দেখে নিন ইংরেজিতেও রচনা

মহাকাশ গবেষণায় ভারত রচনা [সঙ্গে PDF]

বর্তমানযুগে সমগ্র বিশ্বজুড়ে মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত যে বিপ্লব ঘটে চলেছে তাতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করছে আমাদের দেশ ভারতবর্ষ। ভারতবর্ষে মহাকাশ গবেষণার ইতিহাস নতুন নয়, বরং তাঁর এক প্রাচীন এবং ধারাবাহিক সূত্র রয়েছে। সেই সূত্র ধরে কিভাবে ভারত বর্তমান যুগের আধুনিক মহাকাশ গবেষণার পটভূমিকায় উপনীত হলো তা সংক্ষেপে আলোচনার উদ্দেশ্য আমাদের এই প্রতিবেদনের উপস্থাপনা।

মহাকাশ গবেষণায় ভারত রচনা বৈশিষ্ট্য চিত্র

ভূমিকা:

মাথার উপরে আকাশপটে প্রতিমুহূর্তে কি আশ্চর্য সব ঘটনা ঘটে চলেছে তার রহস্য উদঘাটনের প্রয়াস মানুষ করে এসেছে সভ্যতার সেই আদি লগ্ন থেকে। তারপর সময়ের সাথে সাথে বিজ্ঞানের যত উন্নতি হয়েছে, ততই বেড়েছে মানুষের জ্ঞানের পরিধি এবং অবশেষে সকল বিপদের আশঙ্কা উপেক্ষা করে মানুষ তার প্রিয় পৃথিবী ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছে পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে মহাকাশের বুকে কিংবা কখনো গ্রহান্তরে।

আমাদের দেশ ভারতবর্ষ সেই সুদূর অতীতকাল থেকে জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চায় সমগ্র বিশ্বকে পথ দেখিয়েছে। তাই বলা বাহুল্য প্রাচীন কিংবা আধুনিক কোন প্রকার মহাকাশ গবেষণাতেই ভারত পিছিয়ে থাকেনি কখনো। সকল প্রতিকূলতা এবং বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে পৃথিবীর বুকে মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রে ভারত হয়ে উঠেছে একটি অন্যতম উল্লেখযোগ্য নাম।

প্রাচীন ভারতবর্ষ ও মহাকাশ গবেষণা:

প্রাচীন ভারতবর্ষ ছিল সমগ্র বিশ্বে উৎকৃষ্ট জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র স্বরূপ। খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রাচীন ভারতবর্ষের সেইসব মহর্ষি জ্ঞানী ব্যক্তিদের মনেও মহাকাশ ও মহাশূন্য সম্পর্কে জেগেছিল অদম্য কৌতূহল। সেই কৌতুহল নিরসনের জন্য প্রাচীন ভারতীয় প্রাজ্ঞ ব্যক্তিদের মধ্যে বিকাশ লাভ করেছিল মহাকাশ চর্চা, বিশেষত জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত গবেষণা।

সেই ইতিহাস পুনরুদ্ধার করতে গিয়ে বর্তমান যুগে উঠে আসে কালজয়ী কিছু নাম: আর্যভট্ট, বরাহমিহির প্রমুখ। প্রাচীন ভারতবর্ষের এইসকল মানুষগুলি শত প্রতিকূলতা এবং সর্বোপরি প্রযুক্তির অভাব সত্ত্বেও নিরন্তর গবেষণা চালিয়ে গিয়েছেন মহাশূন্য সংক্রান্ত অদম্য কৌতূহল নিরসনের উদ্দেশ্যে।

সারা বিশ্বকে আর্যভট্ট সর্বপ্রথম জানিয়েছিলেন পৃথিবী নয় বরং সূর্যই হল পৃথিবীর কেন্দ্র। তিনি তার এই তত্ত্বকে গণিতের মাধ্যমে প্রমাণ করে দেখিয়েছিলেন। অন্যদিকে ঋষি-সম চিন্তাবিদ বরাহমিহির তার দীর্ঘ গবেষণার ফল হিসেবে রচনা করে গিয়েছেন সূর্যসিদ্ধান্তিকার মতন বিভিন্ন গ্রন্থ। তাদের এই সকল গবেষণাগুলি হল প্রাচীন ভারতবর্ষের মহাকাশ বিজ্ঞান চর্চার আকর। 

স্বাধীনতা-উত্তর ভারতবর্ষে মহাকাশ গবেষণার সূত্রপাত:

সময়ের সাথে সাথে ভারতবর্ষের বুক থেকে বিভিন্ন আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক কারণে প্রাচীন বিজ্ঞান চর্চার ধারণা লোপ পেয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ভারতবর্ষের জ্ঞানী মানুষদের মন থেকে মহাকাশ গবেষণা সংক্রান্ত চিন্তা কোনদিন সম্পূর্ণরূপে মুছে যায়নি। হয়তো সে কারণেই ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষের স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিত পরেই সদ্যোজাত একটি দেশে মহাকাশ গবেষণার গুরুত্ব অনুধাবন করে দেশে আধুনিক মহাকাশ গবেষণার প্রচলনের উদ্যোগ নেন বিলেত ফেরত এক ভারত সন্তান: ডঃ বিক্রম আম্বালাল সারাভাই।

তিনি ভারতীয় আধুনিক মহাকাশ গবেষণার প্রাণপুরুষ। ভারতের এই প্রবাদপ্রতিম সন্তান কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করে দেশে ফিরে ১৯৬৬ সালে আমেদাবাদে প্রতিষ্ঠা করেন কমিউনিটি সায়েন্স সেন্টার, এটি বর্তমানে বিক্রম সারাভাই স্পেস সেন্টার নামে পরিচিত। তাছাড়া বিক্রম সারাভাই-এর হাত ধরেই প্রতিষ্ঠিত হয় ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো। এই কারণেই তাকে ভারতের মহাকাশ গবেষণার জনক বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে।

ইসরো: প্রতিষ্ঠা ও প্রাথমিক পর্যায়:

ভারতীয় মহাকাশ গবেষণার প্রাণপুরুষ ডঃ বিক্রম সারাভাই-এর একান্ত উদ্যোগে এবং ভারত সরকারের সহায়তায় ১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসরো। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ইসরো নিজের উদ্যোগে কিংবা বিভিন্ন পাশ্চাত্য দেশের সহযোগিতায় মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রে অগ্রসর হবার প্রয়াস চালিয়ে এসেছে।

ইসরোর একান্ত প্রচেষ্টায় ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে মহাকাশের উদ্দেশ্যে পাড়ি দেয় ভারতের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ ‘আর্যভট্ট’। এর পরবর্তী সময় থেকে ইসরোকে খুব একটা ঘুরে তাকাতে হয়নি। ব্যর্থতা এসেছে অসংখ্য, একথা সত্য; তবে ব্যর্থতা যে সাফল্যের পথ সুগম করে, এই চিরসত্যকে বুকে নিয়ে ইসরো মহাকাশ গবেষণায় কোনদিন হতোদ্যম হয়নি। যার ফল হিসেবে পরবর্তীতে অনিবার্য সাফল্যও এসেছে ইসরোর ঝুলিতে। 

মহাকাশ গবেষণায় ভারতের সাফল্য:

মহাকাশ গবেষণায় ভারতের সাফল্যের পেছনে আর যে মানুষটির কথা না বললেই নয় তিনি হলেন ভারতবর্ষের মিসাইল ম্যান নামে পরিচিত সমগ্র ভারতবাসীর পরমপ্রিয় বিজ্ঞানী ডঃ এপিজে আবদুল কালাম। তার দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টাতেই তৈরি হওয়া রকেটে ভর করেই ভারতের মহাকাশযান গুলি প্রথম পাড়ি জমায় অন্তরীক্ষে।

এ প্রসঙ্গে উঠে আসে আর একজন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তির নাম। তিনি সতীশ ধাওয়ান। ইসরোর উন্নতিকল্পে এই মানুষটির অবদানের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতেই হয়। এমন সব প্রবাদপ্রতিম ভারতীয় বিজ্ঞানীদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এখনো পর্যন্ত ইসরোর সর্বমোট মহাকাশ অভিযানের সংখ্যা ১১১। বলা বাহুল্য এর মধ্যে অধিকাংশই সফল কিংবা আংশিক সফল। সফল হওয়া এই সফল অভিযান গুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘মঙ্গলযান’, ‘চন্দ্রযান ১’ ইত্যাদি।

মহাকাশ গবেষণা ও ভবিষ্যৎ ভারতবর্ষ:

ভারতীয় বিজ্ঞানীদের প্রখর বুদ্ধিমত্তা এবং মহাকাশ গবেষণার উন্নতিকল্পে ঐকান্তিক প্রচেষ্টার উপর ভিত্তি করে বর্তমানে ভারত বিশ্বে মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রে একেবারে প্রথম সারিতে উঠে এসেছে। এই পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আমরা আশা করতেই পারি, সেদিন আর বেশি দূরে নেই যখন আমাদের দেশ ভারত বর্ষ আবার মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রে স্থাপন করবে দৃষ্টান্তের পর দৃষ্টান্ত, পথ দেখাবে সমগ্র পৃথিবীকে।

সমগ্র বিশ্বের তরফেই মনে করা হয় ভারতের মহাকাশ গবেষণার ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল এবং আশাপ্রদ। ইসরো ইতিমধ্যেই ভবিষ্যতে তাদের আগামী ১০ বছরের মহাকাশ অভিযানগুলির কথা ঘোষণা করে দিয়েছেন। ভবিষ্যতের এইসকল অভিযান গুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্থান পাচ্ছে ‘চন্দ্রযান ৩’, ‘গগনযান’, সূর্যকে উদ্দেশ্য করে ‘আদিত্য এল-১’ ইত্যাদি। 

উপসংহার:

একথা সমগ্র বিশ্ববিদিত যে ভারত সেই সুদূর অতীতকাল থেকেই উদ্ভাবনী বিভিন্ন চিন্তাভাবনার পীঠস্থান। সেই আমাদের দেশ ভারতবর্ষ বর্তমানে যখন আধুনিক মহাকাশ গবেষণায় একের পর এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছে, তা দেখে একজন ভারতবাসী হিসেবে চোখ জুড়িয়ে যেতে বাধ্য। ভারতের এই মহাকাশ গবেষণার ওপর ভিত্তি করে একথা বলাই যায় যে একবিংশ শতাব্দী হতে চলেছে অন্তত মহাকাশ গবেষণায় ভারতের এক সাফল্যের শতক। কবির ভাষায় তাই আপন মনে ভেসে ওঠে স্বগোতক্তি- “ভারত আবার জগত সভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে”।।


মহাকাশ গবেষণায় ভারত সংক্রান্ত উপরিউক্ত এই আলোচনায় আমরা বিষয়টির সবকটি দিককে পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে বিচারের পর যথাসম্ভব সংক্ষিপ্ত ভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। তাছাড়া পরীক্ষার প্রয়োজন অনুযায়ী উক্ত প্রবন্ধটিতে আমরা একটি সাধারণ শব্দসীমা বজায় রাখারও যথাসম্ভব চেষ্টা করেছি।

আশাকরি আমাদের এই প্রয়াস আপনাদের ভাল লেগেছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তা যথাযথভাবে আপনাদের সহায়তা করতে পারবে। উপরিউক্ত প্রতিবেদনটি সম্পর্কে আপনাদের মতামত কমেন্টের মাধ্যমে বিশদে আমাদের জানান। আপনাদের মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা চেষ্টা করব আপনাদের মতামত অনুযায়ী আমাদের লেখনীকে আরও উন্নত করে তোলার। তাছাড়া যদি এমনই অন্য কোন রচনা পড়তে চান সে বিষয়েও আমাদের অবগত করুন। আমরা অতি সত্বর সেই রচনাটি আপনার কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করব। ধন্যবাদ।

Print Friendly, PDF & Email

রাকেশ রাউত

রাকেশ রাউৎ বাংলা রচনা ব্লগের নির্বাহী সম্পাদক। ইনি শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী একজন মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার। ইনি বাংলা রচনার সম্পাদকীয় দলকে লিড করেন। রাকেশ দীর্ঘ ৫ বছর যাবৎ বাংলা কনটেন্ট এডিটিং এর সাথে যুক্ত আছেন। ইনি বাংলা রচনা ছাড়াও নামকরণ এবং বাংলা জীবনীর মতো নামকরা সাইটের সম্পাদকীয় দলের একজন অন্যতম সদস্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট