দেখে নিন ইংরেজিতেও রচনা

নারীর অধিকার রচনা [সঙ্গে PDF]

নারীরা হলেন পুরুষের মতোই সমাজের অপরিহার্য অবিচ্ছেদ্য একটি অঙ্গ। নারী ছাড়া কোনো দিনই একটি সমাজ সম্পূর্ণতা লাভ করতে পারে না। পুরুষরা যদি সভ্যতাকে বহন করে নিয়ে যায়, তাহলে নারীই সেই সভ্যতার ধারক। তবে অতীতকাল থেকেই বিশ্বজুড়ে নারীরা বিভিন্নভাবে নানা প্রকার অবহেলার শিকার হয়ে নিজেদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে। পৃথিবীর সার্বিক উন্নতির জন্য নারীর অধিকার একটি সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া একান্ত প্রয়োজন। এই প্রয়োজনের প্রাসঙ্গিকতার ওপর ভিত্তি করেই আমাদের আজকের প্রতিবেদনের উপস্থাপনা।

নারীর অধিকার রচনা বৈশিষ্ট্য চিত্র

ভূমিকা:

এ বিশ্বসমাজ সাধারণভাবে মানবজাতির লিঙ্গ ভিত্তিক বিভাজন অনুযায়ী পুরুষ ও নারী এই দুটি ভাগে বিভক্ত। নারী ও পুরুষ উভয়েই এ পৃথিবীর তথা সৃষ্টির দুটি পরম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এই অঙ্গটির সব সময় একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে থাকে। একটি ছাড়া অপরটি কখনোই সম্পূর্ণতা লাভ করতে পারে না। তাই সমাজ সৃষ্টির এই দুটি অপরিহার্য অঙ্গ স্কন্ধে ভর করেই উন্নতির পথে এগিয়ে যায়। সেই কারণেই নারী এবং পুরুষের মধ্যে কোন একটির উন্নয়ন ঘটলে সমাজের সার্বিক উন্নতি সাধিত হতে পারে না।

সমাজের প্রকৃত উন্নতির জন্য প্রয়োজন নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল মানুষের সার্বিক উন্নয়ন। উন্নয়ন বলতে মূলত এ ক্ষেত্রে শিক্ষাকে বোঝানো হয়ে থাকে। শিক্ষা হল মানব জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। শিক্ষা ছাড়া কখনোই একজন মানুষ, পুরুষ হোক বা নারী, মানসিকভাবে উন্নত হতে পারে না। সেই কারণে সমাজ তথা এ বিশ্বের অবগতির জন্য পুরুষের সাথে সাথে নারী শিক্ষারও একান্ত প্রয়োজন।

বিশ্বে নারীদের গুরুত্ব:

পৃথিবীতে নারীর অপরিসীম গুরুত্ব বর্তমান। নারী ছাড়া পৃথিবীতে সৃষ্টির অস্তিত্বকেই কল্পনা করা যায় না। নারী হলো সৃষ্টির প্রতীক। এ বিশ্বে নারী শরীর থেকে নতুন প্রাণ জন্ম নেয়। পুরুষ যেমন সমাজকে বাইরে থেকে টেনে নিয়ে যায়, নারী তেমন সমাজের অন্দরমহল থেকে সমাজকে অগ্রগতির দিকে প্রসারিত করে। তাই নারী হলো ধারক আর পুরুষ বাহক। আমরা প্রত্যেক দিন ঘরে ঘরে নারীদের দেখি ঘরের সমস্ত খুঁটিনাটি সামলে নিয়ে সংসারের গতিকে সচল রাখতে।

সেই নারীই আবার যখন সমাজের উচ্চতম পদে অধিষ্ঠান করে তখন সে অলংকৃত করে সমাজের বহিরাঙ্গকে। সেই কারণে পৃথিবীর বহু জায়গায় বিভিন্ন সময়ে নারীদের নিয়ে যে অবহেলার বাতাবরণ তৈরি হয়েছে অনতিবিলম্বে তা  হওয়া প্রয়োজন। ধারক উন্নত না হলে সমাজকে বহন করার ক্ষমতা পৃথিবীতে কারোর নেই। তাই বিশ্বে নারী সমাজের উন্নতি না হলে সমাজের সার্বিক উন্নতি কোনদিন সম্ভব নয়। 

আধুনিক শিক্ষা ও গবেষণায় নারী:

আধুনিক সভ্যতার মেরুদন্ড হল আধুনিক শিক্ষা ও গবেষণা। নারীরা যে সেখানেও যে কোনো পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সভ্যতার উন্নতিকল্পে অবদান রাখতে পারে তা বিশ্বজুড়ে বারবার প্রমাণিত হয়ে গিয়েছে। বর্তমানকালে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক গুরুত্বপূর্ণ অসংখ্য গবেষণায় নিয়োজিত মানুষদের মধ্যে রয়েছেন অসংখ্য নারী। এছাড়া প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিস্বরূপ নার্সারি ও মন্তেসরী স্কুল বিকশিত হয়েছিল নারীদের হাত ধরেই।

অতি সাম্প্রতিককালে চিকিৎসা সংক্রান্ত গবেষণা থেকে শুরু করে বিশ্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা মহাকাশ গবেষণাতেও নিয়োজিত হয়েছে নারীশক্তি। এই সকল নারীরা তাদের ব্যাপক মেধা ও অধ্যাবসায় দিয়ে নিজের নিজের সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। এ প্রসঙ্গে বিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগে পরমাণু গবেষণায় নিয়োজিত প্রাণ মাদাম কুরি, প্রথম মহাকাশে পাড়ি দেওয়া নারী ভ্যালেন্তিনা তেরেসকোভা কিংবা অতি সাম্প্রতিককালে করোনাভাইরাসের প্রতিষেধক টিকা আবিষ্কারকারী দলের নারীদের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। 

রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনায় নারীর গুরুত্ব:

রাষ্ট্র এবং সমাজ পরিচালনায় নারী যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে নাদিরা বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন স্থানে বারবার প্রমাণ করে দিয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে কোন রাষ্ট্র বা সমাজ হল একটি বৃহত্তর পরিবারেরই অনুরূপ। তাই যে নারী একজন গৃহকত্রী হিসেবে নিজের ঘরকে সুসংহত ভাবে পরিচালনা করতে পারেন তিনি একজন নেত্রী হিসেবে রাষ্ট্র বা সমাজকেও সুসংহত নেতৃত্ব দিতে পারেন। পৃথিবীতে অসংখ্য উদাহরণ আছে। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে সমাজে উচ্চ পর্যায়ের নেতৃত্বদানকারী নারীদের মধ্যে সিরিমাভো বন্দরনায়েক, ইন্দিরা গান্ধী, অ্যাঞ্জেলা মার্কেল, হিলারি ক্লিনটন, শেখ হাসিনা, থেরেসা মে প্রমুখের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় হয়।

ভারতীয় ঐতিহ্যে নারীর স্থান:

ভারতীয় ঐতিহ্য নারীকে সমাজের একটি উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। সনাতন ভারতীয় দর্শনে নারী এবং পুরুষ উভয়েই সভ্যতার সমান গুরুত্বপূর্ণ অংশস্বরূপ। সমাজে তাদের পৃথক পৃথক ভূমিকা থাকলেও অধিকারের ক্ষেত্রে কোন পার্থক্য নেই। আদি ভারতবর্ষীয় সমাজে নারী কিংবা পুরুষ সকলের অধিকারী সর্বদাই যোগ্যতার উপর নির্ভরশীল। সে কারণেই ভারতবর্ষে সমাজ তথা শাসন ব্যবস্থা পরিচালনার ক্ষেত্রে আদিযুগ থেকে নারীর ভূমিকা সংক্রান্ত উদাহরনের কোন অভাব নেই।

ভারতীয় সংস্কৃতির প্রাচীনতম ঐতিহ্য সিন্ধু সভ্যতা থেকে পাওয়া বিভিন্ন নিদর্শন থেকে আমরা আদিম ভারতীয় সমাজে নারীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানের কথা জানতে পারি। অন্যদিকে সনাতন ভারতীয় সংস্কৃতির প্রাচীনতম লিখিত গ্রন্থ বেদে লোপামুদ্রা, গার্গী, মৈত্রেয়ী প্রমূখ মহিষী নারীদের কথা পাওয়া যায়। এই সকল নারী আপন যোগ্যতাবলে সমাজে ব্রাহ্মণত্বের সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। এছাড়া দক্ষিণ ভারতীয় ইতিহাসে শাসনকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে বারবার ফিরে ফিরে আসে নারীদের ব্যাপক ভূমিকা ও প্রভাবের কথা। তাই একথা মেনে নিতেই হয় সনাতন ভারতীয় সংস্কৃতি সমাজে নারীকে শুধুমাত্র তার লিঙ্গপরিচয়ের মাপকাঠিতে বিচার না করে আপন যোগ্যতা অনুযায়ী তাকে দিয়েছে প্রাপ্য মর্যাদা।

বিশ্বব্যাপী নারীর মর্যাদার অবনমন:

প্রাচীন ভারতবর্ষ নারীকে যতই উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করুক না কেন, সময়ের সাথে সাথে আদি মধ্যযুগের প্রাক্কাল থেকেই ভারতবর্ষ তথা সমগ্র বিশ্ব জুড়ে শুরু হয়েছে নারীর মর্যাদার ব্যাপক অবনমন। বিশ্বব্যাপী সামরিক আগ্রাসনের যুগে বৌদ্ধিক যোগ্যতার স্থান যখন পেশিশক্তি দখল করল, তখন সভ্যতার ধারক নারীত্বের তুলনায় পৌরুষ হয়ে উঠল অধিক গুরুত্বপূর্ণ। সে কারণেই নারীরা ধীরে ধীরে সমাজে নিপীড়িত হতে হতে সভ্যতার অগ্রভাগ থেকে পিছনের দিকে সরে গেল।

গৃহের অন্দরমহলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হলো তাদের বিচরণ। সমাজে নারীদের মতামত, সাধারণ সামাজিক অধিকার ইত্যাদিও প্রতিনিয়ত ক্ষুণ্ন হতে থাকলো। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সমাজের একটি ব্যাপক সম্ভাবনাময় শক্তিকে অব্যবহারে ফেলে রাখার কারণে সামগ্রিকভাবে সভ্যতাই পিছিয়ে পড়ল। আর একসময়ের ব্যাপক মূল্যবোধসম্পন্ন শাণিত তরবারিতেও লাগলো মরিচার ছোঁয়া। 

নারীর ক্ষমতায়ন বিষয়ক আন্দোলন:

আধুনিক যুগের প্রথম লগ্ন থেকেই বিশ্বজুড়ে নারীরা আপন অধিকারের দাবিতে পথে নামতে শুরু করেছিলেন।  এই সময় থেকেই একটু একটু করে বিশ্বের সামাজিক মূল্যবোধের অন্যতম প্রধান দাবি হিসেবে উঠে আসে পুরুষ ও নারীর সমানাধিকারের ধারণা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই সংক্রান্ত আন্দোলন সৃষ্টির সাধারণ নিয়মকে অস্বীকার করে বাইনারি বা দ্বিচলবিশিষ্ট মৌলবাদ দ্বারা পরিচালিত হলেও পিছিয়ে থাকা নারীদের দাবিকে সমাজের অগ্রভাগে তুলে আনার ক্ষেত্রে এই আন্দোলনগুলির গুরুত্বকে কোনভাবেই অস্বীকার করা যায় না।

প্রথম সম্ভবত এই সংক্রান্ত আন্দোলন শুরু হয়েছিল ফরাসি বিপ্লবের অব্যবহিত পরে বিশ্বজুড়ে সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতার ধারণার ব্যাপক প্রচার-প্রসারের পরপরই। বিষয় সংক্রান্ত আন্দোলনে প্রথমদিকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নারীগণ। ভারতবর্ষে নারীর ক্ষমতায়ন সংক্রান্ত আন্দোলন ঔপনিবেশিকতার কারণে তুলনামূলকভাবে অনেক পরে প্রবেশ করেছে।

বিশ্বব্যাপী উদ্যোগ:

সমাজে নারীদের গুরুত্ব উপলব্ধি করেই হোক কিংবা বিশ্বব্যাপী নারীর ক্ষমতায়ন সংক্রান্ত আন্দোলনের ফল হিসেবেই হোক পৃথিবীর অসংখ্য উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলি বর্তমানে পিছিয়ে পড়া নারীশক্তিকে সমাজের অগ্রভাগে ফিরিয়ে আনার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করছে। পৃথিবীর অধিকাংশ স্থানেই পিছিয়ে পড়া নারীদেরকে সামাজিক উন্নয়নযজ্ঞের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনার জন্য সাহায্য নেয়া হচ্ছে সংরক্ষণের।

এছাড়া নারীর অধিকার, নারীর শিক্ষা ইত্যাদি বিষয়ে সচেতনতা সংক্রান্ত প্রচার-প্রসারেও বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে। ভারতবর্ষও এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। অতি সাম্প্রতিককালে ভারতবর্ষে কেন্দ্রীয় স্তর থেকে নারী শিক্ষার জন্য ‘বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও’ প্রকল্প, ১৮ বছর বয়সের পর নারীদের উচ্চশিক্ষার জন্য উৎসাহ ভাতা ইত্যাদি সাধু উদ্যোগও গৃহীত হয়েছে।

উপসংহার:

স্বামী বিবেকানন্দ এক সময় বলেছিলেন যে সমাজে মাতৃ শক্তি অবহেলিত হয়, সেই সমাজ কোন দিন নিজের মেরুদন্ড সোজা করে উঠে দাঁড়াতে পারে না। স্বামীজীর এই কথা সর্বাংশে সত্য। নারীশক্তির মধ্যে লুকিয়ে থাকে সভ্যতার উন্নতির এক বিপুল সম্ভাবনা। সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবক্ষেত্রে যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারলে আমাদের সভ্যতা সত্যই একটি দৃঢ় ভিত্তির উপর স্থাপিত হতে পারবে। তবে এ ক্ষেত্রে সমাজে সার্বিক মূল্যবোধের বাতাবরণ গড়ে তুলে আধুনিক নারী আন্দোলনের বিভিন্ন উগ্রতাগুলি দূর করে সভ্যতার স্বাভাবিক নারীত্ব এবং পৌরুষ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করে তোলাও প্রয়োজন।


উপরিউক্ত ‘নারীর অধিকার’ শীর্ষক আলোচ্য প্রবন্ধটিতে সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে সবকটি দিককে শব্দের পরিসীমার বন্ধনীতে যথাসম্ভব যথাযথভাবে আলোচনার চেষ্টা করা হয়েছে। আশা করি, আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আপনাদের ভালো লেগেছে। প্রতিবেদনটি সম্পর্কে আপনাদের মতামত কমেন্টের মাধ্যমে বিশদে আমাদের জানান। আপনাদের মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চেষ্টা করব আপনাদের মতামত অনুযায়ী আমাদের লেখনীকে আরও উন্নত করে তোলার। তাছাড়া যদি এমনই অন্য কোন রচনা পড়তে চান সে বিষয়েও আমাদের অবগত করুন। আমরা অতি সত্বর সেই রচনাটি আপনার কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করব। ধন্যবাদ।

Print Friendly, PDF & Email

রাকেশ রাউত

রাকেশ রাউৎ বাংলা রচনা ব্লগের নির্বাহী সম্পাদক। ইনি শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী একজন মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার। ইনি বাংলা রচনার সম্পাদকীয় দলকে লিড করেন। রাকেশ দীর্ঘ ৫ বছর যাবৎ বাংলা কনটেন্ট এডিটিং এর সাথে যুক্ত আছেন। ইনি বাংলা রচনা ছাড়াও নামকরণ এবং বাংলা জীবনীর মতো নামকরা সাইটের সম্পাদকীয় দলের একজন অন্যতম সদস্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট