দেখে নিন ইংরেজিতেও রচনা

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও তার প্রতিকার রচনা [PDF]

বিশ্বব্যাপী মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যে লাগামহীন বৃদ্ধি বর্তমান যুগে সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের পথে সম্মুখীন হওয়া সমস্যা গুলির মধ্যে অন্যতম। বিশ্বজুড়ে নানা সময়ে বিভিন্ন অর্থনীতিবিদরা দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণ এবং তার প্রতিকার হিসাবে বিভিন্ন উপায়েকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছেন। আজকে আমরা সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশেষজ্ঞদের মতামতের উপর ভিত্তি করে সমাজে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও তার প্রতিকার সম্পর্কে একটি প্রতিবেদন রচনার চেষ্টা করব।

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও তার প্রতিকার রচনা বৈশিষ্ট্য চিত্র

ভূমিকা:

মানুষের জীবনে বেঁচে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত প্রয়োজন হয় বিভিন্ন প্রকার দ্রব্যের। সেই সকল দ্রব্য সমাজ অর্থনীতির সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী মানুষকে নির্দিষ্ট মূল্যের বিনিময়ে ক্রয় করতে হয়। যে মূল্যের বিনিময়ে মানুষ কোন দ্রব্য ক্রয় করে সেই মূল্য মানুষকে আপন যোগ্যতায় অর্জন করতে হয়। সে কারণে কোন দ্রব্যের মূল্য যদি সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যায়, তাহলে যে পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে তাকেই আমরা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি বলে থাকি।

মোটামুটি সকল যুগেই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি সমাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলির মধ্যে প্রধান। সমাজে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ভুঁইফোড় কোনো নতুন সমস্যা নয়। ইতিহাসের দিকে চোখ ফেরালে আমরা দেখতে পাব, মোটামুটি সকল যুগেই বিভিন্ন কারণে দ্রব্যের দাম ওঠা-নামা করেছে এবং এমত পরিস্থিতি সামলানোর জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসন গ্রহণ করেছে উপযোগী ব্যবস্থা। 

দ্রব্য ও দ্রব্যমূল্য:

সমাজে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির স্বরূপ জানতে গেলে প্রথমে দ্রব্য এবং দ্রব্যমূল্য নির্ধারণ সম্পর্কে অবগত হওয়া প্রয়োজন। আমাদের আলোচ্য প্রবন্ধে দ্রব্য বলতে বোঝানো হচ্ছে মানুষের প্রয়োজনীয় সেই সকল উপাদান যা যুগ অনুযায়ী সমাজের চাহিদার তালিকা উপরের দিকে স্থান পেয়েছে।

এ প্রসঙ্গে দ্রব্য উৎপাদন এবং উৎপাদন সম্পর্কের ব্যাপারে অতি সংক্ষিপ্ত আলোচনা দরকার। যেকোনো দ্রব্য হল মানুষের যোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদিত হওয়া উপাদান, যার বিনিময়ে সেই উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত মানুষেরা আপন জীবনধারণের মূল্য সংগ্রহ করে থাকে। এই উৎপাদন সম্পর্কে সঙ্গে যুক্ত থাকে ক্রেতা, বিক্রেতা, মালিক এবং শ্রমিক শ্রেণী। অন্তিম ক্রেতার হাতে পণ্য আসার অব্যবহিত আগে অবধি সেই পণ্যের উৎপাদন খরচের উপর আপন লাভের ভাগ চাপিয়ে প্রতিটি স্তরে আলাদা আলাদা করে দ্রব্যের মূল্য নির্ধারণ করা হয়। 

দ্রব্যমূল্যের ক্রমবর্ধমানতা:

বর্তমান সমাজে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে চলার পথে একটি জ্বলন্ত সমস্যা হল নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ক্রমবর্ধমানতা। অষ্টাদশ শতাব্দী থেকেই বিশ্বব্যাপী শিল্প বিপ্লবের মাধ্যমে মানুষ ব্যাপক প্রযুক্তিগত উন্নতির যুগে প্রবেশ করার পর থেকেই বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দ্রব্যের মূল্যে চূড়ান্ত অস্থিরতা লক্ষ্য করা গিয়েছে। বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে এর মাত্রা আরও বেড়েছে। বিশ্বব্যাপী মূল্যের এই ক্রমবর্ধমান প্রবণতার পেছনে বেশ কয়েকটি আলাদা আলাদা কারণ  চিহ্নিত করা যায়। 

  •  সমগ্র পৃথিবী জুড়ে উৎপাদিত দ্রব্য এবং ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার আনুপাতিক অসাম্য সমাজে সম্পদের অপ্রতুলতা সৃষ্টি করে। যার ফলে প্রতিনিয়ত জনসংখ্যার প্রয়োজন অনুযায়ী চাহিদা বাড়তে থাকলে দ্রব্যের মূল্যও বাড়তে থাকে
  • সমগ্র পৃথিবীর মানুষ নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য কৃত্রিম ভাবে বাজারে প্রয়োজনীয় দ্রব্যের অভাব সৃষ্টি করে।  কালোবাজারি ব্যবসায়ীদের দ্বারা কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট এই অভাব বর্তমান যুগে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির অন্যতম একটি কারণ। 
  • কিছু দিন অন্তর অন্তর বিশ্বব্যাপী দেখা দেওয়া মুদ্রাস্ফীতিকেও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির একটি অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।
  • আবার শুনতে অবাক লাগলেও, পৃথিবীজুড়ে আধুনিক যুগে বিভিন্ন নতুন নতুন অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের উদ্ভব, ব্যাপক পরিমাণে নতুন সম্পদের প্রাপ্তি ইত্যাদি নানা ইতিবাচক দিকগুলিও জটিল অর্থনৈতিক দিক থেকে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
  • বিভিন্ন সময়ে পৃথিবীজুড়ে দেখা যাওয়া নানা প্রকার বিপর্যয় যেমন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারী, যুদ্ধ, অভ্যন্তরীণ আন্দোলন ইত্যাদি কারণেও দ্রব্যমূল্যে হঠাৎ বৃদ্ধি দেখা যেতে পারে।

সমাজে লাগামছাড়া দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রভাব:

সমাজে মানুষ দৈনন্দিন জীবনযাপনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয় এই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রভাবে। সবসময় মনে রাখা দরকার যে মানুষের আয়ের এর উৎস তথা উপার্জনের মাত্রা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সাথে পাল্লা দিয়ে সবসময় বাড়ে না এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা সীমিত থাকে। সে কারণে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য লাগামহীনভাবে বাড়লে সেগুলি অচিরেই সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যায়।

ফলে কয়েক দিনের মধ্যেই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সার্বিক মানে বিশেষ অবনতি দেখা যেতে পারে। নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর অভাবে মানুষের জীবনে নেমে আসতে পারে অনাহার, অপুষ্টি, ইত্যাদি নানা প্রকার জটিল ব্যাধির প্রকোপ। ফলে সার্বিকভাবে এর প্রভাব পড়ে কোন একটি দেশের জাতীয় ভাবমূর্তিতে। সুতরাং একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে লাগামছাড়া দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনের সাথে সাথে জাতীয় জীবনকেও সমান ভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রভাব:

জাতীয় তথা আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতেও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ব্যাপক প্রভাব পড়ে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, আমাদের আলোচ্য প্রবন্ধে বারবার দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি বলতে দ্রব্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিকেই বোঝানো হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবে মানুষের উপার্জনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ঘটলে অর্থনীতিকে এরূপ ধাক্কা সহ্য করতে হয় না। তবে মাত্রাছাড়া ভাবে দ্রব্যের দাম বাড়লে সাধারণ জনজীবনের উপর যে দুর্যোগের ঘনঘটা নেমে আসে তার ফলে সমগ্র জাতীয় তথা আন্তর্জাতিক অর্থনীতির ভিত নড়বড়ে হয়ে পড়ে।

হঠাৎ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি ঘটার ফলে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা কমে গেলে বিভিন্ন ছোট বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এর নিদর্শনও পৃথিবীতে কম নেই। চাহিদার অভাবে শিল্পের ভিত্তি ধ্বসে গিয়ে কলকারখানা বন্ধ হলে সেই কল-কারখানা এবং শিল্পের সাথে যুক্ত অসংখ্য মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েন। একদিকে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এবং অন্যদিকে কর্মহীনতা জাতীয় তথা আন্তর্জাতিক বিশ্বে একপ্রকার সভ্যতার সংকটের জন্ম দিতে পারে।

মাত্রাহীন দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিকার:

লাগামহীন দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিকারের উপায় হিসেবে বিশ্বব্যাপী অর্থনীতিবিদরা নানা পদ্ধতির কথা বলেছেন। এ প্রসঙ্গে প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় জাতীয় তথা আন্তর্জাতিক বাজারে কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তার কথা। মানুষ তার লোভের বশবর্তী হয়ে অধিক মুনাফার আশায় বাজারে কৃত্রিম অভাব সৃষ্টি করে, উচ্চ পর্যায়ে যথাযথ উদ্যোগ নিয়ে সমস্যা সমাধান করতে হবে। আবার অন্যদিকে প্রাকৃতিক কিংবা মনুষ্য সৃষ্ট বিপর্যয় থেকে যাতে অর্থনীতিকে যথাসম্ভব রক্ষা করা যায় তার ব্যবস্থা অবিলম্বে করা প্রয়োজন।

অর্থনীতিবিদদের মতে নির্দিষ্ট উপায় অবলম্বন করে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনাও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিকারস্বরূপ হিসেবে কাজ করতে পারে। তাছাড়া জনসংখ্যার প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পদের পরিমাণ যখন অপ্রতুল, তখন সভ্যতার প্রয়োজনেই আমাদের যেমন একদিকে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবার পরিকল্পনার দিকেও নজর দিতে হবে, আবার অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার দৈনন্দিন প্রয়োজন হেতু নানা বিকল্প উপায়ের সন্ধানেও মনোযোগী হতে হবে।

বিশ্বব্যাপী গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগ:

বিশ্বজুড়ে লাগামহীন দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দেশের জাতীয় তথা আন্তর্জাতিক স্তরে বিভিন্ন উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে ভারতবর্ষে মধ্যযুগে সুলতান আলাউদ্দিন খিলজী দ্বারা গৃহীত বাজার নিয়ন্ত্রণ উদ্যোগ ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছে।

এছাড়া প্রতিটি দেশের সরকারই নিজের দেশে দ্রব্যের দাম যাতে সাধারণের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে না চলে যায় তার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ তথা আইন প্রণয়ন করে থাকে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও কালোবাজারি বন্ধ করার উদ্দেশ্যে দেশীয়, মহাদেশীয় এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা তৈরি হয়েছে। এইসকল সংস্থাগুলি কালোবাজারিকে প্রতিহত করে দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। তাছাড়া বর্তমানে বিভিন্ন দেশের সচেতন ক্রেতা এবং ক্রেতা সুরক্ষা দপ্তরের যৌথ উদ্যোগেও দ্রব্যের দাম নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারে।

উপসংহার:

বিশ্বব্যাপী দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের কাছে একটি জ্বলন্ত সমস্যা স্বরূপ। এই সমস্যা দূরীকরণের জন্য জাতীয় তথা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে উচ্চপর্যায়ের উদ্যোগ যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন ব্যাপক গণসচেতনতার। সমাজে মানবিক মূল্যবোধের সার্বিক উন্মেষ ঘটলে অন্যান্য অসংখ্য সমস্যার মতন দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির মতন সমস্যাটিও অচিরেই দূরীভূত হবে।


উপরিউক্ত প্রবন্ধটিতে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও তার প্রতিকার সম্পর্কে সম্ভাব্য সবকটি দিককে যথাযথভাবে আলোচনার চেষ্টা করা হলো। এ প্রসঙ্গে বিভিন্ন সময়ে অর্থনীতিবিদদের দেওয়া বিভিন্ন মতামতের অবলম্বনে পরীক্ষার প্রয়োজনের শব্দের বন্ধনীতে আবদ্ধ থেকেও একটি সার্বিক প্রতিবেদন উপস্থাপনের প্রচেষ্টা করা হয়েছে। আশাকরি আমাদের এই প্রয়াস আপনাদের ভাল লেগেছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী যথাযথভাবে এটি আপনাদের সহায়তা করতে পারবে।

উপরিউক্ত প্রতিবেদনটি সম্পর্কে আপনাদের মতামত কমেন্টের মাধ্যমে বিশদে আমাদের জানান। আপনাদের মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চেষ্টা করব আপনাদের মতামত অনুযায়ী আমাদের লেখনীকে আরও উন্নত করে তোলার। তাছাড়া যদি এমনই অন্য কোন রচনা পড়তে চান সে বিষয়েও আমাদের অবগত করুন। আমরা অতি সত্বর সেই রচনাটি আপনার কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করব। ধন্যবাদ।

Print Friendly, PDF & Email

রাকেশ রাউত

রাকেশ রাউৎ বাংলা রচনা ব্লগের নির্বাহী সম্পাদক। ইনি শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী একজন মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার। ইনি বাংলা রচনার সম্পাদকীয় দলকে লিড করেন। রাকেশ দীর্ঘ ৫ বছর যাবৎ বাংলা কনটেন্ট এডিটিং এর সাথে যুক্ত আছেন। ইনি বাংলা রচনা ছাড়াও নামকরণ এবং বাংলা জীবনীর মতো নামকরা সাইটের সম্পাদকীয় দলের একজন অন্যতম সদস্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট