নারী শিক্ষার গুরুত্ব প্রবন্ধ রচনা [PDF]

লিখেছেন: Rakesh Routh

খবরের কাগজ খুললেই দেখতে পাওয়া যায় নারী নির্যাতনের নিষ্ঠুর রোমহর্ষক কাহিনী। স্বাধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রতি নারীকেই হতে হবে অগ্রণী।সংগ্রাম না করলে কারো হাতে কেউ অধিকার তুলে দেয় না।এই সংগ্রামের অন্যতম অস্ত্র শিক্ষা।তাই সমাজে নারী জাগরণের পটভূমি তৈরি করতে প্রয়োজন ব্যপক নারীশিক্ষা।এই নিয়ে আজকের বিষয় নারী শিক্ষার গুরুত্ব প্রবন্ধ রচনা

নারী শিক্ষার গুরুত্ব প্রবন্ধ রচনা বৈশিষ্ট্য চিত্র

ভূমিকা:

সমাজে নারী শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। নারী শিক্ষার গুরুত্ব আলোচনা করতে গিয়ে প্রথমে যে কথাটি আমাদের মনে আসে সেটি হল ‘আমাকে শিক্ষিত মা দাও, আমি শিক্ষিত জাতি দিব’- নেপোলিয়ান বোনাপোর্ট এর এই চিরস্মরণীয় উক্তিটি।

একজন শিক্ষিত নারী একটি পরিবারকে শিক্ষিত করতে পারে। একজন পুরুষ মানুষকে শিক্ষা দেওয়া মানে একজন ব্যক্তিকে শিক্ষিত করে তোলা, আর একজন মেয়ে মানুষকে শিক্ষা দেওয়া মানে একটি গোটা পরিবারকে শিক্ষিত করে তোলা।

নারীশিক্ষার ইতিহাস:

ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে এদেশের মেয়েরা লেখাপড়ার সুযোগ মোটেও পেত না। অভিজাত পরিবারের মেয়েরা নিজেদের বাড়িতেই শিক্ষা গ্রহণ করতেন। এই প্রেক্ষাপটে ব্যাপকভাবে মেয়েদের লেখাপড়ার সুযোগ সৃষ্টির জন্য নবযুগের ব্যক্তিদের প্রচেষ্টার ফলে বাংলার নারী শিক্ষা জাগরণের সূচনা ঘটে।

শ্রীরামপুরের মিশনারিরাই নারী শিক্ষার উদ্যোগ নেন সর্বপ্রথম, যদিও খ্রিস্টধর্মের প্রসারই ছিল তাদের আসল লক্ষ্য। ১৮১১ সালে প্রায় ৪০টি বালিকা নিয়ে উইলিয়াম কেরী ও মার্শম্যান ধর্মশিক্ষার জন্য প্রথম একটি বালিকা বিদ্যালয় চালু করেন।

১৮১৮ সালে চুঁচুড়ায় বালিকাদের জন্য আলাদা একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন লন্ডন মিশনারি সোসাইটির রবার্ট মে। এরপর স্থানীয় ব্যাপটিস্ট মিশনারির নারীদের উদ্যোগে অবিভক্ত বাংলায় প্রথম মেয়েদের শিক্ষা বিস্তারের প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮১৯ সালের মে-জুন মাসে কলকাতায়। প্রতিষ্ঠানটির নাম ছিল ‘দি ফিমেল জুভেনাইল সোসাইটি’।

এই প্রতিষ্ঠান থেকে বাংলা ভাষায় শিক্ষা দেওয়ার জন্য, জাতিধর্ম নির্বিশেষে ছাত্রীদের সুযোগের জন্য কয়েকটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়। ১৮৬৩-৬৪ সালে ঢাকার শিক্ষক প্রশিক্ষণ স্কুলের বা নর্মাল স্কুলের ছাত্রীর সংখ্যা ছিল ১৬। সেখানে উঁচু বংশের মহিলারা পড়তে আসতেন না।

ভিড় করতেন খ্রিস্টান মহিলারা। ১৮৬৭-৬৮ সালে পূর্ববঙ্গের ছয়টি সাধারণ স্কুলে ছয়জন শিক্ষয়িত্রী ছিলেন। তাদের বেতন ছিল ১০ থেকে ১৫ টাকা। উল্লেখযোগ্য যে, ১৯৮৬-৮৭ সালে চারটি ট্রেনিং স্কুলে শিক্ষিকা প্রশিক্ষণের জন্য ২৪২ জন ছাত্রী পড়ত। ১৮৯৯-১৯০০ সালে তা বেড়ে ৭০১ জন হয়েছিল।

আরো একজন বিদুষী ইংরেজ মহিলা অ্যানেট অ্যাক্রয়েড (বিভারিজ), বাংলার নারীদের শিক্ষার বিষয়ে নিজেকে যথেষ্ট আত্মনিয়োগ করে এই দেশের ইংরেজি শিক্ষায় উদ্যোগী ব্যক্তিদের সাহায্যে এগিয়ে যান এবং নিজেও একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। নারীশিক্ষার উদ্দেশ্য সতীদাহপ্রথা, বাল্যবিবাহ, প্রভৃতি অব্যবস্থাপনা রোধ করে নারী শিক্ষার প্রসার ঘটানো।

নারীশিক্ষার উদ্দেশ্য:

নারী মানব জাতির অর্ধেক অংশ। জনসমষ্টির অর্ধেককে শিক্ষার বাইরে রেখে সমাজের পক্ষে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এই অর্ধেক জনগণকে সুশিক্ষিত করতে না পারলে জাতীয় উন্নয়ন, অগ্রগতি ও কল্যাণ আসতে পারে না। তাই নারী শিক্ষার একান্ত প্রয়োজন। নিম্নে নারী শিক্ষার উদ্দেশ্য বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলোঃ

কর্মসংস্থানের জন্য নারী শিক্ষা: নারীকে স্বাবলম্বী হতে হলে কর্মসংস্থানের প্রয়োজন। কেননা কর্মসংস্থানই নারীকে আর্থিক নিরাপত্তা দিতে পারে। নারীর যথোপযুক্ত কর্মসংস্থানের জন্য শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম।

পরিবারের সুরক্ষায় নারী শিক্ষা: একটি পরিবারের সুরক্ষায় একজন শিক্ষিত নারী একটি সুরক্ষিত দুর্গের মতো কাজ করে। কারণ একজন সুশিক্ষিত নারী স্বাস্থ্য সচেতন। আর একজন স্বাস্থ্য সচেতন মা, স্ত্রী বা বোন, তার সন্তান, স্বামী বা ভাই-বোনকে সব সময় সুরক্ষিত রাখতে সচেষ্ট থাকেন।

সন্তানের শিক্ষার জন্য নারী শিক্ষা: সন্তান তার জন্মের পর থেকে মায়ের সংস্পর্শেই বেশির ভাগ সময় থাকে। মায়ের আচার-আচরণ, কথাবার্তা সব কিছুই সন্তানকে প্রভাবিত করে। মা যদি শিক্ষিত হন তাহলে সন্তান অবশ্যই শিক্ষিত হবে।

দেশগঠনে নারী শিক্ষার গুরুত্ব:

আমাদের ভারতবর্ষের মোট জনসংখ্যার মধ্যে মহিলাদের সংখ্যা কম নয়। তাই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য নারী শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এতদিন পর্যন্ত বর্তমান দেশ গঠনে যতগুলো আন্দোলন হয়েছে।

সেই আন্দোলন গুলিতে কোনো না কোনো ভূমিকা নিয়েছে নারীরা। যুগ যুগ ধরে শিক্ষিত নারীরা তাদের সফলতার দৃষ্টান্ত রেখে গেছে। আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স প্রভৃতি দেশের নারীরা বিজ্ঞান সাহিত্য প্রভৃতি বিষয়ে পারদর্শী। ইন্দিরা গান্ধী ,কল্পনা চাওলা, মার্গারেট নোবেল, মাদার টেরিজা প্রভৃতি মহিলারা তাদের শিক্ষাদ্বারা বিশ্বব্যাপী পরিচিতি অর্জন করেছেন।

নারী শিক্ষা বিস্তারের উপায়:

নারী শিক্ষা প্রসারের জন্য কিছু কর্মসূচি গ্রহণ করা সরকারের তরফ থেকে উচিত, যেমন:

  • শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা উচিত।
  • মেয়েদের সামাজিক নিরাপত্তার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
  • নারী শিক্ষা প্রসারের জন্য সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা উচিত।
  • ১৮ বছরের থেকে কম বয়সের মেয়েদের বিবাহ বন্ধ করার জন্য আইনবাবস্থা আরও কঠোর করা উচিত।

উপসংহার:

একটি সমাজের সার্বিক অগ্রগতির জন্য নারী শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। নারী শিক্ষার প্রসারের ক্ষেত্রে প্রচলিত ধ্যান ধারণা ও মানসিকতা সবচেয়ে বড় বাধা। প্রত্যন্ত গ্রাম ও মফস্বল থেকে যে সব মেয়ে উচ্চ শিক্ষার আশায় শহরে ভিড় জমায় অনেক ক্ষেত্রেই তারা আশাহত হয়।

দীর্ঘমেয়াদী কোর্স, আবাসন সমস্যা, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা প্রভৃতি বিষয় ছাত্রীদেরকে মানসিক ও আর্থিক দিক থেকে বিপর্যস্ত করে তোলে। তাই এই সব বাধা দূর করে নারী শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। আর সেই জন্য নারীদেরও এগিয়ে আসতে হবে।


নারী শিক্ষার গুরুত্ব প্রবন্ধ রচনাটি পড়ে আপনার কেমন লাগলো কমেন্ট করে জানাবেন।আপনার একটি কমেন্ট আমাদের অনেক উৎসাহিত করে আরও ভালো ভালো লেখা আপনাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ায় জন্য।বানান ভুল থাকলে কমেন্ট করে জানিয়ে ঠিক করে দেওয়ার সুযোগ করে দিন।সম্পূর্ণ রচনাটি পড়ার জন্য আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

Print Friendly, PDF & Email
লেখক পরিচিতি
Rakesh Routh
রাকেশ রাউৎ বাংলা রচনা ব্লগের নির্বাহী সম্পাদক। ইনি শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী একজন মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার। ইনি বাংলা রচনার সম্পাদকীয় দলকে লিড করেন। রাকেশ দীর্ঘ ৫ বছর যাবৎ বাংলা কনটেন্ট এডিটিং এর সাথে যুক্ত আছেন। ইনি বাংলা রচনা ছাড়াও নামকরণ এবং বাংলা জীবনীর মতো নামকরা সাইটের সম্পাদকীয় দলের একজন অন্যতম সদস্য।

পরবর্তী পড়ুন

আমার প্রিয় শিক্ষক রচনা [সঙ্গে PDF]

আমাদের প্রত্যেকের বিদ্যালয়ে অনেক শিক্ষক থাকেন, তাঁরা প্রত্যেকেই আমাদের শিক্ষাদানের মধ্য দিয়ে জীবনের সঠিক পথ প্রদর্শনে সহয়তা করেন। তাঁরা প্রত্যেকেই […]

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রচনা [সঙ্গে PDF]

বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে দেশের সমস্ত মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে যিনি অন্যতম ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনি আর কেউ নন,বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু […]

উন্নয়ন বনাম পরিবেশ রচনা [সঙ্গে PDF]

মানুষ যেদিন প্রথম পাথরে পাথর ঘষে আগুন জ্বালাতে শিখেছিল সেদিন থেকেই শুরু হয়েছিল এক পরিবেশ বনাম উন্নয়ন নামের এক মহাযুদ্ধ। […]

ছাত্র সমাজ ও রাজনীতি বা ছাত্রজীবনে রাজনীতি রচনা [সঙ্গে PDF]

ছাত্ররাজনীতি আসলে ভালো নাকি মন্দ তা নিয়ে বিতর্কের অন্ত নেই। ইতিহাস খুঁজলে দেখা যাবে বিগত এক শতাব্দী ধরে রাজনীতির নামে […]

বাংলার সংস্কৃতি রচনা [সঙ্গে PDF]

সভ্যতা ও সংস্কৃতি, আমাদের জীবনের এই দুটি অংশ পরস্পরের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে রয়েছে যে তা বিশ্লেষণ করা যায় না।সভ্যতার ক্রমবিকাশের […]

ভারতের স্বাধীনতা দিবস রচনা [সঙ্গে PDF]

ভারতমাতার বহু বীর সন্তান অনেক রক্তের বিনিময়ে দীর্ঘ সংগ্রামের পর স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন আমাদের। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ ই আগস্ট ইংরেজ […]

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Proudly Owned and Operated by Let Us Help You Grow Online ©️