। দিগন্তজোড়া সবুজ খোলা মাঠ, নীল আকাশে মুক্ত বলাকার দল, সোনালী ধানের শীষ।

বাতাসে ভেসে আসে রাখালের বাঁশির সুর, মাঝির কণ্ঠে গাওয়া ভাটিয়ালি গান, শৈশবে চুড়ির রিনিঝিনি শব্দ সবকিছু মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়। গ্রামের জীবনকে আমি পথের বাঁকে ফেলে এসে শহরের জীবনে যতই খাপ খাওয়াতে চেষ্টা করি ততই ফিরে আসি সেই আমার শিকড়ে। আমার শৈশব, কৈশোর তাড়িত করে আমি এখন মৌলিক জীবনের পথে। আমি আধুনিকতা আর শিকড়ের টানাটানিতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছি ক্রমশ।

শৈশব স্মৃতির সম্ভার:

আমাদের শৈশব নানা স্মৃতি সম্ভারে পূর্ণ। এখানে সেই স্মৃতি সম্ভার গুলোকে নিয়ে আলোচনা করা হলো।

i) প্রথম স্কুলে যাওয়ার স্মৃতি:

আমার বাড়ি পূর্ব বর্ধমান জেলায় পাটুলি গ্রামে। ওই গ্রামের নেহেরু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আমার পড়াশোনা শুরু হয়। স্কুলে ভর্তি হওয়ার বেশ কিছুদিন আগে থেকে আমার এক দিদির সাথে আমার স্কুলে যাওয়ার অভ্যেসটা হয়ে গেছিল।

তারপর যেদিন আমার পাঁচ বছর বয়স হয় তখন আমার বাবা গিয়ে স্কুলে ভর্তি করে দিয়ে আসেন। স্কুলে ভর্তি করার দিন সকালে স্নান করে ভালো জামা পড়ে আমাকে মা তৈরি করে রেখেছিল। স্কুলটা ছিল আমাদের বাড়ির  কাছেই।

যেদিন আমি স্কুলে ভর্তি হই তখন সময়টা ছিল গরমকাল, তাই স্কুলটা সকালে হচ্ছিল। বাবা আমাকে স্কুলে নিয়ে গেল সাইকেলে চড়িয়ে। স্কুলে পৌঁছলাম, তারপরে বাবা স্কুলের অফিস ঘরে আমাকে নিয়ে যায় সেখানে আমাকে ভর্তি করায়।

ভর্তির সময় আমার ক্লাস ওয়ানের রোল নাম্বার ছিল ১। কয়েকজন বান্ধবীর সাথে সেই দিনই পরিচয় হয়। সেইদিন আর স্কুলে ক্লাস হয়নি পরের দিন থেকেই শুরু হয় আমার ছাত্র জীবনের প্রথম দিন।

ii) বন্ধু সাথে মাঠে খেলার স্মৃতি:

আমাদের স্কুল ছুটি হত দুপুর তিনটের দিকে। তারপর বাড়ি ফিরে হাত পা পরিষ্কার করে খেয়ে ঘুমিয়ে নিতাম। বিকেল সাড়ে চারটে হলেই মনটা আনন্দে পরিপূর্ণ হতো। চুল বেঁধে জামা পড়ে যেতাম খেলার মাঠে।

খেলার মাঠটা ছিল আমরা যে স্কুলে পড়ি ওই স্কুলের সামনেই। সেখানে অনেক বান্ধবীরা আসতো।কুতকুত খেলা, খোখো খেলা, লুকোচুরি খেলা এইসব খেলেই বিকেলটা কেটে যেত।আর যদি কখনো খেলার মাঠে না যেতাম তাহলে আমাদের বাড়ির সামনে গরুর গাড়িতে উঠে সঙ্গী সাথীদের সাথে খেলা করতাম।

iii) লেখাপড়ার স্মৃতি:

ছোটবেলার হাতে খড়ি থেকে আমাকে ক্লাস সেভেন পর্যন্ত আমার বাবা মা আমাকে পড়িয়েছেন। সকাল বেলা মা রান্না করতেন আর একধারে আমাকে পাশে নিয়ে পড়াতেন। পড়া শেষ হলে স্কুল।

স্কুল থেকে ফিরে খেলা এবং যেই সূর্য পশ্চিম দিকে অস্ত গিয়ে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে তখনই মা বলতেন বই নিয়ে বসে পড়ো। মা সন্ধ্যেবেলায় পড়াতে বসাতেন। মাঝে কারেন্ট চলে গেলে হ্যারিকেন জ্বালিয়ে পড়াতেন।

তারপর বাবা বাড়ি ফিরে আর যেটুকু বাকি থাকতো পরিয়ে দিতেন। এইভাবে ক্লাস সেভেন পর্যন্ত চলার পর আমাকে টিউশনিতে ভর্তি করানো হয়। বর্তমানে আমি এম.এ পাস। কিন্তু এই এম.এ পর্যন্ত পড়াশোনায় আমার বাবা, মা এবং শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

iv) মামাবাড়ি যাওয়ার স্মৃতি:

কথায় বলে "মামার বাড়ি ভারী মজা কিল চড় নাই" - সত্যি মামার বাড়ি খুবই আমাদের আদরের জায়গা, সেখানে যেতেও খুব ভালো লাগতো।

আমার মামার বাড়ি আমাদের বাড়ির কাছেই। আমি যে স্কুলে পড়তাম ওই স্কুলের ঠিক পিছনেই আমার মামারবাড়ি। স্কুলে যখন টিফিন হতো তখন আমি প্রতিদিন মামারবাড়িতে টিফিন খেতে যেতাম। দিদিমার হাতের সুন্দর রান্নায় ভুরি ভোজ টা বেশ ভালই হতো।

কখনো কখনো সন্ধ্যাবেলায় দিদিমা যদি মোচার চপ বা কখনো মাংস বানাতেন তখন আমাদেরকে নিমন্ত্রণ করতেন। আমি বাবা, মা, ভাই সবাই মিলে যেতাম মামার বাড়ি। মামার বাড়ি যেহেতু খুব কাছেই তাই আমরা হেঁটেই পৌঁছে যেতাম সেখানে।

স্মৃতিচারণে পরম সুখ ও তৃপ্তি:

ছোট বেলার অনেক স্মৃতি আজও আমার সামনে ভাসে। ছোট বেলায় বাচ্চাদের সাথে খেলা করা, পুকুরে লাফ দিয়ে স্নান করা, একটুখানি বন্ধুদের সাথে খুনসুটি করা এগুলোর মধ্যে দিয়েই আমার দিন কেটে যেত।

সারাদিন ছুটে বেড়ানো, সন্ধ্যা হলে বাড়ি ফেরা আর মায়ের বকুনি শোনা এগুলো খুব মনে পড়ে। ছোটবেলার স্মৃতিগুলো কখনও ভোলার নয়। সব সময় মনে হয় কতই না ভালো ছিল সেদিনের দিন গুলো। ছোটবেলার স্মৃতি মনে পড়লে মনে অন্য রকম একটা তৃপ্তি আসে।

উপসংহার:

"দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইল না, রইল না সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি" - সত্যিই সেই ছেলেবেলা কে যদি আবার ফিরে পাই কতইনা ভাল হয়। জীবনের এতগুলো বছর পরও মনে হয় ছোটবেলার দিনগুলোই সবথেকে ভালো ছিল।

সে সময় সবাই ভালবাসত, কাছে ডেকে আদর করত। সবাই সুন্দর করে কথা বলত। সেই সময় একটু বাড়ির বাইরে গেলেই মা যেন খুঁজে হয়রান হয়ে যেত। একটুও চোখের আড়াল হতে দিত না। কিন্তু আজ আর সেই দিন নেই। সব কিছুই আজ প্রায় হারিয়ে গেছে সময়ের সাথে সাথে।


শৈশবের ফেলে আসা দিনগুলি বা শৈশব স্মৃতি প্রবন্ধ রচনাটি পড়ে আপনার কেমন লাগলো আপনার ব্যাক্তিগত মতামত কমেন্টের মাধ্যমে আমাদের জানান।আমরা সব সময় সচেষ্ট থাকি সবার থেকে সুন্দর ও আপনার মনের মতো করে একটি রচনা তুলে ধরার।

এখানে নেই এমন রচনা পাওয়ার জন্য রচনাটির নাম কমেন্ট করে জানান।দ্রুততার সঙ্গে আমরা উক্ত রচনাটি যুক্ত করার চেষ্টা করবো।সম্পূর্ণ রচনাটি পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

Print Friendly, PDF & Email
লেখক পরিচিতি
Rakesh Routh
রাকেশ রাউৎ বাংলা রচনা ব্লগের নির্বাহী সম্পাদক। ইনি শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী একজন মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার। ইনি বাংলা রচনার সম্পাদকীয় দলকে লিড করেন। রাকেশ দীর্ঘ ৫ বছর যাবৎ বাংলা কনটেন্ট এডিটিং এর সাথে যুক্ত আছেন। ইনি বাংলা রচনা ছাড়াও নামকরণ এবং বাংলা জীবনীর মতো নামকরা সাইটের সম্পাদকীয় দলের একজন অন্যতম সদস্য।

পরবর্তী পড়ুন

আমার প্রিয় শিক্ষক রচনা [সঙ্গে PDF]

আমাদের প্রত্যেকের বিদ্যালয়ে অনেক শিক্ষক থাকেন, তাঁরা প্রত্যেকেই আমাদের শিক্ষাদানের মধ্য দিয়ে জীবনের সঠিক পথ প্রদর্শনে সহয়তা করেন। তাঁরা প্রত্যেকেই […]

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রচনা [সঙ্গে PDF]

বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে দেশের সমস্ত মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে যিনি অন্যতম ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনি আর কেউ নন,বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু […]

উন্নয়ন বনাম পরিবেশ রচনা [সঙ্গে PDF]

মানুষ যেদিন প্রথম পাথরে পাথর ঘষে আগুন জ্বালাতে শিখেছিল সেদিন থেকেই শুরু হয়েছিল এক পরিবেশ বনাম উন্নয়ন নামের এক মহাযুদ্ধ। […]

ছাত্র সমাজ ও রাজনীতি বা ছাত্রজীবনে রাজনীতি রচনা [সঙ্গে PDF]

ছাত্ররাজনীতি আসলে ভালো নাকি মন্দ তা নিয়ে বিতর্কের অন্ত নেই। ইতিহাস খুঁজলে দেখা যাবে বিগত এক শতাব্দী ধরে রাজনীতির নামে […]

বাংলার সংস্কৃতি রচনা [সঙ্গে PDF]

সভ্যতা ও সংস্কৃতি, আমাদের জীবনের এই দুটি অংশ পরস্পরের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে রয়েছে যে তা বিশ্লেষণ করা যায় না।সভ্যতার ক্রমবিকাশের […]

ভারতের স্বাধীনতা দিবস রচনা [সঙ্গে PDF]

ভারতমাতার বহু বীর সন্তান অনেক রক্তের বিনিময়ে দীর্ঘ সংগ্রামের পর স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন আমাদের। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ ই আগস্ট ইংরেজ […]

One comment on “শৈশবে ফেলে আসা দিনগুলি বা শৈশব স্মৃতি রচনা [PDF]”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Proudly Owned and Operated by Let Us Help You Grow Online ©️