দেখে নিন ইংরেজিতেও রচনা

লকডাউন ও মানসিক অবসাদ রচনা [সঙ্গে PDF]

২০২০ সালে করোনা মহামারীর প্রকোপ প্রাথমিক পর্যায়ে রোধ করার জন্য সমগ্র বিশ্বব্যাপী প্রতিটি দেশের সরকারের তরফ থেকে জারি করা হয়েছিল আংশিক তথা সম্পূর্ণ লকডাউন।এই লকডাউন এর ফলে ব্যস্ত মানুষের গৃহবন্দি দশায় সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছিল ব্যক্তি তথা সমগ্র সমাজের মানসিক সত্ত্বা। এই পর্যায়ে মানুষের মনে যে অবসাদের অন্ধকার চেপে বসেছিল সেই অন্ধকারের গহনে সাধ্যমত আলোকপাত করার উদ্দেশ্য নিয়েই এই প্রতিবেদনের উপস্থাপনা।

লকডাউন ও মানসিক অবসাদ রচনা বৈশিষ্ট্য চিত্র

ভূমিকা:

২০২০ সালটি বিশ্বের সবার কাছে একটি অভিশপ্ত বছর হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। এই বছরে অন্যান্য সকল দুঃসংবাদকে অতিক্রম করে বছরটির শীর্ষক রূপে জায়গা করে নিয়েছিল করোনা মহামারী। কোন্ এক অজানা অচেনা ভাইরাস এসে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্তব্ধ করে দিয়েছিল সমগ্র বিশ্বের জীবনযাত্রা।

সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার অনিবার্য ফল হিসেবে মানুষের জীবনে এসেছিল অসংখ্য সমস্যা। সেই সকল সমস্যাগুলির মধ্যে অন্যতম এবং সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণটি হল মানসিক অবসাদ। লকডাউনে ঘরে দীর্ঘদিন ধরে বন্দী জীবন যাপনের ফলে মানুষের মন ভারাক্রান্ত হতে হতে ধীরে ধীরে ধীরে পড়েছিল অবসাদের দিকে।

এই মানসিক অবসাদ থেকে সমগ্র সমাজে তৈরি হয়েছিল এক সামাজিক অবসাদের বাতাবরণ। এর স্বাভাবিক ফলশ্রুতি হিসেবে এসেছিল মূল্যবোধের অবক্ষয়, পারিবারিক হিংসা, কলহ ইত্যাদি।

মহামারী এবং লকডাউন:

২০২০ সালে বিশ্বব্যাপী করোনা সংক্রমণ রোধের উদ্দেশ্যে মার্চ মাসের শেষের দিকে সমগ্র দেশব্যাপী জারি হয়েছিল সম্পূর্ণ লকডাউন। এই লকডাউন এর ফলে কেবলমাত্র প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি এবং পরিষেবা ছাড়া অন্য সবকিছু অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যায়।

মানুষ আটকে পড়ে ঘরের চার দেওয়ালের অভ্যন্তরে। প্রশাসনের তরফে বারবার প্রচার করা হতে থাকে এই মহামারীর সংক্রমণ রোধের একমাত্র উপায় মানুষে মানুষে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা। সমগ্র সমাজ জুড়ে তৈরি হয় আশঙ্কার বাতাবরণ। শুনশান রাস্তাঘাট, আর বন্ধনহীন সমাজে মানুষ বাড়ির অভ্যন্তরে ইঁদুরের জীবন-যাপন করতে থাকে।

দৈনন্দিন জীবনে স্তব্ধতা:

লকডাউন এর সাথে সাথেই সমগ্র দেশ তথা বিশ্ব জুড়ে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে নেমে আসে হঠাৎ স্তব্ধতা। সমস্ত অফিস কাছারি, দোকানপাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গ্রন্থাগার, প্রেক্ষাগৃহ সবই অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হয়ে যায় সাধারণ গণপরিবহন। যে রেল স্টেশন গুলি এতদিন মানুষের ভিড়ে গমগম করত সেখানে শুধুই বিরাজ করে শ্মশানের নিস্তব্ধতা।

রাস্তাঘাট ফাঁকা পড়ে থাকে। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া সাধারণ যানবাহনের চলাচল নিষিদ্ধ হয়ে যায়। মানুষ যাতে বাড়ি থেকে না বের হয় তার জন্য প্রতিনিয়ত চলতে থাকে প্রশাসনিক টহলদারি। শুধু মাঝেমধ্যে শুনশান রাস্তায় অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন মানুষের আশঙ্কাকে আরো বাড়িয়ে দিয়ে চলে যায়। 

Work-from-Home সংস্কৃতি:

মহামারী রোধের উদ্দেশ্যে এই লকডাউনের ফলে সমাজের সম্ভবত সবচেয়ে অভিনব প্রাপ্তিটি হল work-from-home সংস্কৃতি। মহামারীর পূর্বে এই ব্যবস্থার প্রচলন যে ছিল না এমনটা নয়, তবে লকডাউনের ফলে সমাজ জুড়ে এই ব্যবস্থা রীতিমত একটি সংস্কৃতির পর্যায়ে উন্নীত হয়। এই সংস্কৃতিতে বাড়িতে বসে অফিসের কাজ ডিজিটাল মাধ্যমে ইন্টারনেটের সাহায্যে সম্পন্ন করা হয়ে থাকে।

প্রাথমিকভাবে শুনতে আকর্ষণীয় লাগলেও এই পদ্ধতিতে কাজ করা অনেক বেশি প্রতিকূল। বাড়ির পরিবেশ এবং অফিসের পরিবেশ সম্পূর্ণরূপে আলাদা। সে কারণে অফিসের কাজকে বাড়ির পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে মানুষকে বেশ বেগ পেতে হয়। স্বাভাবিকভাবেই দীর্ঘদিন ধরে এই মানিয়ে নেওয়া এবং মেনে নেওয়ার মধ্যে দিয়ে মনের ওপর চেপে বসে হতাশা, এবং যার অনিবার্য ফল হিসেবে সময়ের সাথে আসে মানসিক অবসাদ।

শারীরিক ও সামাজিক দূরত্ব:

সমাজ সৃষ্টি হয়েছিল মানুষের প্রয়োজনেই। মানুষ একা বাঁচতে পারে না। সমাজের বন্ধনহীন স্রোতে একা বাঁচতে গেলে কালের খরস্রোতায় মানুষকে একাই হারিয়ে যেতে হয়। মহামারী রোধের উদ্দেশ্যে জারি হওয়া এই লকডাউন মানুষকে সেই সমাজ থেকেই সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল।

শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য বিশেষভাবে মানতে হয়েছিল সামাজিক দূরত্ব। আর সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার অর্থ হলো কোন প্রকার সামাজিক জমায়েতে অংশগ্রহণ না করা। এইভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য একা বাঁচতে বাঁচতে শুধুমাত্র ডিজিটাল মাধ্যম, ইন্টারনেট আর work-from-home সংস্কৃতির চোরাস্রোতে মানুষের মনে জন্ম নেয় হতাশার গ্লানি এবং মানসিক অবসাদ। 

বিনোদনগত অভাব:

জীবনে বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য বস্ত্র বাসস্থানের সাথে মানুষের একান্ত প্রয়োজন হল বিনোদন। বিনোদন ছাড়া মানুষের জীবন হয়ে ওঠে একঘেয়ে এবং মানুষ এই জীবনে বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য খুঁজে পায়না। বিনোদন মানুষকে দৈনন্দিন একঘেয়ে জীবন থেকে সাময়িকভাবে হলেও মুক্তির স্বাদ এনে দেয়।

এই লকডাউন মানুষের জীবন থেকে সামাজিক বিনোদনের সেই সামান্য উপায়টুকুও কেড়ে নিয়েছিল। যদিও বর্তমান যুগে বিনোদন বিশেষভাবে ভার্চুয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে, তবুও সামাজিকভাবে বিভিন্ন প্রকার বিনোদনের মাহাত্ম্য যে কতখানি তা এই লকডাউনের ফলে প্রতি মুহূর্তে অনুভূত হয়েছিল। আর সেই বিনোদনহীন জীবনে মানসিক অবসাদের থাবা সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের মতোই অনিবার্য।

একঘেয়ে ঘরবন্দি জীবন:

সমাজহীন, বিনোদনহীন স্তব্ধ জীবন আর work-from-home এর নাগপাশে জীবনে একঘেয়েমি আসা অত্যন্ত স্বাভাবিক। এই স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ারই ব্যাপক রূপের প্রতিফলন দেখা গিয়েছিল লকডাউনের সময়কার সামাজিক জীবনে।

পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে ছিল,  মানুষ জানত না কবে সব কিছু স্বাভাবিক হবে, কবে আবার মানুষ বাড়ি থেকে বেরোতে পারবে, সমাজের সাথে মিশতে পারবে আর সর্বোপরি প্রতিনিয়ত মাথায় চলত সংক্রমনের আশংকা। এই বীভৎস পরিস্থিতি মানুষকে ধীরে ধীরে একঘেয়েমি, হতাশা এবং অবসাদের অন্ধকূপের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। এরই স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে উঠে এসেছিল সামাজিক অবক্ষয়মূলক বিভিন্ন অন্ধকার দিক।

পারিবারিক কলহ এবং হিংসা:

ঘরবন্দী একঘেয়ে জীবন এবং তার ফলে মনের উপর চেপে বসা মানসিক অবসাদের প্রতিক্রিয়া রূপে সমাজে যে সকল অবক্ষয়মূলক অন্ধকার দিকগুলি উঠে এসেছে সেগুলির মধ্যে অন্যতম হলো ক্রমাগত বেড়ে চলা পারিবারিক কলহ এবং হিংসার কথা। ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে বাড়ির পরিবেশ এবং কাজের পরিবেশ সম্পূর্ণরূপে আলাদা।

দুই ধরনের বিপরীতমুখী পরিবেশের মধ্যে ক্রমাগত সংঘর্ষের ফলে যে পারিবারিক অশান্তির বাতাবরণ সৃষ্টি হচ্ছে তা মানুষের মনকে আরো অবসাদের দিকে ঠেলে দিয়েছে। পারিবারিক অশান্তি এবং অবসাদ শিথিল করেছে সম্পর্কের বন্ধনকেও। তবে সমাজতত্ত্ববিদ এবং মনস্তত্ত্ববিদদের মতে যে মাত্রায় পারিবারিক হিংসা এবং অশান্তির কথা লকডাউনের প্রারম্ভে কল্পনা করা হয়েছিল, বাস্তবে ততখানি মাত্রায় সমস্যা দেখা যায়নি।

অবসাদ দূরীকরণের উপায়:

এই ধরনের মানসিক অবসাদ দূরীকরণে ব্যক্তিগত স্তরে বেশ কয়েকটি উপায় অবলম্বনের প্রয়োজন আছে। প্রথমত work-from-home সংস্কৃতির মধ্যেও ঘরে বসে নিজের ব্যক্তিগত সময় এবং কাজের সময়কে সম্পূর্ণ আলাদা করে ফেলতে হবে। ব্যক্তিগত সময়ে শুধুমাত্র পরিবারের সঙ্গে এবং পারিবারিক বিনোদনে মনোযোগী হতে হবে। পারিবারিক মতানৈক্য হতেই পারে, তবে বিতর্কের সময় নিজের উত্তেজনা প্রশমন করতে শিখতে হবে। সর্বোপরি নিজেকে তথা নিজের পরিবারকে ভালোবেসে সম্পর্কের দৃঢ়তার প্রতি যত্নবান হতে হবে।

উপসংহার:

যে মহামারীর অন্ধকার আমাদের পৃথিবীর বুকে চেপে বসেছিল, তার আবহ ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাপি প্রায় সমস্ত দেশেই লকডাউন উঠে গিয়ে মানুষ আবার পুরানো জীবনে নতুন করে ফিরে আসছে। এই লকডাউনের সাথে সাথে মানুষের মনের অন্ধকার অবসাদও সম্পূর্ণ কেটে যাবে, এই আশা নিয়েই সভ্যতা পা রাখুক ভবিষ্যতের পৃথিবীতে।



লকডাউন ও মানসিক অবসাদ শীর্ষক উপরিউক্ত প্রবন্ধে সংশ্লিষ্ট বিষয় সংক্রান্ত সবকটি দিক যথাসম্ভব প্রাসঙ্গিকভাবে আলোচনার চেষ্টা করা হলো। তাছাড়া পরীক্ষার প্রয়োজন অনুযায়ী উক্ত প্রবন্ধটিতে আমরা একটি সাধারণ শব্দসীমা বজায় রাখারও যথাসম্ভব চেষ্টা করেছি। আশাকরি আমাদের এই প্রয়াস আপনাদের ভাল লেগেছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তা যথাযথভাবে আপনাদের সহায়তা করতে পারবে।

উপরিউক্ত প্রতিবেদনটি সম্পর্কে আপনাদের মতামত কমেন্টের মাধ্যমে বিশদে আমাদের জানান। আপনাদের মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চেষ্টা করব আপনাদের মতামত অনুযায়ী আমাদের লেখনীকে আরও উন্নত করে তোলার। তাছাড়া যদি এমনই অন্য কোন রচনা পড়তে চান সে বিষয়েও আমাদের অবগত করুন। আমরা অতি সত্বর সেই রচনাটি আপনার কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করব। ধন্যবাদ।

Print Friendly, PDF & Email

রাকেশ রাউত

রাকেশ রাউৎ বাংলা রচনা ব্লগের নির্বাহী সম্পাদক। ইনি শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী একজন মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার। ইনি বাংলা রচনার সম্পাদকীয় দলকে লিড করেন। রাকেশ দীর্ঘ ৫ বছর যাবৎ বাংলা কনটেন্ট এডিটিং এর সাথে যুক্ত আছেন। ইনি বাংলা রচনা ছাড়াও নামকরণ এবং বাংলা জীবনীর মতো নামকরা সাইটের সম্পাদকীয় দলের একজন অন্যতম সদস্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট