দেখে নিন ইংরেজিতেও রচনা

ক্রিয়াপদ- সংজ্ঞা, প্রকারভেদ, উদাহরণ, ক্রিয়ার কাল, ক্রিয়ার ভাব, ক্রিয়া বিভক্তি, বিস্তারিত আলোচনা [PDF সহযোগে]

ক্রিয়াপদ হলো বাংলা ব্যাকরণ-এর অবিচ্ছেদ্য এবং সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেকারণে ক্রিয়াপদ সম্বন্ধে পরিষ্কার ধারণা না থাকলে বাংলা ভাষা প্রয়োগ এবং তার সার্থক ব্যবহারের প্রয়াস অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সে কারণে এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে আমরা চেষ্টা করেছি বাংলা ব্যাকরণের ক্রিয়াপদকে যথাসম্ভব সরল কিন্তু বিশদভাবে আপনাদের সামনে তুলে ধরতে।

ক্রিয়াপদ বৈশিষ্ট্য চিত্র

ক্রিয়াপদের সংজ্ঞা:

এককথায় ধাতুর উত্তর বিভক্তিযোগে ধাতু ক্রিয়াপদে পরিণত হয়। যেমন উঠ্+এ। এক্ষেত্রে উঠ্ হলো ধাতু এবং এ হলো বিভক্তি। এমনি আরও কয়েকটি উদাহরণ হল বস্+এ=বসে, লিখ্+ছে=লিখছে, হাঁস্+ল=হাসল ইত্যাদি। প্রতিটি ক্ষেত্রে ধাতুর সঙ্গে বিভক্তি যোগ করে ক্রিয়াপদ গঠন করা হয়েছে। উঠে, বসে, লিখছে ইত্যাদি হল ক্রিয়াপদ। প্রতিটি ক্রিয়ায় কিছু না কিছু কাজের কথা বোঝানো হয়েছে। একেই বলা হয় কার্য সংগঠন।

দ্রষ্টব্য:

ক্রিয়া বাক্যের কার্যবোধক পদ এবং বাক্যের প্রধান অঙ্গ। ক্রিয়াপদ ছাড়া বাক্য গঠিত হতে পারে না। কিছু কিছু বাক্যে ক্রিয়াপদ উহ্য থাকতে পারে কিন্তু তার অস্তিত্ব লোপ পায় না। যেমন: চাঁদ উঠেছে। এতে ‘উঠেছে’ ক্রিয়াপদটি বর্তমান। পাখিটি (হয়) কালো। এক্ষেত্রে বাক্যের ক্রিয়াপদ ‘হয়’ উহ্য আছে, কিন্তু তা বলে তার অস্তিত্ব লোপ পায় নি। 

প্রতিটি বাক্যের দুইটি অংশ থাকে– উদ্দেশ্য ও বিধেয়। ক্রিয়াপদ হল সেই বাক্যের বিধেয় অংশের অন্তর্ভুক্ত। বিধেয় অংশে ক্রিয়াই প্রধান। কিন্তু উদ্দেশ্যের সঙ্গে তার রূপের সংগতি থাকে।  বাংলা ভাষায় কর্তার বচন, লিঙ্গ অনুযায়ী ক্রিয়ার রূপের পরিবর্তন হয় না, হয় কর্তার পুরুষ অনুযায়ী। যেমন প্রথম পুরুষ: সে হাসে। মধ্যম পুরুষ: তুমি হাসো। উত্তম পুরুষ: আমি হাসি।

Coming Soon
আপনি কি ২০২১ সালের মাধ্যমিক পরীক্ষার সাম্ভাব্য রচনার সাজেশান অতি সল্পমূল্যে কিনতে আগ্রহী?
Total Votes : 1229

এখানে হাসা ক্রিয়া বিভিন্ন কুরুশের বিভিন্ন রূপে প্রযুক্ত হয়েছে। সুতরাং, উদ্দেশ্য পদের বা কর্তার পুরুষ অনুযায়ী ক্রিয়াকে রূপের সঙ্গতি রক্ষা করতে হয়েছে।

 তাছাড়া, বাক্যে অন্য কোন কার্য সংঘটন হলেই তা অতীত-বর্তমান ও ভবিষ্যৎ এই তিন কালের মধ্যে কোন একটি কালে হয়। যেমন: অতীতকাল- মহিম বাড়ি গিয়েছিল। বর্তমান কাল- ছেলেটি পড়ছে। ভবিষ্যৎ কাল- ফাতিমা বিকেলে নাচবে। 

শুধু কাল হলে হলো না; কালের প্রকার আছে। যেমন: নিত্য, ঘটমান, পুরাঘটিত ইত্যাদি। 

এ প্রসঙ্গে ভাষাচার্য ডক্টর সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় প্রদত্ত ক্রিয়াপদের সংজ্ঞাটি স্মরণ করা যেতে পারে:- তিনি লিখেছিলেন; “বাক্যের অন্তর্গত যে পদে কোনও কালের কোনও প্রকারের ক্রিয়া ব্যাপারের সংঘটন বুঝায় এবং বাক্যের উদ্দেশ্য পদের সহিত যাহার রূপের সংগতি থাকে, তাহাকে ক্রিয়াপদ বলে।”

ক্রিয়ার প্রকারভেদ:

ক্রিয়া নানা প্রকারের। যথা:

১) মৌলিক ক্রিয়া।

২) সাধিত ধাতুজ ক্রিয়া: প্রযোজক ক্রিয়া, নামধাতুজ ক্রিয়া, ধ্বন্যাত্মক ধাতুজ ক্রিয়া।

৩) বহুপদ বা সংযোগমূলক ক্রিয়া।

৪) সমাপিকা ও অসমাপিকা ক্রিয়া।

৫) অকর্মক ও সকর্মক ক্রিয়া।

৬) কর্মবাচ্যের ক্রিয়া।

৭) দ্বিকর্মক ক্রিয়া।

৮) পঙ্গু ক্রিয়া। 

তাছাড়া আলোচনার বিষয় হলো ক্রিয়ার কাল, ক্রিয়ার প্রকার এবং ক্রিয়ার ভাব। আর আছে ক্রিয়ার প্রকার বিভক্তি, কাল বিভক্তি ও পুরুষ বিভক্তি।

১) মৌলিক ক্রিয়া:

সিদ্ধ বা মৌলিক ধাতুর উত্তর ধাতুবিভক্তি যোগ করে যে ক্রিয়াপদ গঠিত হয় তা মৌলিক ক্রিয়া। যেমন: যুঝ্+ই= যুঝি। বাঁচার জন্য বিরুদ্ধ শক্তির সঙ্গে আমরা যুঝি। এটি হলো মৌলিক ক্রিয়া। 

২) সাধিত ধাতুজ ক্রিয়া:

সাধিত ধাতুর আরেক নাম বহুদল ধাতু। এই সকল ধাতুগুলির প্রত্যেকটিই হয় দুই দল বা বহুদলবিশিষ্ট। এই সাধিত ধাতুজ ক্রিয়া তিন প্রকার। যথা: প্রযোজক ধাতু, নামধাতু, ধ্বন্যাত্মক ধাতু। এই সকল ধাতু গুলির সঙ্গে প্রত্যয় যুক্ত হয়ে ধাতুজ ক্রিয়ার সৃষ্টি করে। 

ক) প্রযোজক ক্রিয়া:

প্রেরণা বা প্রবর্তনা অর্থে প্রযোজক ধাতু ব্যবহৃত হয়। যেমন: মা শিশুকে চাঁদ দেখায়। এখানে দেখানো শব্দটি প্রেরণা অর্থে বোঝানো হচ্ছে। অর্থাৎ কর্তা ছাড়া অন্যের প্রযোজনায় বা প্রেরণায় মৌলিক ধাতুর উত্তর ‘আ’ প্রত্যয় যোগে গঠিত ধাতুকে প্রযোজক ধাতু বলে। মৌলিক ধাতুর সঙ্গে প্রত্যয় যোগ করে প্রযোজক ধাতু হয়। এই প্রযোজক ধাতুর সঙ্গে ক্রিয়া বিভক্তি যুক্ত হয়ে প্রযোজক ক্রিয়া গঠন করে। 

খ) নামধাতুজ ক্রিয়া:

নাম পদ বিশেষ্য ও বিশেষণ পদের উত্তর ‘আ’ প্রত্যয় যোগ করে যে ধাতু নিষ্পন্ন হয় তাকে নামধাতু বলে। এই নামধাতুর উত্তর ক্রিয়া বিভক্তি যোগে নামধাতুজ ক্রিয়া গঠিত হয়। যেমন: মেঘের বুকে বিদ্যুৎ চমকায়। 

গ) ধ্বন্যাত্মক ধাতুজ ক্রিয়া:

অনুকার শব্দ ধাতু রূপে ব্যবহৃত হয়। যেমন: ছেলেটা সকাল থেকে রাগে ফুঁসছে। আবার অনুকার শব্দে ‘আ’ প্রত্যয় যোগ করেও ধাতু নিষ্পন্ন হয়। যেমন: ড্রাইভার গাড়ির হাকাচ্ছিল। 

৩) বহুপদ বা সংযোগমূলক ক্রিয়া:

নাম পদ বা ধ্বন্যাত্মক শব্দের সঙ্গে বিভিন্ন ধাতুর সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে নিষ্পন্ন ধাতু- যেমন: বহাল কর, বরখাস্ত কর, গমন কর ইত্যাদি গঠন করলে তাকে বহুপদ বা সংযোগমূলক ক্রিয়া বলা হয়।

যেমন:ডুব দে মন জয় কালী বলে।” “গরমে মাছগুলি খাবি খাচ্ছে।” 

এই সংযোগমূলক ক্রিয়া সাধারণত দ্বিপদ হয়। উপরের সব দৃষ্টান্তই দ্বিপদ। ক্ষেত্রবিশেষে ট্রিপদও হয়। আবার চতুর্পদবিশিষ্টও হতে পারে। যেমন: ১) সাবধান, পকেট মার হবে। ২) সাবধান, পকেট মার হতেও পারে। 

বহুপদ বা সংযোগমূলক ধাতুর নিষ্পন্ন ক্রিয়া দুই শ্রেণীর- ১) যুক্ত। ২) যৌগিক। 

  • যে ধাতুর প্রথম অংশ বিশেষ্য বা বিশেষণ এবং পরের অংশ কর্, হ্, পা দে, খা ইত্যাদি ধাতু, এই ধরনের সংযোগমূলক ধাতুকে যুক্ত ধাতু বলা হয়।
  • যেসব সংযোগমূলক ধাতুর প্রথম অংশে অসমাপিকা ক্রিয়া এবং দ্বিতীয় অংশে ওঠ্, পড়্, বস্, থাক্ ইত্যাদি ধাতু এইরকম ধাতুকে যৌগিক ধাতু বলা হয়।

৪) সমাপিকা এবং অসমাপিকা ক্রিয়া:

সমাপিকা ক্রিয়া:

যে ক্রিয়া ব্যবহার করলে বাক্যের গঠন এবং অর্থ পূর্ণতা লাভ করে, আর কিছু বলার আকাঙ্ক্ষা থাকে না, তাকে সমাপিকা ক্রিয়া বলে।

উদাহরণ: গাড়ি যথাসময়ে আসিবে। রাস্তায় আলো জ্বলছে অনেকক্ষণ। 

উপরের বাক্য সমূহের আসিবে, জ্বলছে এগুলি হল বিধেয় ক্রিয়া। বাক্যের বিধেয় অংশে বসে উদ্দেশ্যের সঙ্গে নিজের রূপের সঙ্গতি রক্ষা করে এবং উদ্দেশ্যর কার্যকে প্রকাশ করে বলে সমাপিকা ক্রিয়ার অপর নাম হল বিধেয় ক্রিয়া।

সমাপিকা ক্রিয়া গঠনের জন্য চার প্রকারের বিভক্তি লাগে। যেমন- প্রকার বিভক্তি, কাল বিভক্তি, পুরুষ বিভক্তি এবং ভাব বিভক্তি।

অসমাপিকা ক্রিয়া:

যে ক্রিয়া ব্যবহার করলে বাক্যের গঠন এবং অর্থ পূর্ণতা লাভ করে না, এবং আরো কিছু বলার আকাঙ্ক্ষা থেকে যায়, তাছাড়া অর্থের পূর্ণতা জন্য সমাপিকা ক্রিয়ার একান্ত প্রয়োজন থেকে যায়, সেরকম ক্রিয়াকে অসমাপিকা ক্রিয়া বলে।

উদাহরণ: নাবিকেরা দিক নিরূপণ করিতে না পারিয়া বহর হতে দূরে পড়িয়াছিল। করিতেপারিয়া হল অসমাপিকা ক্রিয়া। এগুলি বাক্যের গঠন এবং অর্থকে সম্পূর্ণ করতে পারে না। সেজন্য পড়িয়াছিল ক্রিয়া ব্যবহারের প্রয়োজন আছে। 

বাংলায় সাধু রূপের অসমাপিকা ক্রিয়ার চার রকমের প্রত্যয় আছে। যথা: ১) আ-অন্ত, ২) ইয়া অন্ত, ৩) ইতে-অন্ত, ৪) ইলে-অন্ত। 

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ক্রিয়ার কাল ও কর্তার পুরুষ অনুযায়ী সমাপিকা ক্রিয়ার রূপের পরিবর্তন হয়, কিন্তু অসমাপিকা ক্রিয়ার রূপের কোন রকম পরিবর্তন হয়না।

যেমন:

ক) ক্রিয়ার কাল অনুযায়ী: সূর্য লাল হয়ে ওঠে (বর্তমান)। সূর্য লাল হয়ে উঠেছিল (অতীত)। সূর্য লাল হয়ে উঠবে (ভবিষ্যৎ)। 

খ) কর্তার পুরুষ অনুযায়ী: সে এসে লিখবে (প্রথম পুরুষ)। আপনি এসে লিখবেন (মধ্যম পুরুষ)। আমি এসে লিখব (উত্তম পুরুষ)।

অসমাপিকা ক্রিয়ার দ্বিত্ব প্রয়োগবৈচিত্র লক্ষণীয়:

ক) ইয়া প্রত্যয় যোগে: কাঁদিয়া কাঁদিয়া চলিল কানাই (ক্রিয়া বিশেষণ)। পড়িয়া পড়িয়া মুখ ব্যথা হইল (পুনরাবৃত্তি অর্থে)। 

খ) প্রত্যয় যোগে: সে হেসে হেসে কথা বলতে লাগলো (ক্রিয়া বিশেষণ)। দেখে দেখে চোখ পড়ল, অথচ এলো না (বিরামহীন অর্থ)

গ) ইতে প্রত্যয় যোগে: ভজিতে ভজিতে কৃষ্ণ যদি কৃপা করে (পৌনঃপুনিকতা অর্থে)। 

ঘ) তে প্রত্যয় যোগে: বলতে বলতে এসে পড়লেন বাবুমশাই (ইত্যবসরে)।

সমাপিকা এবং অসমাপিকা ক্রিয়ার পার্থক্য:

১) সমাপিকা ক্রিয়ার ব্যবহারে বাক্যের গঠন ও অর্থ পূর্ণতা পায়। 

কিন্তু অসমাপিকা ক্রিয়া ব্যবহার এ বাক্যের অর্থ বা গঠন কোনটাই পূর্ণতা পায় না।

২) সমাপিকা ক্রিয়া ব্যবহারে বাক্যে বলার আর কিছু আকাঙ্ক্ষা থাকে না।

অসমাপিকা ক্রিয়া ব্যবহারে আরো কিছু বলার আকাঙ্ক্ষা থেকে যায়। তা পূর্ণ করার জন্য সমাপিকা ক্রিয়ার দরকার হয়।

৩) সমাপিকা ক্রিয়া বাক্যে বিধেয় অংশে বসে এবং উদ্দেশ্যর সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা করে।

অসমাপিকা ক্রিয়া বাক্যে বিধেয় অংশে বসলেও উদ্দেশ্যের সাথে তার সঙ্গতি রক্ষার প্রশ্নই ওঠে না।

৪) সমাপিকা ক্রিয়ারূপের জন্য প্রকার, কাল, পুরুষ প্রভৃতি বিভক্তির সংযোজন প্রয়োজন হয়।

অসমাপিকা ক্রিয়ারূপের জন্য আ, ইয়া>এ, ইলে>ল, ইতে>তে প্রভৃতি অন্ত বিভক্তি হলেই চলে।

৫) সকর্মক এবং অকর্মক ক্রিয়া:

অকর্মক ক্রিয়া:

এককথায় যে ক্রিয়ার কোন কর্ম থাকেনা, তাকেই অকর্মক ক্রিয়া বলে। যাওয়া, বসা, দৌড়ানো, কাঁদা ইত্যাদি হল অকর্মক ক্রিয়া। 

অকর্মক ক্রিয়া কে বাক্যে প্রয়োগ করে কয়েকটি উদাহরণ দ্বারা বুঝিয়ে দেওয়া হল।

১) ছেলেটি হাসছে। ২) মেয়েটি নাচবে। ৩) ছেলেটি ঠাণ্ডায় কাঁপছে। 

উপরিউক্ত বাক্যগুলোতে হাসছে, নাচবে, কাঁপছে, এই ক্রিয়া গুলিকে কি বা কাকে দিয়ে প্রশ্ন করলে উত্তর পাওয়া যায় না। তাই এই ক্রিয়া গুলিকে অকর্মক ক্রিয়া বলা হয়।

কখনো কখনো উপসর্গযোগে অকর্মক ধাতুকে সকর্মক করা যায়।

যেমন √ভূ ধাতু অকর্মক; কিন্তু অনু- √ভূ+অপ্= অনুভব, সকর্মক। 

প্রয়োগ: তুমি কি আমার ব্যথা অনুভব করতে পারো? 

এ প্রসঙ্গে বলা দরকার সমধাতুজ কর্মে অকর্মক ক্রিয়া সকর্মক হয়। অকর্মক ধাতু থেকে নিষ্পন্ন বিশেষ্য পদ, ওই ধাতু থেকে নিষ্পন্ন ক্রিয়াপদের কর্ম রূপে ব্যবহৃত হয়। যেমন: কি লড়াই না লড়ল সারাক্ষণ। 

উপরের দৃষ্টান্ত টিতে লড়ল পদটি অকর্মক ক্রিয়া, কিন্তু এখানে সকর্মক রূপে ব্যবহৃত হয়েছে। কারণ এই ধাতু গুলি থেকে নিষ্পন্ন বিশেষ্য পদ কর্ম রূপে প্রযুক্ত। একে বলা হয় সমধাতুজ কর্মের ক্রিয়া। তাছাড়া অকর্মক ক্রিয়া প্রযোজনা বা প্রেরণা অর্থে প্রযুক্ত হলে সকর্মত্ব  লাভ করে। যেমন: লোকগুলি ছেলেটিকে কাঁদায় (প্রযোজক অথচ সকর্মক)। 

সকর্মক ক্রিয়া:

যে ক্রিয়ার কর্ম থাকে, তাকে সকর্মক ক্রিয়া বলে। যেমন: খাওয়া, বলা, দেওয়া, লেখা ইত্যাদি হল সকর্মক ক্রিয়ার উদাহরণ।

উদাহরণ: মাস্টারমশাই আমাদিগকে গল্প বলিলেন। 

এ টাকাটা দেবে কে?

এই জাতীয় ক্রিয়াকে কি বা কাকে দিয়ে প্রশ্ন করলে উত্তর স্বরূপ যা পাওয়া যায়, তাই হল কর্ম। 

আবার এই প্রসঙ্গে বলতে হয়, সকর্মক ক্রিয়াও ক্ষেত্রবিশেষে অকর্মক হয়। যেমন: যিনি সহেন, তিনি রহেন ছাত্রটি এক মনে পড়ছে। 

সকর্মক ক্রিয়া দুই প্রকারের। যথা: এককর্মক এবং দ্বিকর্মক।

যে ক্রিয়ার একটি কর্ম থাকে, সেটি হল এককর্মক ক্রিয়া। যেমন: বাঙালিরা ভাত খায়। এখানে খায় ক্রিয়ার ভাত একমাত্র কর্ম। 

যে ক্রিয়ার দুটি কর্ম থাকে, তাহলো দ্বিকর্মক। উদাহরণ: মাস্টারমশাই আমাদিগকে গল্প বললেন।  

দ্বিকর্মক ক্রিয়ার বস্তুবাচক কর্মটি মুখ্য কর্ম এবং প্রাণিবাচক কর্মটি গৌণ কর্ম। 

অকর্মক ক্রিয়া এবং সকর্মক ক্রিয়ার তুল্যমূল্য আলোচনা:

১) যে ক্রিয়ার কর্ম থাকেনা তা অকর্মক।

আর যে ক্রিয়ার কর্ম থাকে তা হলো সকর্মক।

২) সমধাতুজ কর্ম ক্রিয়া অকর্মক হয়েও সকর্মক হয়।

আর সকর্মক ক্রিয়াও ক্ষেত্রবিশেষে অকর্মক হয়।

৩) অকর্মক ক্রিয়া প্রযোজনা বা প্রেরণা অর্থে প্রযুক্ত হলে সকর্মত্ব লাভ করে।

অন্যদিকে সকর্মক ক্রিয়া প্রযোজনা প্রেরণা অর্থে প্রযুক্ত হলে ক্রিয়ার দ্বিকর্মত্ব যথারীতি বজায় থাকে।

৪) সমধাতুজ কর্মে অকর্মক ক্রিয়া সকর্মক হলেও দ্বিকর্মক হয়না, এককর্মক হয়।

কিন্তু সকর্মক ক্রিয়া এককর্মক ও দ্বিকর্মক দু-রকমই হয়।

৬) কর্মবাচ্যের ক্রিয়া:

মূল ধাতু সঙ্গে ‘আ’ প্রত্যয় যোগ করলে কর্মবাচ্যের ধাতু হয়। তার সঙ্গে ধাতু বিভক্তি যোগ করলে কর্মবাচ্যের ক্রিয়া হয়। যেমন- দেখ্+আ= দেখা। 

প্রয়োগ: সে আমাকে ছবি দেখায়

৭) দ্বিকর্মক ক্রিয়া:

দ্বিকর্মক ক্রিয়া বোঝার জন্য সকর্মক ক্রিয়া সংক্রান্ত আলোচনা বিশেষভাবে দ্রষ্টব্য।

৮) পঙ্গু ক্রিয়া:

সকল কালের সকল ভাবের রূপ হয় না এমন ধাতুর উত্তর ধাতু বিভক্তি যোগে গঠিত ক্রিয়া হলো পঙ্গু ক্রিয়া। যেমন- আছ ধাতু থেকে গঠিত ক্রিয়ার সকল কালের সকল ভাবের রূপ হয় না। যেমন- বর্তমান কালে- আছি, আছো, আছে। অতীত কালে- ছিলাম, ছিলে, ছিল। কিন্তু এর ভবিষ্যৎ কালের কোনরূপ হয়না। সে কারণে থাক্ ধাতুর সাহায্য নিতে হয়। যেমন- থাকবো, থাকবে ইত্যাদি। কাজেই আছ ধাতুনিষ্পন্ন ক্রিয়া পঙ্গু ক্রিয়া।

ক্রিয়ার কাল:

ক্রিয়ার যে বিভক্তি ধর্ম থেকে ক্রিয়ার ঘটনার সময়ের বোধ জন্মায়, তাকে ক্রিয়ার কাল বলে। ক্রিয়ার কাল প্রধানত তিন প্রকার: ১) বর্তমান, ২) অতীত, এবং ৩) ভবিষ্যৎ। 

  • যে ক্রিয়া এখনো ঘটছে বা স্বভাবতঃ ঘটে থাকে তাকে বর্তমানকাল বলে। যেমন- কৃষকেরা মাঠে যাচ্ছে। সূর্য পূর্ব দিকে উদিত হয়। 
  • যে ক্রিয়া পূর্বে সংঘটিত হয়েছে তার কালকে অতীতকাল বলে। যেমন- মধু দিল্লী গিয়েছিল। ছেলেরা বল খেলছিল। 
  • যে ক্রিয়া এখনো ঘটেনি, পরে ঘটবে, তার কালকে ভবিষ্যৎ কাল বলে। যেমন- সুরেশ কাল বাড়ি আসবে। আমি পরের বছর মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবো।

ক্রিয়ার প্রকার:

তিনটি কালের প্রত্যেকটিকে কার্য সংঘটনের সুক্ষতার বিচারে আবার কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। এগুলি কালের প্রকার।

যেমন-

ক) বর্তমান কাল: ১) সাধারণ বা নিত্য বর্তমান বা অভ্যাসগত বর্তমান। ২) ঘটমান বর্তমান। ৩) পুরাঘটিত বর্তমান। ৪) বর্তমান অনুজ্ঞা। 

খ) অতীত কাল: ১) সাধারণ বা নিত্য অতীত, ২) ঘটমান অতীত, ৩) পুরাঘটিত অতীত, ৪) নিত্যবৃত্ত অতীত। 

গ) ভবিষ্যৎ কাল: ১) সাধারন বা নিত্য ভবিষ্যৎ, ২) ঘটমান ভবিষ্যৎ। ৩) পুরাঘটিত ভবিষ্যৎ। ৪) ভবিষ্যৎ অনুজ্ঞা।

বর্তমান কাল:

১) সাধারণ বা নিত্য বর্তমান বা অভ্যাসগত বর্তমান:

 সাধারণত স্বভাবত, সর্বকালে বা নিত্য সংঘটিত হয় এমন ক্রিয়া-ব্যাপারের কালকে সাধারণ বা নিত্য বর্তমান অভ্যাসগত বর্তমান বলে। উদাহরণ: দরজার পাশে দাঁড়িয়ে সে হাসে

কখনো কখনো কোন অতীত ঘটনা অথবা কোন ঐতিহাসিক ঘটনার বর্ণনায় অতীতকালের ক্রিয়ারূপের পরিবর্তে সাধারণ বর্তমান কালের ব্যবহার করা হয়। একে ঐতিহাসিক বর্তমান বলে।

যেমন: নেতাজি আজাদ হিন্দ ফৌজ এর সর্বাধিনায়ক হন। 

২) ঘটমান বর্তমান:

যে কাজটি এখনো সংঘটিত হচ্ছে সেই কালকে ঘটমান বর্তমান বলে। যেমন: ছেলেরা পড়ছে। তারা খাচ্ছে।

৩) পুরাঘটিত বর্তমান:

যে কাজ সবে শেষ হয়েছে, কিন্তু তার ফল বা প্রভাব এখনো বর্তমান আছে এরকম ক্রিয়ার কালকে পুরাঘটিত বর্তমান কাল বলে। যেমন: তুমি বইখানি পড়েছ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গীতাঞ্জলি রচনা করেছেন।

৪) বর্তমান অনুজ্ঞা:

বর্তমানকালে অনুরোধ, আদেশ ইত্যাদি বোঝাতে ক্রিয়ার বর্তমান অনুজ্ঞা হয়। যেমন: এখানে আইসো। সেখানে যাও। এসো ভাই সব। 

অতীত কাল:

১) সাধারণ বা নিত্য অতীত:

অতীতে যে কাজ শেষ হয়েছে তার ক্রিয়ার কালকে সাধারণ বা নিত্য অতীত বলে। যেমন: স্বপন আসলো। তুমি আমার পাশে বসলে।

২) ঘটমান অতীত:

অতীতে যে কাজ হচ্ছিল, তার ক্রিয়ার কালকে ঘটমান অতীত বলে। যেমন: গীতা গান করছিলো। আমরা ভাত খাচ্ছিলাম।

৩) পুরাঘটিত অতীত:

অতীতে যে কাজ শেষ হয়েছে অথবা বাক্যে বর্ণিত দুটি অতীত কাজের মধ্যে যে কাজটি পূর্বে শেষ হয়েছে তার ক্রিয়ার কালকে পুরাঘটিত অতীত বলে। যেমন: রমেশ বাড়ি এসেছিল। আমরা স্টেশনে পৌঁছবার আগে গাড়ি প্রবেশ করেছিল। ডাক্তার আসার আগে রোগীটি মারা গিয়েছিল।

৪) নিত্যবৃত্ত অতীত: 

অতীতে কোনো কাজ নিয়মিত বা কিছুকাল ধরে ঘটত এরকম বোঝাতে ক্রিয়ার নিত্যবৃত্ত অতীত কালের প্রয়োগ করতে হয়।

যেমন: আমরা নদীতীরে ভ্রমণ করতাম। তিনি প্রত্যহ আমাদের বাড়িতে আসতেন।

ভবিষ্যৎ কাল:

১) সাধারণ বা নিত্য ভবিষ্যৎ: 

যে কাজ ভবিষ্যতে হবে বোঝায়, তার ক্রিয়ার কালকে সাধারণ বা নিত্য ভবিষ্যৎ বলে। যেমন: রমেন এবং আমি বাড়ি যাব। রাখাল মাঠে চাষ করবে।

২) ঘটমান ভবিষ্যৎ:

যে কাজ ভবিষ্যতে হতে থাকবে তার ক্রিয়ার কালকে ঘটমান ভবিষ্যৎ বলে। যেমন: অমল ঘুমাতে থাকবে। পাখিরা ডাকতে থাকবে।

৩) পুরাঘটিত ভবিষ্যৎ: 

যে ক্রিয়ার কাল রূপ ভবিষ্যতের কিন্তু কাজটি অতীতের এবং এতে সন্দেহের ভাব বর্তমান, তাকে পুরাঘটিত ভবিষ্যৎ বা সম্ভাব্য বা সন্দেহঅতীত বলে। যেমন: গৌতম অংকটি কষে থাকবে। আমরা তখন ঘুমিয়ে থাকব। তারা সারা রাত্রি জেগে থাকবে।

৪) ভবিষ্যৎ অনুজ্ঞা:

ভবিষ্যতে, আদেশ, অনুরোধ, প্রার্থনা ইত্যাদি ক্রিয়া সংঘটিত হবে এরকম বোঝালে তার ক্রিয়ার কালকে ভবিষ্যৎ অনুজ্ঞা বলে।

যেমন: তুমি কাল স্কুলে যেও। অহংকারী হইও না। চিঠির উত্তর দিও।

ক্রিয়ার ভাব:

বাক্যস্থিত সমাপিকা ক্রিয়াপদে কর্তার বিশেষ অবস্থা, অথবা কতৃসম্বন্ধীয় কোন ক্রিয়া বোঝায়। এই ক্রিয়ার ভাব যাতে সূচিত হয় তাকে বলা যেতে পারে ক্রিয়ার ভাব। বাংলা ক্রিয়াপদের ভাব দুরকম। যথা: নির্দেশক ভাব এবং অনুজ্ঞা ভাব। এছাড়া সংযোজক ভাবও রয়েছে। তবে তা এক্ষেত্রে আমাদের আলোচ্য নয়।

১) নির্দেশক ভাব: 

যে ক্রিয়াপদ সাধারণভাবে কার্য সংঘটনের তথ্যাদি প্রকাশ করে তাকে ক্রিয়ার নির্দেশক ভাব বলে। অতীত বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ এই তিন কালের ক্রিয়ারূপের ব্যবহার হয় নির্দেশক ভাবে।

যেমন: পাখি ওড়ে। ‘ওড়ে’ ক্রিয়াপদটি পাখির ওড়া কাজ বা ওই তথ্যকে সাধারণভাবে নির্দেশ করছে। একই ভাবে উদাহরণ হিসেবে বলা যায় – রাজপুত আবার পর্বতের শিখরদেশে আহরণ করিতে লাগিলেন

২) অনুজ্ঞা ভাব:

যে ক্রিয়াপদ অনুজ্ঞা বা আদেশের ভাব প্রকাশ করে, তাকে ক্রিয়ার অনুজ্ঞা ভাব বলে। অনুজ্ঞা ভাব প্রকাশের জন্য কেবল বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কাল ব্যবহৃত হয়। তাছাড়া আবেদন প্রার্থনা, অনুনয়, উপদেশ, আশীর্বাদ ও অভিশাপ প্রভৃতি ভাবপ্রকাশনা অনুজ্ঞা ভাবের অন্তর্গত। যেমন- সময়ের সদ্ব্যবহার করবে (উপদেশ)। দীর্ঘজীবী হও বৎস (আশীর্বাদ)। ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন (প্রার্থনা)। জাহান্নামে যা পাপিষ্ঠ (অভিশাপ)। 

কাল অনুযায়ী অনুজ্ঞা ভাব দু রকম। ১) বর্তমান কালের অনুজ্ঞা ভাব, ২) ভবিষ্যৎ কালের অনুজ্ঞা ভাব। 

ক্রিয়া বিভক্তি:

প্রকার বিভক্তি, কাল বিভক্তি ও পুরুষ বিভক্তির সমন্বয়ে সমাপিকা ক্রিয়া বিভক্তি গড়ে ওঠে। সুতরাং, সমাপিকা ক্রিয়া বিভক্তির গঠনপ্রণালী জানার জন্য যথাক্রমে প্রকার বিভক্তি, কাল বিভক্তি এবং পুরুষ বিভক্তির বিস্তৃত আলোচনা করা দরকার। আলোচনার সুবিধার জন্য আগে প্রকার বিভক্তি ও পরে কাল বিভক্তি আলোচিত হলো।

  • প্রকার বিভক্তি: যে বিভক্তির দ্বারা ক্রিয়া সংঘটনের প্রকৃতি অর্থাৎ কিভাবে ঘটে, ঘটছে, ঘটেছে ইত্যাদি বুঝিয়ে দেওয়া যায় তাকে বলে প্রকার বিভক্তি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ অনুজ্ঞার প্রকার বিভক্তি নেই।
  • কাল বিভক্তি: যে বিভক্তির দ্বারা ক্রিয়া সংঘটনের সময় অর্থাৎ বর্তমান, অতীত বা ভবিষ্যৎ কাল বুঝিয়ে দেওয়া হয় তাকে বলে কাল বিভক্তি। এ ক্ষেত্রে উল্লেখ করতে হয় যে বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ অনুজ্ঞার কাল বিভক্তি নেই।
  • পুরুষ বিভক্তি: যে বিভক্তি দ্বারা কর্তার পুরুষ অনুযায়ী কর্তার সঙ্গে বিভিন্ন কালের এবং বিভিন্ন প্রকারের ক্রিয়ারূপের সম্পর্ক বুঝিয়ে দেওয়া হয় তাকে বলা হয় পুরুষ বিভক্তি।

এই উপস্থাপনাটির মাধ্যমে আমরা আপনাদের কাছে ক্রিয়াপদের সকল দিকগুলোকে যথাসম্ভব সহজভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছি। আশাকরি আমাদের এই প্রয়াস আপনাদের ভাল লেগেছে এবং এটি বাংলা ব্যাকরণের ক্রিয়াপদ সম্পর্কে আপনাদের সকল কৌতূহল এবং জিজ্ঞাসা নিরসন করতে সক্ষম হবে। ক্রিয়াপদ নিয়ে আমাদের এই প্রতিবেদন আপনাদের কেমন লাগলো তা নিচে কমেন্টের মাধ্যমে আমাদের জানান।

আপনাদের মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চেষ্টা করব আপনাদের মতামত অনুযায়ী আমাদের লেখনীকে আরও উন্নত করে তোলার। তাছাড়া যদি এমনই অন্য কোন রচনা পড়তে চান সে বিষয়েও আমাদের অবগত করুন। আমরা অতি সত্বর সেই রচনাটি আপনার কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করব। ধন্যবাদ।।

Print Friendly, PDF & Email

রাকেশ রাউত

রাকেশ রাউৎ বাংলা রচনা ব্লগের নির্বাহী সম্পাদক। ইনি শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী একজন মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার। ইনি বাংলা রচনার সম্পাদকীয় দলকে লিড করেন। রাকেশ দীর্ঘ ৫ বছর যাবৎ বাংলা কনটেন্ট এডিটিং এর সাথে যুক্ত আছেন। ইনি বাংলা রচনা ছাড়াও নামকরণ এবং বাংলা জীবনীর মতো নামকরা সাইটের সম্পাদকীয় দলের একজন অন্যতম সদস্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট