দেখে নিন ইংরেজিতেও রচনা

প্রতিযোগিতার সুফল ও সংকট রচনা/ প্রতিযোগিতা নয় সহযোগিতা রচনা [সঙ্গে PDF]

বর্তমান যুগে প্রতিযোগিতা জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ স্বরূপ। মানুষ বর্তমানে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হয়। তবে জীবনে বেঁচে থাকার পথে প্রতিযোগিতার বিকল্প হিসেবে সহযোগিতার নীতি অনুসরণ করলে সামাজিক বন্ধনের শিথিলতা জনিত সংকট দূরীভূত হতে পারে। সমাজ তথা সমগ্র মানব সভ্যতার এই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিকটিতে আলোকপাত করার উদ্দেশ্য নিয়েই আমাদের আজকের এই প্রবন্ধের উপস্থাপনা।

প্রতিযোগিতার সুফল ও সংকট রচনা বৈশিষ্ট্য চিত্র

ভূমিকা:

পৃথিবীতে বেঁচে থাকার পথ কোন জীবের পক্ষেই একেবারে মসৃন হয়না। প্রত্যেকটি প্রাণীকেই তার জীবনে বেঁচে থাকার নিমিত্ত প্রতিদিন সংগ্রাম করতে হয়। দিনের শেষে সেই সংগ্রামে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট প্রাণীটির অস্তিত্বও লোপ পায়। এই হল প্রকৃতির সাধারণ নিয়ম। এই নিয়ম অনুসারেই প্রাণী জগৎ লক্ষ লক্ষ বছর ধরে বিবর্তিত হয়েছে এবং হতে থাকবে। মানুষও স্বাভাবিকভাবেই এই নিয়মের ব্যতিক্রম নয়।

নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সংগ্রাম করতে করতে মানুষ যখন সংগ্রামকেই জীবনের সমার্থক করে তুলেছে তখনই উদ্ভব হয়েছে প্রতিযোগিতার। একটা সময় অবধি মানুষকে সংগ্রাম করতে হয়েছে প্রকৃতির বিরুদ্ধে। আর সেই সংগ্রামে জয়ী হয়ে যখন মানুষ পৃথিবীর অন্যান্য জীবকুলের ওপর নিজের সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে তখন আত্মোন্নতি ও জীবনে এগিয়ে যাওয়ার অদম্য বাসনা মানুষকে চালিত করেছে প্রতিযোগিতার পথে।

প্রতিযোগিতার স্বরূপ:

প্রতিযোগিতা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার প্রারম্ভে প্রতিযোগিতার প্রকৃত স্বরূপ আসলে কি তা নিয়ে কিছু কথা বলা প্রয়োজন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য এই প্রতিযোগিতা বলতে বর্তমানকালীন আধুনিক প্রতিযোগিতার কথা বিশেষ ভাবে বোঝানো হচ্ছে। আধুনিক মানুষের এই প্রতিযোগিতা পূর্বোল্লিখিত জীবন সংগ্রামের সঙ্গে সমার্থক নয়। এই দুইয়ের চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য একই রকম হলেও প্রতিযোগিতা এবং সংগ্রামের মধ্যে প্রাথমিক পার্থক্য হল প্রতিযোগিতার চালিকাশক্তি বাসনা এবং সংগ্রামের চালিকাশক্তি হল অস্তিত্ব রক্ষা।

পৃথিবীর অন্যান্য সকল জীবকে নিজের প্রখর বুদ্ধিমত্তা দাঁড়া অতিক্রম করে মানুষ বর্তমান যুগে প্রতিমুহূর্তে একে অপরকে ছাপিয়ে যাবার বাসনায় ডুবে থাকতে ভালোবাসে। এই বাসনা থেকেই তারা নিজেদের অজান্তে নিজেকে সমগ্র পৃথিবীর প্রতিযোগী করে তোলে। প্রকৃতপক্ষে মানুষের মধ্যেকার এই সীমাহীন আকাঙ্খাই সমাজে প্রতিযোগিতার জন্ম দেয়। 

সভ্যতার ইতিহাসে প্রতিযোগিতা:

যেদিন ধীরে ধীরে পৃথিবীর অন্যান্য জীবকুলের ওপর মানুষের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা সম্পূর্ণ হলো, সেই দিন থেকেই এই পৃথিবীতে প্রতিযোগিতার নিদর্শন পাওয়া যায়। আদিম প্রাগৈতিহাসিক যুগে শিকারের প্রতিযোগিতা, অধিকারের প্রতিযোগিতা; কিছুকাল পরে বিস্তারের প্রতিযোগিতা ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকারের প্রতিযোগিতার নিদর্শন ইতিহাসে পাওয়া যায়। তবে তখনো এই প্রকারের প্রতিযোগিতা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ হয়ে ওঠেনি।

দৈনন্দিন জীবনে প্রতিযোগিতা কেবলমাত্র বিভিন্ন প্রকারের খেলাধুলা, শরীরচর্চা, জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা ইত্যাদির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। প্রাচীন গ্রীক ও রোমান সভ্যতার ইতিহাসে এমন প্রতিযোগিতার নিদর্শন অজস্র মেলে। তবে ভারতবর্ষে বরাবরই সকল ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতাকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। কারণ ভারতীয় দর্শন অনুসারে প্রতিযোগিতা মানুষের মধ্যে লোভের উদ্রেক ঘটায় এবং লোভ মানুষকে পাপের পথে চালিত করে। সে কারণে প্রাচীন ভারতবর্ষ আত্মোন্নতির জন্য প্রতিযোগিতা নয় বরং কর্মের উপর অধিক গুরুত্ব স্থাপন করেছিল। 

সমাজে প্রতিযোগিতার রোজনামচা:

প্রাচীন যুগে বিশ্বজুড়ে প্রতিযোগিতার রূপ যাই হোক না কেন, বর্তমানে সমগ্র বিশ্বে প্রতিযোগিতার চরিত্র সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে। প্রতিযোগিতা বিনোদনের সীমানা অতিক্রম করে হয়ে উঠেছে মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। মানুষ বর্তমানে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সকল ক্ষেত্রেই প্রতিযোগিতাকে স্থান দিয়েছে।  বর্তমান যুগে চরম ভোগবাদী জীবনে অন্যকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাবার বাসনা মানুষকে প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। শৈশব ও কৈশোরে বিদ্যালয়ে জ্ঞান অর্জনের পরিষরে, যুবা অবস্থায় আত্মপ্রতিষ্ঠার পরিসরে, জীবনের মধ‍্যাহ্নে আত্মোন্নতিতে, এমনকি জীবনাবসানে শেষকৃত্য সম্পাদনেও আজ আঁচ লেগেছে প্রতিযোগিতার। বিশ্বে বিবর্তনের যোগ্যতমের উদবর্তন তত্ত্বকে মানুষ আজ নিজের জীবনে ব্যবহার করে সীমাহীন উন্নতি সাধন করতে চায়।

প্রতিযোগিতার সুফল ও কুফল:

পৃথিবীর অন্যান্য সকল কিছুর মত প্রতিযোগিতারও নির্দিষ্ট কিছু সুফল এবং কুফল রয়েছে। সর্বাগ্রে বর্তমান পৃথিবীতে প্রতিযোগিতা জীবনমুখী ভূমিকার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। আজকের এই জটিল মনস্তত্ত্বের বিশ্বে প্রতিযোগিতা মানুষকে প্রতিমুহূর্তে জীবনের উপলব্ধির সুযোগ করে দেয়। তাছাড়া মানব সভ্যতার আজকের এই অভাবনীয় উন্নতি এক রকম ভাবে দেখতে গেলে এই প্রতিযোগিতারই ফসল। মানুষ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে অন্যকে ছাপিয়ে যাবার বাসনায় কখন যে নিজেই নিজেকে ছাপিয়ে গেছে তা সে বুঝতেও পারেনি।

প্রতিযোগিতা মানুষকে জীবনের উপযোগী করে গড়ে তোলে এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করতে প্রেরণা যোগায়। তবে শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক এই প্রেরণা কেবলমাত্র মানোন্নয়নই ঘটায়, আত্মোন্নতি ঘটাতে পারে না। প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষায় শিক্ষার্থীর সঙ্গে শিক্ষার মিথস্ক্রিয়া সম্পন্ন হয় না। ফলে শিক্ষার মূল লক্ষ্য অধরাই থেকে যায়। তাছাড়া এই প্রতিযোগিতার দ্বারাই একে অপরকে ছাড়িয়ে যাবার বাসনায় মানুষ অজান্তেই অন্যের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন হয়ে পড়ে। পারস্পারিক সহাবস্থানের মানবিক নীতিকে অস্বীকার করে আত্মকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনা সূত্রপাতও এখানেই ঘটে।

সমাজে প্রতিযোগিতার সংকট:

সমাজের ওপর প্রতিযোগিতার সুফলগুলির তুলনায় কুফলের প্রভাবই অধিক লক্ষ্য করা যায়। আধুনিক প্রতিযোগিতামূলক জীবনচর্যার মানসিকতা মানুষের মধ্যে যে আত্মকেন্দ্রিকতা বোধের জন্ম দেয় তার ফলস্বরূপ শিথিল হয়ে ওঠে সমাজের বন্ধন। তাছাড়া জন্মের অব্যবহিত পর থেকে ছেলেমেয়েদের প্রতিযোগিতামূলক জীবনচর্যার মাধ্যমে গড়ে তুললে তাদের চরিত্রে শিষ্টাচার, বন্ধুত্ব, স্নেহ-প্রীতি-ভালোবাসা ইত্যাদি মানবিক গুণগুলির বিকাশ ঘটে না।

জীবনের মূল লক্ষ্য আত্মকেন্দ্রিক স্বাচ্ছন্দ্য অর্জন নয়, বড় সমাজের সার্বিক সাফল্য অর্জনেই লুকিয়ে থাকে জীবনের প্রকৃত সার্থকতা। মানুষের চরিত্রে সংশ্লিষ্ট মানবিক গুণগুলো সমাহার না ঘটলে সমাজ কখনো সাফল্যের মুখ দেখতে পারে না। ফলে সমাজবদ্ধ জীব হিসেবে মানুষের জীবনও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। আজকের যুগে সীমাহীন প্রতিযোগিতার ফলে সমাজের বুকে অহরহ ঘনীভূত হতে দেখা যায় এই প্রকার সংকট। 

প্রতিযোগিতা বনাম সহযোগিতা:

প্রতিযোগিতামূলক জীবনচর্যার ফলে সমাজের ওপর ঘনীভূত হওয়া এই সংকটের কথা মাথায় রেখে বর্তমান যুগে বিশ্বের বিভিন্ন মহলে উঠে আসছে প্রতিযোগিতার বদলে সহযোগিতার কথা। মানুষ একান্তই সমাজবদ্ধ জীব। সভ্যতা যতই উন্নতির শিখরে পৌছাক না কেন মানুষ কখনই স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারবে না। তাই একে অন্যকে ছাপিয়ে যাবার বাসনায় প্রতিযোগী মানসিকতা গড়ে তোলার প্রবণতা একেবারেই বৃথা।

সভ্যতার উন্নতিই যদি মূল লক্ষ্য হয় তবে প্রতিযোগিতার বদলে সহযোগিতা সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে অনেক বেশি সাহায্য করতে পারে। প্রতিযোগিতার দ্বারা মানুষ পৃথিবীকে নিজের প্রতিপক্ষে পরিণত করে। কিন্তু সহযোগিতায় সমগ্র পৃথিবী হয় মানুষের বন্ধু। আরে কথা বলাই বাহুল্য কোন কাজ একা সম্পন্ন করার থেকে একজোট হয়ে সম্পন্ন করা অনেক বেশি সহজ। তাই সনাতন ভারতীয় ভাবধারা অনুসারেই আমাদের আত্মসমীক্ষা এবং সহযোগিতার ধারণার অনুসারী হয়ে উঠতে হবে। 

উপসংহার:

 বর্তমান যুগের আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতা সম্পন্ন ভোগবাদী জীবনচর্যাকে পরিত্যাগ করে মনুষ্যত্ব দ্বারা একটি সুন্দর পৃথিবী ও সুন্দর সমাজ গড়ে তোলাই মানব জীবনের মূল লক্ষ্য হওয়া দরকার। প্রতিযোগিতা আত্মকেন্দ্রিক উন্নতিতে মানুষকে সহায়তা করলেও জীবনের সেই আদর্শ লক্ষ্য থেকে পদে পদে সমাজকে দূরে নিয়ে যায়। অন্যদিকে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সহাবস্থানের নীতি একদিকে যেমন সমাজের সার্বিক উন্নয়নে সাহায্য করে অন্যদিকে মানুষের মধ্যে সাধারণ মানবিক গুণাবলীর বিকাশেরও উন্মেষ ঘটায়। ফলে একটি সুন্দর পৃথিবী ও সুন্দর সমাজ গড়ে তোলার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে কয়েক ধাপ এগিয়ে যায়। 


‘প্রতিযোগিতার সুফল ও সংকট’ শীর্ষক এই প্রবন্ধটিতে মানব জীবনে প্রতিযোগিতার গুরুত্ব, সমাজের ওপর প্রতিযোগিতার সংকট ইত্যাদি বিভিন্ন দিক সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার চেষ্টা করা হলো। আলোচ্য এই প্রবন্ধটিকে ‘প্রতিযোগিতা নয় সহযোগিতা’- এই শিরোনামেও অপরিবর্তিত ভাবে উপস্থাপন করা যেতে পারে। আশা করি এই প্রবন্ধটি সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে আপনার সকল প্রশ্নের উত্তর দিতে সক্ষম হয়েছে।

উপরিউক্ত প্রতিবেদনটি সম্বন্ধে আপনার সকল প্রকার মতামত নিচে কমেন্টের মাধ্যমে আমাদের জানান। আপনাদের মতামত আমাদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। আমরা চেষ্টা করব আপনাদের চাহিদা অনুযায়ী আমাদের লেখনীকে আরও উন্নত করে তোলার। তাছাড়া যদি এমনই অন্য কোন রচনা পড়তে চান সে বিষয়েও আমাদের অবগত করুন। আমরা অতি সত্বর সেই রচনাটি আপনার কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করব। 

ধন্যবাদ।

Print Friendly, PDF & Email

রাকেশ রাউত

রাকেশ রাউৎ বাংলা রচনা ব্লগের নির্বাহী সম্পাদক। ইনি শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী একজন মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার। ইনি বাংলা রচনার সম্পাদকীয় দলকে লিড করেন। রাকেশ দীর্ঘ ৫ বছর যাবৎ বাংলা কনটেন্ট এডিটিং এর সাথে যুক্ত আছেন। ইনি বাংলা রচনা ছাড়াও নামকরণ এবং বাংলা জীবনীর মতো নামকরা সাইটের সম্পাদকীয় দলের একজন অন্যতম সদস্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট