দেখে নিন ইংরেজিতেও রচনা

শৃঙ্খলাবোধ রচনা [সঙ্গে PDF]

শৃঙ্খলা বোধ হলো মানুষের চরিত্রের বিশিষ্ট গুনগুলির মধ্যে অন্যতম একটি। জীবনের কোন ক্ষেত্রেই শৃঙ্খলা বোধ ছাড়া সাফল্য অর্জন করা যায় না। সে কারণে এ বিশ্বের যে কোন কাজে শৃঙ্খলা বোধকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হয়। তবে আধুনিক যুগে প্রকৃত শৃঙ্খলা বোধ আসলে কি, কি তার স্বরূপ, কেমন তার গুরুত্ব সে ব্যাপারে বহু বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের আজকের এই প্রবন্ধে আমরা মানুষের জীবনে শৃঙ্খলা বোধের সবকটি দিক সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করার চেষ্টা করব।

শৃঙ্খলাবোধ রচনা বৈশিষ্ট্য চিত্র

ভূমিকা:

জীবন বিজ্ঞানের সাধারণ বৈশিষ্ট্য অনুসারে মানুষ এই পৃথিবীর অন্যান্য স্তন্যপায়ী জীবের থেকে পৃথক কিছু নয়। শুধুমাত্র আপন বুদ্ধিমত্তা দ্বারা নিজেকে উন্নত করে তুলে মানুষ আজকের এই স্থিতিতে উপনীত হয়েছে। কবে মানুষের জীবনে এমন কিছু নির্দিষ্ট চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য থাকে যা তার সভ্য জীবনকে সত্যিকারের সার্থক করে তুলতে সহায়তা করে থাকে। এই সকল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য গুলিকে মানব চরিত্রের সাধারণ গুণাবলী বলে অভিহিত করা হয়।

শৃঙ্খলা বোধ হল মানবচরিত্রের সেই সকল সাধারণ গুণাবলীর মধ্যেই অন্যতম এবং বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বলা হয়ে থাকে জীবনে শৃঙ্খলা বোধের সুষ্ঠু অবস্থান ছাড়া একজন মানুষের জীবন কখনোই সফল ও সুন্দর হতে পারে না। সে কারণে জীবনের সব কিছুর পূর্বে আপন চরিত্রে শৃঙ্খলা বোধের বিকাশ ঘটানো প্রয়োজন। এই প্রবন্ধে আমরা জীবনের এই অবিচ্ছেদ্য তথা অবশ্য প্রয়োজনীয় চারিত্রিক গুণটির বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করতে চলেছি।

শৃঙ্খলাবোধের স্বরূপ:

শৃঙ্খলাবোধ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার পূর্বে শৃঙ্খলা বোধের প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে আলোকপাত করার বিশেষ প্রয়োজন আছে। শৃঙ্খলা বোধ হল মানবচরিত্রের সেই বিশেষ চারিত্রিক গুন যা মানুষকে যথাযথ বা নির্ধারিত সময় অনুযায়ী, যথাযথ উপায় অবলম্বন করে সঠিক কাজ করবার পথে সুষ্ঠু রূপে চালিত করে।

এক কথায় বলা যায় শৃঙ্খলাবোধের অপর নাম হল সুষ্ঠু নিয়মানুবর্তিতা। তবে এ কথা মনে রাখা প্রয়োজন এই নিয়মানুবর্তিতা ব্যক্তি স্বাধীনতার ক্ষেত্রে অন্তরায় নয়। বরং শৃঙ্খলাবোধের যথাযথ উন্মেষ দ্বারা ব্যক্তি স্বাধীনতাকে সাধারণ বোধের তুলনায় অনেক উচ্চ আসনে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব। তাছাড়া শৃঙ্খলাবোধের স্বরূপ আলোচনা প্রসঙ্গে এ কথাও উল্লেখ্য যে সমগ্র সৃষ্টি কোন না কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম-শৃঙ্খলা অনুসারেই পরিচালিত হয়। তাই সেই সৃষ্টিরই একটি অঙ্গ হিসেবে আমাদেরও কর্তব্য যথাযথ নিয়ম-শৃঙ্খলার অনুসরণ করা।

ভারতীয় সংস্কৃতিতে শৃঙ্খলাবোধ:

সনাতন ভারতীয় সংস্কৃতিতে শৃঙ্খলা বোধের উল্লেখ করতে গেলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর পূর্বে সনাতন বৈদিক যুগে। বৈদিক ভারতীয় সংস্কৃতি অনুসারে সৃষ্টির স্বরূপ হল পরমাত্মা; আর জীবনের লক্ষ্য হলো কর্ম, ভক্তি ও জ্ঞান দ্বারা সেই পরমাত্মার সঙ্গে অন্তরাত্মার মিলন। বৈদিক সংস্কৃতিতে এই পথে চলার জন্য শৃঙ্খলাকে পরম পাথেয় বলে অভিহিত করা হয়েছে।

ভারতীয় সংস্কৃতিতে ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ্য, বাণপ্রস্থ, ও সন্ন্যাসের মেলবন্ধনে এই যে চতুরাশ্রম প্রথা বিকশিত হয়েছিল তার প্রধান ভিত্তি ছিল শৃঙ্খলাবোধ বা নিয়মানুবর্তিতা। এইভাবে নিয়মানুবর্তিতা ভারতীয় জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠেছিল। ইতিহাসের পরবর্তীকালে এই বিশেষ গুণটির অবক্ষয় দেখা গেলেও ভারতবর্ষ কখনোই এর মূল ধারা থেকে চ্যুত হয়নি। পরবর্তীকালে ঔপনিবেশিক আমলে ব্রিটিশরা শৃঙ্খলাবোধ বা নিয়মানুবর্তিতাকে বাধ্যবাধকতার গন্ডিতে বেঁধে ফেলে একটি নতুন রূপ দান করেছিল।

জীবনে শৃঙ্খলার ভূমিকা ও প্রয়োজনীয়তা:

মানুষের জীবনে শৃঙ্খলাবোধ বা নিয়মানুবর্তিতার ভূমিকা এককথায় অপরিসীম। সর্বপ্রথম উল্লেখ করতে হয় জীবনে সার্থক শৃঙ্খলাবোধের উন্মেষ ঘটলে মানুষ কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জনে সফল হয়। শৃঙ্খলা বোধ মানুষের মানসচক্ষে আপন লক্ষ্যে পৌঁছানোর এমন এক সুগম রাজপথ উন্মোচিত করে যা তাকে অতি সহজেই সফলতা সফলতা লাভে সাহায্য করে। তবে শৃঙ্খলাবোধের গুরুত্ব শুধুমাত্র সাফল্য লাভের বাসনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

সৃষ্টির সাধারণ নিয়মের মতন শৃঙ্খলা বোধ মানুষের জীবনেরও সাধারণ নিয়ম। তাই এই শৃঙ্খলা বা নিয়মানুবর্তিতা একজন মানুষের চরিত্র গঠনে বিশেষভাবে সাহায্য করে। তাছাড়া একজন মানুষ শৃঙ্খলা বোধসম্পন্ন বা নিয়মানুবর্তী মানসিকতার অধিকারী হলে অপর একজন মানুষের অধিকার রক্ষিত হয়। সর্বোপরি মনে রাখা দরকার এই সৃষ্টির তুলনায় আমাদের জীবন হলো অতিক্ষুদ্র এবং মাত্র কয়েকটি নিশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ। শৃঙ্খলাবোধ ছাড়া এই সমগ্র সৃষ্টির নির্যাসটুকুকে উপলব্ধি করা তো দূর, স্পর্শ করাও সম্ভব নয়। আর এখানেই ব্যক্তিজীবনে শৃঙ্খলাবোধের গুরুত্ব।

সমাজে শৃঙ্খলাবোধের গুরুত্ব:

আধুনিক সমাজ জীবনেও শৃঙ্খলাবোধের গুরুত্ব ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী। এ প্রসঙ্গে সর্বপ্রথম আমাদের মনে রাখা দরকার একটি সমাজ গঠিত হয় সেই সমাজের এক এক জন ব্যক্তিমানুষকে নিয়ে। তাই কোন সমাজের মানুষের গড় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য যেমন হয় সেই সমাজও সার্বিকভাবে তেমনি চরিত্রের অধিকারী হয়। এই নিয়ম অনুসারে শৃঙ্খলা বোধসম্পন্ন মানুষদের নিয়ে গঠিত সমাজ একটু একটু করে উন্নতির দিকে এগিয়ে যায় আর ঊশৃঙ্খল মানুষে ভরা সমাজ ক্রমেই অধঃপতিত হয়। সমাজের সকল কাজে মানুষের শৃঙ্খলা বোধ আমাদের সাহায্য করে থাকে। সঠিক সময়ে সঠিক কাজ না হলে সমাজের উন্নতি কখনই সুষ্ঠুভাবে হতে পারে না। শৃঙ্খলা বোধ উন্নতির এই মূলভিত্তির ক্ষেত্রেই মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করে।

আধুনিক শৃঙ্খলাবোধের ক্ষতিকর দিক:

প্রাথমিকভাবে শুনতে কিছুটা আশ্চর্য লাগলেও আধুনিক যুগে আমাদের সমগ্র বিশ্বসমাজে যে ধরনের শৃঙ্খলা বোধ ক্রমেই বিকাশ লাভ করেছে ও করছে, তার বেশ কিছু ক্ষতিকর দিক বর্তমান। এইসকল ক্ষতিকর দিকগুলি একাধারে ব্যাক্তিমানুষ ও সমাজ উভয়কেই প্রভাবিত করে। আধুনিক শৃঙ্খলাবোধ বা নিয়মানুবর্তিতার সাধারণ উৎস হল ঔপনিবেশিক ইউরোপীয় সংস্কৃতি।

এই সংস্কৃতি সনাতন ভারতীয় সংস্কৃতির অনুরূপ মানবমনের সাথে শৃঙ্খলাবোধের মহামিলনকে এড়িয়ে গিয়ে মানবজীবনে শৃঙ্খলার যান্ত্রিক বাস্তবায়নের দিকে বেশি গুরুত্ব দেয়। ফলে মানুষের মনের সাথে শৃঙ্খলার প্রকৃত রূপের সংশ্লেষ ঘটতে পারে না। স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মধ্যে বোধও জন্ম নেয় না। যা জন্মায় তা হল এক অজানা চাপিয়ে দেওয়ার প্রতি আতঙ্ক ও অনীহা। এর ফলে মানুষের মনে অবসাদ জন্ম নিতে পারে এবং সমাজ অবক্ষয়িত হয়। 

মনীষীদের দৃষ্টান্ত:

সমগ্র পৃথিবীতে যে সকল মানুষ নিজেদের প্রতিভা দ্বারা সাধারনত্ব থেকে অসাধারনত্বের পর্যায়ে উন্নীত হয়েছেন তাদের সকলের জীবন পর্যালোচনা করলেই দেখা যাবে শৃঙ্খলাকে তারা জীবন পরিচালনার প্রধান ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। শৃঙ্খলা বা নিয়মানুবর্তিতাই তাদের জীবনে সাফল্যের প্রধান চাবিকাঠি হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, স্বামী বিবেকানন্দ, উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমূখ বিশিষ্ট মনীষীদের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। আবার নিয়মানুবর্তিতার অভাবে বিশিষ্ট প্রতিভাও কিভাবে ব্যর্থতার অন্ধকারে তলিয়ে যায় তার জ্বলন্ত উদাহরণ হল প্রবাদপ্রতিম কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। 

উপসংহার:

জীবনের ময়দানে শৃঙ্খলাবোধ ভিন্ন সাফল্য অর্জন করা অসম্ভব। শৃঙ্খলা বোধ বা নিয়মানুবর্তিতাই আমাদের শেখায় ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং স্বেচ্ছাচারিতার মধ্যে তফাতটা ঠিক কোথায়। এই সূক্ষ্ম তফাৎ উপলব্ধি করে জীবনে নিয়মানুবর্তি হয়ে মনের গহনে শৃঙ্খলা বোধের বীজ প্রোথিত করতে পারলে তবেই আমরা কাঙ্ক্ষিত সাফল্যের আস্বাদ পেতে পারি।


আলোচ্য উপরিউক্ত প্রবন্ধের শৃঙ্খলা বোধ বিষয়ে আমরা মোটামুটি সবকটি দিকের ওপর যথাসম্ভব সুষ্ঠু রূপে আলোকপাত করার চেষ্টা করেছি। তবে পরীক্ষার প্রয়োজনে আলোচনার ক্ষেত্রে আমাদের নির্দিষ্ট একটি শব্দসীমা বজায় রাখার চেষ্টা করতে হয়েছে। আশাকরি আমাদের এই প্রয়াস আপনাদের ভাল লেগেছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তা যথাযথভাবে আপনাদের সহায়তা করতে পারবে।

উপরিউক্ত প্রতিবেদনটি সম্পর্কে আপনাদের মতামত কমেন্টের মাধ্যমে বিশদে আমাদের জানান। আপনাদের মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চেষ্টা করব আপনাদের মতামত অনুযায়ী আমাদের লেখনীকে আরও উন্নত করে তোলার। তাছাড়া যদি এমনই অন্য কোন রচনা পড়তে চান সে বিষয়েও আমাদের অবগত করুন। আমরা অতি সত্বর সেই রচনাটি আপনার কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করব। ধন্যবাদ।

Print Friendly, PDF & Email

রাকেশ রাউত

রাকেশ রাউৎ বাংলা রচনা ব্লগের নির্বাহী সম্পাদক। ইনি শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী একজন মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার। ইনি বাংলা রচনার সম্পাদকীয় দলকে লিড করেন। রাকেশ দীর্ঘ ৫ বছর যাবৎ বাংলা কনটেন্ট এডিটিং এর সাথে যুক্ত আছেন। ইনি বাংলা রচনা ছাড়াও নামকরণ এবং বাংলা জীবনীর মতো নামকরা সাইটের সম্পাদকীয় দলের একজন অন্যতম সদস্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট