দেখে নিন ইংরেজিতেও রচনা

তোমার প্রিয় পর্যটন কেন্দ্র রচনা [সঙ্গে PDF]

পর্যটন হল আপামর বাঙালির জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ স্বরূপ। আর একটি আদর্শ পর্যটন কেন্দ্র সেই পর্যটনে এক অনন্য মাত্রা যোগ করে দেয়। প্রতিটি মানুষের কাছে নির্দিষ্ট কোন একটি পর্যটন কেন্দ্র থাকে যেখানে সে বারবার ফিরে যেতে চায়। আজ এমনই একটি প্রিয় পর্যটন কেন্দ্র সম্পর্কে আলোচনার উদ্দেশ্য নিয়ে আমাদের এই প্রতিবেদনটির উপস্থাপনা।

তোমার প্রিয় পর্যটন কেন্দ্র রচনা বৈশিষ্ট্য চিত্র

ভূমিকা:

বর্তমান যুগের ব্যস্ততা সর্বস্ব জীবনের ইঁদুর দৌড়ে আমাদের শরীর ও মন যখন রোজকার একই পরিবেশের ক্লান্তি এবং একঘেয়েমিতে ভরে ওঠে, তখন নিত্যদিনের সেই চেনা চারপাশ থেকে আমাদের মনকে কিছুদিনের জন্য বিশ্রাম দিতে এবং নিজের ক্লান্তি ও একঘেয়েমি দূর করে জীবনের পরবর্তী ব্যস্ততার জন্য তৈরি হতে প্রয়োজন ভ্রমণের। ভ্রমণ আমাদের বর্তমান জীবনের এমন একটি অংশ যাকে অস্বীকার করে কোনোভাবেই ভালো থাকা যায় না।

ভ্রমণ আমাদের ক্লান্তি ও গ্লানিতে ভরে ওঠা মনকে পুনরায় কোন এক জাদুকাঠির ছোঁয়ায় সতেজ করে তোলে। আমি আদ্যোপান্ত একজন ভ্রমণপিপাসু বাঙালি। প্রত্যেক বছর আমি এই ব্যস্ত জীবন থেকে কিছুদিনের মুক্তি খুঁজে নেওয়ার উদ্দেশ্যে ছুটে যাই বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্র। তবে প্রতিটি মানুষের জীবনে এমন একটি নির্দিষ্ট কোনো পর্যটনকেন্দ্র থাকে যেখানে মানুষ ফিরে ফিরে যেতে চায় বারবার, তাও সেই স্থান কখনো পুরনো হয় না। তাইই হলো মানুষের মনের সবচেয়ে কাছের এবং প্রিয় পর্যটন কেন্দ্র।

আমার প্রিয় পর্যটন কেন্দ্র:

প্রতিটি মানুষের কাছেই কোন না কোন একটি পর্যটন কেন্দ্র সবসময়ের জন্য প্রিয় তথা মনের খুব কাছের হয়ে থাকে। আমার অন্যান্য বন্ধুদের মধ্যে কারোর পছন্দ দীঘা কিংবা পুরীর সমুদ্র সৈকত, কেউ আবার ভালোবাসে দিল্লি কিংবা লখনৌয়ের মতন ঐতিহাসিক স্থান গুলি, আবার কারোর প্রিয় পর্যটন কেন্দ্র শিল্পকর্ম সমৃদ্ধ দক্ষিণ ভারত।

তবে আমি পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে তুলনামূলকভাবে শান্ত, নিরিবিলি প্রাকৃতিক পরিবেশ পছন্দ করি যেখানে একই সাথে পাওয়া যায় পাহাড়ের গাম্ভীর্য, নদীকুলের স্নিগ্ধতা আর অরণ্যের রোমান্স। তবে সৌভাগ্যের বিষয় এই যে ভারতবর্ষের যে রাজ্যে আমি বাস করি তারই ঠিক উত্তর দিকে খুঁজে পাওয়া যায় আমার পছন্দের এই আদর্শ প্রকৃতিকে। তাই আমার পছন্দের পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করতে গেলে আমি নিঃসন্দেহে উত্তরবঙ্গকেই অভিহিত করব।

কেন উত্তরবঙ্গ:

উত্তরবঙ্গ আমার সবচেয়ে পছন্দের পর্যটনকেন্দ্র হবার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। উত্তরবঙ্গের প্রকৃতির অপরূপ শোভা এই কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলেও, উত্তরবঙ্গ যেহেতু আমার জন্মভূমি বাংলার হৃদয়েরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ তাই এই পর্যটন কেন্দ্রের প্রতি আমার প্রত্যক্ষ পক্ষপাতিত্ব রয়েছে।

এছাড়া উত্তরবঙ্গ যেকোনো মানুষের প্রিয় পর্যটন কেন্দ্র হওয়ার পিছনে অবদান রয়েছে উত্তরবঙ্গের মানুষের। তাদের কথা পৃথকভাবে পরবর্তীতে এই প্রবন্ধে উঠে আসবে। আর সবচেয়ে বড় কথা হল, উত্তরবঙ্গে প্রকৃতির প্রায় প্রতিটি রূপকে পাওয়া যায় একেবারে অবিকৃত রূপে। সেখানকার পাহাড়, পর্বত, নদী, জঙ্গল সবকিছু মিলে মিশে উত্তরবঙ্গকে পর্যটকদের স্বর্গ বানিয়ে তুলেছে।

উত্তরবঙ্গে আমার প্রিয় স্থানগুলি:

উত্তরবঙ্গ বলতে প্রথমেই মানুষ বোঝে দার্জিলিং, কালিম্পং শিলিগুড়ি ইত্যাদি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রগুলিকে। কিন্তু আমি আমার প্রিয় পর্যটন কেন্দ্র বলতে উত্তরবঙ্গের এই অংশকে বোঝাতে চাইনি। শিলিগুড়ি, দার্জিলিং অঞ্চল বাদ দিয়েও উত্তরবঙ্গের একটি বিস্তীর্ণ এলাকা তার মোহময়ী সৌন্দর্যের হাতছানি দ্বারা পর্যটকদের আকর্ষণ করে।

দার্জিলিং ও সংলগ্ন অঞ্চলগুলি নিঃসন্দেহে ভীষণ সুন্দর, তবে আমার কাছে আরো সুন্দর ও আরো পছন্দের জায়গা হল জয়ন্তি, বক্সা, ডুয়ার্স, আলিপুরদুয়ার শহর, কোচবিহার, ভুটান সীমান্ত ইত্যাদি জায়গা। এসকল জায়গাগুলিতে আমি বারবার ফিরে ফিরে যাই। উত্তরবঙ্গের এই অংশটিতে অপরূপ সহাবস্থান দেখা যায় পাহাড়, নদী, এবং জঙ্গলের। সর্বোপরি তাঁর সঙ্গে উপরি হিসেবে পাওয়া যায় বন্য পশুদের দেখা। এছাড়া উত্তরবঙ্গ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি ঐতিহাসিক ঐতিহ্য দ্বারাও পূর্ণ হয়েছে। উত্তরবঙ্গে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বিভিন্ন যুগের ঐতিহাসিক নিদর্শন।

একদিকে কোচবিহারে আমরা পাব কোচবিহার রাজবাড়ি, অন্যদিকে ভুটান সীমান্ত গেলে দেখা যাবে কিছু কিছু প্রাচীন যুগের ঐতিহাসিক নিদর্শন। অপরদিকে জলপাইগুড়ির সান্তালবাড়ি, নকশালবাড়ি প্রভৃতি অঞ্চল স্বয়ং সত্তরের দশকের মাওবাদী উগ্রপন্থী আন্দোলনের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। এছাড়া জয়ন্তীর বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগের ইতস্তত বিক্ষিপ্ত নিদর্শন। এইসব মানুষের চোখের আড়ালে পড়ে থাকা স্থানগুলিই আমার অত্যন্ত প্রিয় পর্যটন কেন্দ্র।

পাহাড়ি প্রকৃতির হাতছানি:

উত্তরবঙ্গের এই অঞ্চলে পাহাড়ি প্রকৃতির রূপ দার্জিলিং কিংবা কালিম্পং এর তুলনায় অনেকখানি আলাদা। এখানে পাহাড়গুলি সুবিশাল নয়। তারা এই অঞ্চলে অত্যন্ত কাছের ঘরের লোক। প্রতিপদে যাওয়া-আসায় চোখের সামনে দেখা যায় সামনে উঠে গেছে ছোট ছোট টিলা কিংবা পাহাড়, কোনটি আয়তনে খানিক বড়, কোনটি খানিক ছোট। আর দেখা যায় পাহাড়ের গা দিয়ে সার বেঁধে জঙ্গল, অসংখ্য জানা না জানা গাছ এবং ফুল।

চলার পথে কখনো কখনো পড়বে পাথুরে জমি, কখনো বা অগভীর নদী। সেসব নদী বয়ে চলেছে আপন গতিতে নিরন্তর বিরামহীনভাবে। অধিকাংশ নদীই পায়ে হেঁটে পার করে ফেলা যায়। আর এদের সঙ্গে রয়েছে অসংখ্য বন্য জীবজন্তু, যারা প্রতিপদে পর্যটকদের রোমাঞ্চের সঙ্গী তথা প্রধান উৎস হয়ে থাকবে। একই সাথে একই জায়গায় প্রকৃতির সকল প্রকার সৌন্দর্যের এমন হাতছানি উপেক্ষা করা কোন পর্যটকের পক্ষেই সম্ভব নয়। 

পাহাড়ি জীবন ও আমি:

একজন পর্যটক হিসেবে পাহাড়ি জীবন আমার অত্যন্ত পছন্দের। পাহাড়ের সৌন্দর্য, পাহাড়ি জীবনের সারল্য আর সর্বোপরি পাহাড়ের মানুষ আমার মন ছুঁয়ে যায় বরাবর। উত্তরবঙ্গের যে অঞ্চলের কথা আমি বলছি, সেই অঞ্চলকে প্রকৃতি তার রূপ রস গন্ধে এমনভাবে সাজিয়ে দিয়েছে যে সেখানকার মানুষ ভুলে যায় বাইরের পৃথিবীর সকল জটিলতা। প্রতিনিয়তঃ পৃথিবীতে সৃষ্টি হয়ে চলা ব্যাপক অস্থিরতা এসব অঞ্চলে প্রকৃতির কোলে নিজেদের খেয়ালে বসবাস করা মানুষগুলিকে স্পর্শ করে না।

আমি প্রতিবার উত্তরবঙ্গে এসে এখানকার মানুষদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। এখানকার স্থানীয় সংস্কৃতি, ভাষা, আচার-ব্যবহার সবকিছুর মধ্যেই জড়িয়ে থাকে অদ্ভুত এক সরলতা ও প্রশান্তি। উত্তরবঙ্গের পাহাড়ে পাথুরে জমির ওপর সামনে নদী আর পেছনে জঙ্গলের মাঝে দাঁড়িয়ে দিনের বেলা খোলা নীল আকাশে বলাকার আনাগোনা আর রাতে নক্ষত্রময় আকাশ যেকোনো পর্যটককে মুহূর্তে মোহিত করে দেবে। 

পাহাড়ি খাবার-দাবার:

আমার প্রিয় পর্যটন কেন্দ্র সংক্রান্ত আলোচনা যে জিনিসটির কথা একেবারে উল্লেখ না করলেই নয় তা হল পাহাড়ি খাবার-দাবার। অনেকের মতে পাহাড়ি এলাকায় বাঙালিকে খাওয়া-দাওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়। তবে আমার ক্ষেত্রে এই নিয়ম একেবারেই খাবেন না। পাহাড়ি খাবার আমার খাদ্যতালিকায় অন্যতম পছন্দ। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের এই অঞ্চলগুলিতে যেসব ভুটিয়া খাবার-দাবার পাওয়া যায় সেগুলি আমার ভীষণ প্রিয়।

তাছাড়া মোমো, থাইপো, থুকপা ইত্যাদি খাবার-দাবার তো আছেই। তাছাড়া আসাম ও কোচবিহার সীমান্তে পৌঁছালে অসমীয়া খাবার-দাবারের স্বাদও পাওয়া যায়। তবে আলিপুরদুয়ার ছাড়িয়ে কোচবিহারের রান্নাবান্নার স্বাদ পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেকখানি অন্যরকম।

উপসংহার:

পর্যটন হলো বাঙালি জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। আর সেই পর্যটন কেন্দ্র যদি হয় পাহাড়, নদী আর অরন্য একই সাথে, তাহলে সেই ভ্রমণে এক অনন্য মাত্রা যোগ হয়। উত্তরবঙ্গ প্রকৃতির ডালি সাজিয়ে নিয়ে তার পর্যটকদের ভ্রমণ অভিজ্ঞতায় এমনই এক অনন্য মাত্রা যোগ করে। সে কারণে আমি যতবারই উত্তরবঙ্গ যাই না কেন, প্রতিবার রোজকার জীবনে ফিরে আসার পর আবার ফিরে যেতে ইচ্ছা করে উত্তরবঙ্গের নির্মল প্রকৃতির কোলে শান্তির আশ্রয়ে।


উপরিউক্ত ‘তোমার প্রিয় পর্যটন কেন্দ্র‘ শীর্ষক এই প্রবন্ধটিতে আমরা অসংখ্য মানুষের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি পর্যটন কেন্দ্র উত্তরবঙ্গ সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনার চেষ্টা করেছি। এই প্রবন্ধে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত সম্ভাব্য সবকটি দিকের ওপর যথাযথ আলোকপাতের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে পরীক্ষার প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে প্রবন্ধটিতে নির্দিষ্ট শব্দসীমা বজায় রাখারও চেষ্টা করতে হয়েছে। আশাকরি আমাদের এই প্রয়াস আপনাদের ভাল লেগেছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তা যথাযথভাবে আপনাদের সহায়তা করতে পারবে।

উপরিউক্ত প্রতিবেদনটি সম্পর্কে আপনাদের মতামত কমেন্টের মাধ্যমে বিশদে আমাদের জানান। আপনাদের মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চেষ্টা করব আপনাদের মতামত অনুযায়ী আমাদের লেখনীকে আরও উন্নত করে তোলার। তাছাড়া যদি এমনই অন্য কোন রচনা পড়তে চান সে বিষয়েও আমাদের অবগত করুন। আমরা অতি সত্বর সেই রচনাটি আপনার কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করব। ধন্যবাদ।

Print Friendly, PDF & Email

রাকেশ রাউত

রাকেশ রাউৎ বাংলা রচনা ব্লগের নির্বাহী সম্পাদক। ইনি শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী একজন মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার। ইনি বাংলা রচনার সম্পাদকীয় দলকে লিড করেন। রাকেশ দীর্ঘ ৫ বছর যাবৎ বাংলা কনটেন্ট এডিটিং এর সাথে যুক্ত আছেন। ইনি বাংলা রচনা ছাড়াও নামকরণ এবং বাংলা জীবনীর মতো নামকরা সাইটের সম্পাদকীয় দলের একজন অন্যতম সদস্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট

link to ভাবসম্প্রসারণ: আত্মশক্তি অর্জনই শিক্ষার উদ্দেশ্য

ভাবসম্প্রসারণ: আত্মশক্তি অর্জনই শিক্ষার উদ্দেশ্য

মানুষ ভাষা ব্যবহার করে মনের ভাব প্রকাশের উদ্দেশ্য নিয়ে। তবে কথা বলা,...