দেখে নিন ইংরেজিতেও রচনা

একটি সেতুর আত্মকথা রচনা [সঙ্গে PDF]

আমাদের চারপাশে প্রতিদিনকার জীবনচর্যায় আমরা অসংখ্য সেতুকে ছড়িয়ে থাকতে দেখি। প্রতিটি সেতু কোন না কোন দুটি বিচ্ছিন্ন স্থানের মধ্যে নিরবিচ্ছিন্ন সংযোগ রক্ষা করে চলে। এদের মধ্যে এমন অসংখ্য সেতু রয়েছে যারা অতি প্রাচীন।

কল্পনার জগতে একবার চোখ ফেরালে দেখা যাবে এদের প্রত্যেকেরই হয়তো কিছু-না-কিছু আত্মজীবনী রয়েছে। ভারতীয় উপমহাদেশের এমনই একটি প্রাচীন সেতুর জীবনকথাকে প্রাণ দানের অভিপ্রায় নিয়ে আমাদের এই উপস্থাপনা- একটি সেতুর আত্মকথা রচনা

একটি সেতুর আত্মকথা রচনা বৈশিষ্ট্য চিত্র

ভূমিকা:

মানব সভ্যতা তথা দৈনন্দিন মানবজীবনে সেতুর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। একটি সেতু দুটি তথাকথিত বিচ্ছিন্ন স্থলভাগের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করে। একটি সেতুর মাধ্যমেই মানুষ বিচ্ছিন্ন একটি পাঁচ থেকে অপর পাশে পৌঁছতে সক্ষম হয়। তবে এই মানবজাতি স্বভাবতই স্বার্থপর। এটা প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে সবকিছুকে অবহেলায় ছুড়ে ফেলে দেয়।

আমি তেমনই প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়ার কারণে অবহেলায় ছুড়ে ফেলে দেওয়া প্রবীণ এক সেতু যে আজব একটি নাম না জানা ছোট নদীর উপর দিয়ে দুটি স্থানের মধ্যে নিরবিচ্ছিন্ন যোগাযোগ রচনা করে চলেছি। আমি অবহেলায় প্রতিবাদ করতে পারিনা, কারন আমি মূক। তবে কান পেতে শুনলে আমার শরীরে স্পন্দন শোনা যায়।

কিন্তু আমার সেই জীবনগাঁথা শোনার মতন কেউ নেই। তাই আমি আমার শিরায় শিরায় লুকিয়ে রেখেছি শত বৎসরের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা। এই জরাজীর্ণ শরীরে ভবিষ্যৎ অস্তিত্বের অনিশ্চয়তায় আজ আমি হৃদয় দিয়ে বলে যাব আমার আত্মকথা।

আমার জন্ম:

আমার জন্ম আজ থেকে বহু বছর আগে। ভারতবর্ষের উত্তর পূর্ব অংশে একদল স্থানীয় উপজাতির মানুষ কাঠ গাছের গুড়ি দিয়ে একটি ছোট্ট নদীর উপর এপার ওপারে যোগাযোগ স্থাপন করার জন্য অতি যত্নে গড়ে তুলেছিল আমাকে। আমার সর্বাঙ্গে তারা জড়িয়ে বেঁধে দিয়েছিল লতাপাতা।

নদীর পাড় থেকে প্রতিনিয়ত গাছের পাতা আমার গায়ে পড়ে শরীরে আমার লাগতো প্রকৃতির পরশ। হাওয়ায় আমি দুলতাম, ঝড়ে আমি কাঁপতাম; কিন্তু তখন কখনও ভেঙে পড়ার কথা মনে হতো না। স্থানীয় অঞ্চলের অধিবাসীরা পরম ভালোবাসা সহকারে আমার যত্ন নিত।

তাছাড়া সময়ের সাথে সাথে নদীর দু’পাশে বিভিন্ন বড় বড় গাছের শিকড় হয়তো আমার অস্তিত্ব রক্ষার নিমিত্তই আমায় আঁকড়ে ধরে ছিল। কি অদ্ভুত সুন্দর ছিল আমার সেই কৈশোর আর যৌবনে পদার্পনের দিনগুলি।

আমার যৌবনের ইতিহাস:

স্থানীয় অধিবাসীদের হাতে যত্ন আত্তি পেয়ে প্রতিদিন শরীরে প্রকৃতির পরশ লাগিয়ে এইভাবে আমার চলছিল বেশ। এমন সময় হঠাৎ এলেন অহম রাজারা। তারা আমার অনতিদূরে নদীর দু’পাশে ঘন অরণ্য সাফ করে গ্রাম তৈরি করলেন।

উদ্যোগ নিলেন আমার সংস্কারের। আমার আধুনিকায়ন হেতু নদীর দুই তীরে আমার দুই প্রান্ত থেকে আগাছা সাফ করে শিকরবাকর পরিষ্কার করে আমার শরীরে তারা জড়িয়ে বেঁধে দিলেন শক্ত দড়ি।

আমার দুপাশে টানা হিসেবে দিলেন মোটা গাছের গুড়ি। শরীরে কোথাও কোথাও ভেঙে যাওয়া কাঠের টুকরো স্থান নিল সুষ্ঠুভাবে কাটা মোটা পাটাতন। এইভাবে আমার পূর্ণ যৌবনে পদার্পণ।  যৌবনে যেমন মানুষের শরীর শক্ত সমর্থ পেশীবহুল হয়ে ওঠে, তেমনি আমিও শরীরে নতুন শক্তি নিয়ে আরো বেশি ভার বহনের জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠলাম। স্থানীয় গ্রামবাসীদের মুখে আমার নাম রটে গেল জংলা সাঁকো

আমার বিবর্তন:

এরপর কেটে গেছে বহু বছর, বেশ কয়েক শতাব্দী। আমার সময়ের হিসেব গেছে গুলিয়ে; শুধু স্মৃতির পাতায় লিখে রেখেছি আমার ওপর দিয়ে ঘটে যাওয়া অসংখ্য অগণিত ঘটনার নামাবলী। কালের অমোঘ নিয়মে আমার জন্মদাতা সেই উপজাতির মানুষগুলি গেল হারিয়ে, এল অহম রাজারা, আমার দুপারে বসল ছোট বড় গ্রাম। তারপর আবার এক সময় সেই অহম রাজারাও মহাকালের গর্ভে হারিয়ে গেলেন।

আমার দুপারে গড়ে ওঠা সেই গ্রাম গুলিরও আর চিহ্নমাত্র রইল না। মাঝে মাঝে আমার ওপর দিয়ে কিছু বল্লমধারী সৈনিক ঘোড়া ছুটিয়ে চলে যেত। তারপর এক সময় আর তারাও আসতো না। তবে এরপর কখনো কখনো আসতো একদল তরুণ। তাদের চোখ উজ্জ্বল, বুদ্ধিদীপ্ত চাহনি, বুকে একরাশ স্বপ্ন। দেখতাম আমার ওপর দাঁড়িয়ে কি যেন শলাপরামর্শ করত।

বর্তমানে আমি:

এই দীর্ঘ বিবর্তনের জোড়াসাঁকো পেরিয়ে আজ আমি বর্তমানে জরার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছি। যারা আগে আসত তারা এখন আর কেউ আমার কাছে আসে না। আমার চারপাশে যেটুকু ফাঁকা জায়গা ছিল, সেগুলি আবার অরণ্য পুনরাধিকার করে নিয়েছে।

তবে সেই কৈশোরের মতন এখন আর আমাকে গাছ-গাছালির শিকড়গুলি জড়িয়ে ধরতে আসে না, পাখিরা আমার সাথে কথা কয় না, অরণ্যের বৃক্ষরাজিও পরম অবহেলায় আমার ওপর শুকনো পাতা ফেলে যায়। বাইরের পৃথিবী আজ হয়তো অনেকখানি বদলে গেছে।

আমি যে এইখানে এখনো বেঁচে আছি তা হয়তো সেই বদলে যাওয়া পৃথিবীর কেউ মাত্র জানেনা। আমার সর্বাঙ্গে এখন পুরু শ্যাওলার আস্তরণ। শরীর থেকে এক এক করে কাঠের পাটাতনগুলি ভেঙে পড়ছে।  ভবিষ্যৎ আমার চূড়ান্ত অনিশ্চিত। 

উপসংহার:

কালের নিয়মে বিবর্তিত হতে হতে জীবনের এই উপসংহারে উপনীত হয়ে আমি উপলব্ধি করেছি এই পৃথিবীতে কোন কিছুই স্থায়ী নয়, বরং নিয়ত পরিবর্তনশীল। কালের নিয়মে মানুষ হারিয়ে যায়, সভ্যতা হারিয়ে যায়, হারিয়ে যায় সংস্কৃতি। আর সেই নিয়মে প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে হারিয়ে যেতে হয় আমার মতন নগণ্য সেতুকেও।

তবে একটি বিষয়ে আমার মনে কোন দ্বিধা নেই, মানব সভ্যতার যে উদ্দেশ্য সাধনের জন্য আমার জন্ম হয়েছিল আমি তা সার্থকভাবে পালন করতে পেরেছি। সেই পালনের নিমিত্ত এই দীর্ঘ সময়কালে যে অসংখ্য অভিজ্ঞতা আমি লাভ করেছি, আগামীকাল সেই অভিজ্ঞতার ঝুলি নিয়ে ইহজীবনের পরিসমাপ্তি হলেও আমার কোনো দুঃখ থাকবে না। 


উপরিউক্ত প্রতিবেদনটিতে যথাসম্ভব বিশ্লেষণাত্মক ভাবে আমি একটি সেতুর আত্মকথা সম্বন্ধিত সকল দিককে যথাযথ গুরুত্ব সহকারে উল্লেখপূর্বক আলোচনা করার চেষ্টা করেছি। আশাকরি আমাদের এই প্রয়াস আপনাদের ভাল লেগেছে। এই প্রবন্ধ সম্পর্কে আপনার মতামত কমেন্টের মাধ্যমে আমাদের জানান।

আপনাদের মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চেষ্টা করব আপনাদের মতামত অনুযায়ী আমাদের লেখনীকে আরও উন্নত করে তোলার। তাছাড়া যদি এমনই অন্য কোন রচনা পড়তে চান সে বিষয়েও আমাদের অবগত করুন। আমরা অতি সত্বর সেই রচনাটি আপনার কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করব। ধন্যবাদ।

Print Friendly, PDF & Email

রাকেশ রাউত

রাকেশ রাউৎ বাংলা রচনা ব্লগের নির্বাহী সম্পাদক। ইনি শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী একজন মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার। ইনি বাংলা রচনার সম্পাদকীয় দলকে লিড করেন। রাকেশ দীর্ঘ ৫ বছর যাবৎ বাংলা কনটেন্ট এডিটিং এর সাথে যুক্ত আছেন। ইনি বাংলা রচনা ছাড়াও নামকরণ এবং বাংলা জীবনীর মতো নামকরা সাইটের সম্পাদকীয় দলের একজন অন্যতম সদস্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট