দেখে নিন ইংরেজিতেও রচনা

তোমার দেখা একটি মেলার অভিজ্ঞতা বা তোমার দেখা একটি মেলার বিবরণ রচনা [PDF]

মেলা হলো মানুষের মিলন ক্ষেত্র। একটি মেলার মধ্যে দিয়ে বিকাশ লাভ করে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের সভ্যতা তথা সংস্কৃতি। ক্লান্তিকর একঘেয়ে ব্যস্ত শহর জীবনে মেলা এনে দেয় ক্ষণিকের স্বস্তি। এমনই আমার দেখা একটি মেলা ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে আজকে এই নিম্নলিখিত প্রতিবেদনটির উপস্থাপনা।

তোমার দেখা একটি মেলার অভিজ্ঞতা বৈশিষ্ট্য চিত্র

ভূমিকা:

মেলা শব্দের প্রকৃত অর্থ হলো মানুষের মিলন ক্ষেত্র। মেলার কোন নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য থাকে না। নিখাদ আনন্দ এবং আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সকল মানুষ নির্বিশেষে মিলনের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে মেলার প্রকৃত সার্থকতা। মানুষের জীবনে মেলার গুরুত্ব ব্যাপক। সেই প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ বিভিন্ন প্রকার মেলার আয়োজন করে এসেছে। এতে মানুষের মানুষের দৃঢ় হয়েছে পারস্পরিক বন্ধন, স্থাপিত হয়েছে নতুন সম্পর্ক।

সময় পরিবর্তিত হলেও মেলার এই প্রাথমিক চরিত্র আজও বদলায়নি এতোটুকু। আমার দেখা এমনই একটি প্রিয় পছন্দের মেলা হল প্রতিবছর শান্তিনিকেতনে আয়োজিত হওয়া পৌষ মেলা। প্রতিবছরের মতো এবছরও আমিভ্রমণের উদ্দেশ্যে শান্তিনিকেতন যাত্রা করেছিলাম। সেই মেলাতে আমার ভ্রমণের অভিজ্ঞতা বিশদে আলোচনা করার উদ্দেশ্যেই এই প্রতিবেদনটির উপস্থাপনা। 

মেলার তাৎপর্য:

পৌষমেলায় আমার ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে আলোচনার পূর্বে প্রয়োজন সভ্যতার কাছে মে লারকি তাৎপর্য তা তুলে ধরার। মেলা মানেই মানুষের মিলন।  নানা জাতি নানা ধর্মের মানুষের মিলন। নানা ভাবের আদান প্রদান । সারাবছর একই ভাবে কাজ কর্ম জীবন কাটিয়ে মানুষের মনের সংকীর্ণতা বেড়ে ওঠা।

বছরের এই দিন গুলো সমস্ত জীর্ণতা কাটিয়ে একই প্রাঙ্গনে মিলিত হয়। অর্থনৈতিক দিকও মেলার একটি উল্লেখযোগ্য তাৎপর্য। মেলাতে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত মানুষদের পণ্য বিক্রয়, বেচাকেনার মাধ্যমেও মানুষে মানুষে এক বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও স্থাপিত হয়।

পৌষ মেলা ও তার ইতিহাস:

পাকা ফসল এর গন্ধ যখন ডালে ডালে কাঙ্গালিনীর মতো ঘুরে বেড়ায় হিমেল হাওয়ার সাথে যখন ধূসর আলপনা আঁকে  প্রকৃতিতে, শিশির ভেজা ঘাসে যখন প্রথম রোদ এসে পড়ে তখনই শুরু হয়ে যায় শান্তিনিকেতনের পৌষ মেলার প্রহর গোনা। শান্তিনিকেতন সকলের কাছে এক অদ্ভুত অনুভূতি লাভের জায়গা।

ছোটবেলা থেকে যে রবি ঠাকুরের সংস্পর্শে আমরা প্রত্যেকে বড় হই, তার আত্মার পরম বিচরণ ক্ষেত্র বলতে আমরা বুঝি শান্তিনিকেতনকে। সেখানে তার গন্ধ খেলে বেড়ায় মাঠে ঘাটে। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ইচ্ছে ছিল ধর্মভাব উদ্দীপনার জন্য মেলা বসানোর।

যে মেলায় সকল সম্প্রদায়ের মানুষ আসবেন, সেখানে সকল ধর্ম নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে তাদের আত্মোন্নতি ঘটবে। তিনি একদিন তার এই স্বপ্ন বাস্তবায়িত করার উদ্দেশ্য নিয়ে শান্তিনিকেতনের এক আশ্রমের ট্রাস্টিদের মধ্যে একটি মেলা আয়োজনের ভার দিয়ে যান।

শোনা যায় ১২৯৯ বঙ্গাব্দে আশ্রমের বার্ষিক প্রতিষ্ঠা উৎসবে বস্ত্র বিতরণ, কীর্তন দান, এবং প্রদর্শনীর মতন নানা মনোরঞ্জক আয়োজনের মাধ্যমে প্রথম এই মেলা বসানোর চেষ্টা হয়। চতুর্থ বার্ষিক ব্রাহ্ম উৎসবেই মহর্ষির মেলার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়। ১৪০১ এর ৭ই পৌষ, এই মেলাটি প্রথম পৌষ মেলা নামে পালিত হয়। তখন থেকে ঠিক এভাবেই বছরের-পর-বছর শান্তিনিকেতনের মাঠে লক্ষ লক্ষ মানুষের ভিড়ের মধ্যে পৌষ মেলার ঐতিহ্য দিন দিন বৃদ্ধি পেয়েছে।

পৌষ মেলার তাৎপর্য:

 ৭ই পৌষ দিনটির সঙ্গে শোনা যায় নাকি ঠাকুরবাড়ির ঐতিহ্যের এক ওতপ্রোত সম্পর্ক রয়েছে। ১২৫০এর ৭ই পৌষ মহর্ষি অনুরাগী সহ ব্রাহ্মধর্মের দীক্ষিত হন। তিনি ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন বহুদিন ধরেই। ব্রাহ্ম ধর্মে দীক্ষা নেওয়ার দু’বছর পরে ৭ই পৌষ দিনটিতে তিনি তার ব্রাহ্মসমাজের বন্ধুদের সাথে ধর্মের উন্নতির লক্ষ্যে আলোচনার আয়োজন করেন। দেবেন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন সমাজের সকলে ব্রাহ্মসমাজ নিয়ে অনুরাগী হয়ে উঠুক।

শান্তিনিকেতনের স্থানীয়ভাবে মনে করা হয় পৌষ মেলা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের তরফ থেকে মানুষের জন্য একটি মহামূল্য উপহার। সেই মহান দান স্বীকার করে আজও প্রতিটি ৭ই পৌষ শান্তিনিকেতনে ঐতিহাসিক নানা ঘটনায় সমৃদ্ধ হয়ে পৌষ মেলা সংগঠিত হয়।

আজও দেশ-বিদেশ থেকে শুধু এই মেলা পরিভ্রমণের উদ্দেশ্যে অসংখ্য মানুষ শান্তিনিকেতনে আসেন। এই দিনটিতেই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কর্তৃক শান্তিনিকেতন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপনা হয়েছিল। 

প্রাথমিক পর্যায়ে পৌষ মেলা:

প্রথম প্রথম এই পৌষ মেলা মাত্র একদিন অনুষ্ঠিত হত। সজীব অথচ অনাড়ম্বর এই মেলা শুরু হতো বৈতালিক সুরের মধ্য দিয়ে। নানা ভোজ্য সামগ্রী অনাথ শিশুদের মধ্যে বিতরণ করার মধ্য দিয়ে গ্রাম্য মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হতো। যে কোন মেলাই জনসমাগম ছাড়া ফিকে হয়ে যায়। সূচনা লগ্ন থেকেই শান্তিনিকেতনের আশেপাশে গ্রামের লোক সারাদিন ধরে এই মেলাকে মুখরিত করে রাখত। মাঠে বসতো নানা মনোহরী দোকান।

সেসব দোকানে বিক্রি হতো মাটির পুতুল, খেলনা, ছোট ছোট ঘর সাজানোর দ্রব্যাদি মহিলাদের চুরি গয়না আরো কত কি। নানা অনুষ্ঠানে প্রচলিত ছিল যেমন বাউল গান, যাত্রা গান প্রমুখ। পৌষ মেলার আরো একটি আকর্ষণ হলো কলকাতার বাজিকরদের তৈরি বাজির উৎসব।

আর এই বাজির উৎসব দেখার জন্য শুধু কলকাতা বা শান্তিনিকেতন গ্রামের মানুষরাই নয় আরো ভিন্ন ভিন্ন শহর ও দেশের মানুষরা এসে ভিড় করত। আস্তে আস্তে আশ্রম বিদ্যালয় ও বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার পর মেলার পরিচালনার দায়িত্ব ক্রমে ট্রাস্ট বোর্ডের সদস্যদের হাত থেকে নিয়ে শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। 

আমার অভিজ্ঞতা:

ছোটবেলা থেকেই ৭ই পৌষ আমি কখনোই কলকাতায় থাকতাম না। ট্রেনে করে বোলপুর শান্তিনিকেতন যাওয়ার আনন্দটাই আলাদা। হ্যাঁ তবে এই সময়টা শান্তিনিকেতনে বড় বেশি ভিড় হয়। তবু মেলার এই ভিড় মন্দ লাগে না।

যতবারই আমি যাই, ততোবারই মনে হয় পৌষ মেলা নতুন অঙ্গে সেজে উঠেছে। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে তার মধ্যে আধুনিকতার ছোঁয়া এসেছে। শুধু শান্তিনিকেতনের মানুষরাই এই মেলায় অংশগ্রহণ করে না; দেশের প্রতিটি অংশ থেকে মানুষ এই মেলায় বিকিকিনির উদ্দেশ্যে আসে।

ভূস্বর্গ কাশ্মীর থেকে মানুষ আসে সেখানকার টুপি, শাল, অঙ্গবস্ত্র ইত্যাদি নিয়ে। নাগরদোলা ও ঘূর্ণি ঘোড়ার ব্যবস্থা থাকে। কিন্তু খারাপ লাগে ছোটবেলার তালপাতার ভেঁপুর আওয়াজ এখন মাইকের স্বরে চাপা পড়ে গেছে। আগে পৌষ মেলা নিতান্তই গ্রামীণ মেলা ছিল, কিন্তু এখন তাতে শহুরে আবহাওয়া মিশেছে। কিন্তু যতই হোক এটা পৌষ মেলা, তাই এর কোনো কিছুই কখনো আমার কাছে অবাঞ্ছিত নয়।

মেলার দিনগুলিতে চতুষ্কোণ পাকা মঞ্চ তৈরি হয় মনোহর রুচিশীল বিনোদনের জন্য। সেখানে নাচ গান ইত্যাদি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বরণ করে নেওয়া হয় আসন্ন শীতকালকে। শুভেচ্ছা জানানো হয় বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত মানুষের উদ্দেশ্যে। আমার দেখা জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মেলা এটি। ভালোবাসা ও আন্তরিকতার ছোঁয়ায় এখানে যেন সত্যি মন কেমন করে ওঠে। ইচ্ছে হয় কলকাতা জুড়ে এমন কোনো মেলা হলে কি মজাই না হত। 

উপসংহার:

পৌষ মেলা আমাদের এক চিরায়ত ঐতিহ্য। বছরের পর বছর আমাদের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির সাক্ষী হয়ে আপন মহিমায় টিকে আছে। নগর জীবনের ক্লান্তি ভরা সময়ের ফাঁকে শান্তিনিকেতনের পৌষ মেলা আমায় নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছে। সব খারাপের পরেও যে ভালোর অপেক্ষা করা উচিত তা প্রতিমুহূর্তে এখানকার মানুষদের মধ্যে থেকে আমি শিখেছি।

প্রতি বছর অনেক স্মৃতির শামিয়ানা নিয়ে আমি পৌষ মেলা থেকে কলকাতায় ফিরে আসি। রবিঠাকুরের গান আর লাল মাটির গন্ধ ভরে নিয়ে আসি নিঃশ্বাসে। আধুনিক নগর সভ্যতা ও সংস্কৃতিও যে গ্রামীণ লোকসংস্কৃতি  ও সভ্যতাকে পাশে নিয়ে যে চলতে পারে তা পৌষ মেলার রূপের মধ্যে সদৃষ্ট। আপন বৈশিষ্ট্যে এই মেলা সদা সমুজ্জ্বল হয়ে থাকুক এটাই সব সময় কামনা করি। 


কোন একটি নির্দিষ্ট মেলা সম্পর্কে যতগুলি দিক আলোচনা করা সম্ভব তার একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস আমরা এই প্রতিবেদনটিতে করেছি। আশা করি এই প্রতিবেদনটি আপনাদের ভাল লেগেছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তা যথাযথভাবে আপনাদের সহায়তা করতে পারবে। উপরিউক্ত প্রতিবেদনটি সম্পর্কে আপনাদের মতামত কমেন্টের মাধ্যমে বিশদে আমাদের জানান।

আপনাদের মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চেষ্টা করব আপনাদের মতামত অনুযায়ী আমাদের লেখনীকে আরও উন্নত করে তোলার। তাছাড়া যদি এমনই অন্য কোন রচনা পড়তে চান সে বিষয়েও আমাদের অবগত করুন। আমরা অতি সত্বর সেই রচনাটি আপনার কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করব। ধন্যবাদ।

Print Friendly, PDF & Email

রাকেশ রাউত

রাকেশ রাউৎ বাংলা রচনা ব্লগের নির্বাহী সম্পাদক। ইনি শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী একজন মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার। ইনি বাংলা রচনার সম্পাদকীয় দলকে লিড করেন। রাকেশ দীর্ঘ ৫ বছর যাবৎ বাংলা কনটেন্ট এডিটিং এর সাথে যুক্ত আছেন। ইনি বাংলা রচনা ছাড়াও নামকরণ এবং বাংলা জীবনীর মতো নামকরা সাইটের সম্পাদকীয় দলের একজন অন্যতম সদস্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট