দেখে নিন ইংরেজিতেও রচনা

একটি সমুদ্র ভ্রমণের অভিজ্ঞতা রচনা [সঙ্গে PDF]

 

বাংলা রচনা নিয়ে এসেছে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের জন্য একটি বিশেষ ই-বুক। একান্ত নির্ভরযোগ্য প্রবন্ধ রচনার উত্তরসহ সাজেশন। অতি সামান্য মূল্যে এই বইটি কিনতে এখানে ক্লিক করুন

পৃথিবীর আশ্চর্য সুন্দর সুন্দর জিনিসগুলির মধ্যে সমুদ্র অন্যতম। সমুদ্রের অথৈ জলের গভীরে লুকিয়ে রয়েছে হাজারও বিস্ময় ও রহস্য। তাই ভ্রমন পিপাসু বাঙালির সমুদ্র ভ্রমণের ইচ্ছে নিয়ে কোনো প্রশ্ন আসেনা। সমুদ্র ভ্রমণের এক অভিজ্ঞতাকে নিয়েই আমাদের আজকের উপস্থাপন একটি সমুদ্র ভ্রমণের অভিজ্ঞতা রচনা

সমুদ্র ভ্রমনের অভিজ্ঞতা রচনা

ভুমিকা:

মানুষের জীবনে আস্বাদিত সর্বোত্তম অভিজ্ঞতা গুলির মধ্যে অন্যতম হলো ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। ভ্রমণ মানুষকে রোজকার একঘেয়ে জীবন থেকে সাময়িকভাবে মুক্তি দিয়ে প্রাণবন্ত নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ করে দেয়। বাঙালি স্বভাবতই ভ্রমণপিপাসু জাতি। অতি প্রচলিত একটি প্রবাদ অনুসারে বাঙ্গালীদের পায়ের তলায় সর্ষে; সে কারণে তারা এক জায়গায় খুব বেশি দিন স্থির হয়ে থাকতে পারে না।

এমন ভ্রমণপিপাসু বাঙ্গালীদের মধ্যে আমিও একজন। বছরে অন্তত দুবার রোজকার একঘেয়ে জীবন থেকে মুক্তি খুঁজে নেওয়ার উদ্দেশ্যে আমি পাড়ি জমাই কোথাও না কোথাও। কখনো ছুটে যাই অতীত ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখবার উদ্দেশ্যে, কখনো এই যান্ত্রিক নগর সভ্যতা থেকে মুক্তির জন্য ছুটে যায় প্রকৃতির কোলে।

অতি সম্প্রতি এমনই একটি ভ্রমণের উদ্দেশ্যে আমি পৌঁছে গিয়েছিলাম সমুদ্রে। ইতিপূর্বে বহুবার সমুদ্র ভ্রমণে গেলেও এইবারের অভিজ্ঞতাটি সম্পূর্ণ অনন্য এবং অভিনব। সেই অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করার উদ্দেশ্যেই এই প্রতিবেদনের উপস্থাপনা।

 

বাংলা রচনা নিয়ে এসেছে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের জন্য একটি বিশেষ ই-বুক। একান্ত নির্ভরযোগ্য প্রবন্ধ রচনার উত্তরসহ সাজেশন। অতি সামান্য মূল্যে এই বইটি কিনতে এখানে ক্লিক করুন

স্থান নির্বাচন:

কোথাও ভ্রমণে যাবার পূর্বে সেই ভ্রমণ সম্পর্কিত নির্দিষ্ট পরিকল্পনা করা একান্ত আবশ্যক। সুষ্ঠু পরিকল্পনা ভিন্ন সুন্দর একটি ভ্রমণের অভিজ্ঞতা লাভ সম্ভব হয়না। আর এই পরিকল্পনার সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ভ্রমণের স্থান নির্বাচন। এইবার ভ্রমণ পরিকল্পনার শুরু থেকেই আমি ঠিক করে রেখেছিলাম সমুদ্র ভ্রমণের উদ্দেশ্যে রওনা হব।

কিন্তু প্রশ্ন ছিল কোথাকার সমুদ্র! সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেল পরিবারের সঙ্গে ভ্রমণ পরিকল্পনার সময়ে। কথায় বলে হঠাৎ পরিকল্পনা করে মধ্যবিত্ত বাঙালির ভ্রমণ মানে নিশ্চিত গন্তব্য হবে ‘দিপুদা’- অর্থাৎ দীঘা বা পুরী কিংবা দার্জিলিং। নিশ্চিত ব্যতিক্রমহীনভাবে আমরাও এই বছর ভ্রমণের জন্য দীঘার সমুদ্রকে গন্তব্যরূপে স্থির করলাম।

যাত্রাপথ ও গন্তব্য:

ইতিপূর্বে বেশ কয়েকবার যখন দীঘা দিয়েছি তখন মূলত বাসে কিংবা গাড়িতে সফর করেছি। তবে এইবারে আমার সফর রেলপথে। নির্দিষ্ট দিনে হাওড়া স্টেশন থেকে সকাল সকাল শতাব্দী এক্সপ্রেস ধরে আমরা রওনা হলাম দীঘার উদ্দেশ্যে। ট্রেনে উঠেই খানিকক্ষণ বাদে বাড়ি থেকে নিয়ে আসা লুচি তরকারি দিয়ে সকালের প্রাতরাশ সেরে নিলাম।

তারপর জানালার দিকে তাকিয়ে ট্রেনের বাইরের পৃথিবীর সবুজ রূপ দেখতে দেখতে এগিয়ে চললাম গন্তব্যের দিকে। ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখতে থাকলাম পিছনে সরে যাচ্ছে গাছপালা, নদী, মাঠক্ষেত; মানুষ তার ব্যস্ত জীবনের জীবিকা অর্জনের উদ্দেশ্যে পরিশ্রম করে চলেছে। অফিস যাত্রীরা অফিসে যাচ্ছেন, গ্রামের ক্ষেতে চাষিরা চাষ করছে, ছোট খাল কিংবা বিলে কাপড় কাচছে ধোপার দল।

এইভাবে যাত্রা শুরুর প্রায় ঘণ্টা চারেক পরে আমাদের ট্রেন দীঘা এসে পৌঁছালো। ট্রেন থেকে নেমে কিছুদূর হেঁটে যাওয়ার পরই সমুদ্রের মৃদু আওয়াজ কানে আসছিল। তারপর আরো বেশ খানিকটা হেঁটে আমরা পৌঁছালাম আগে থেকে ঠিক করে রাখা হোটেলে। একেবারে সমুদ্র সৈকতের ধারে সুন্দর একটি হোটেল। দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল। 

সমুদ্রসৈকতে প্রথম দিন:

হোটেলে পৌঁছে ব্যাগপত্র রেখে আধঘন্টা মতন বিশ্রাম নিয়ে আমরা পৌঁছালাম একেবারে সমুদ্রের ধারে। পৌঁছে দেখি সমুদ্র তখন উত্তাল। মুহুর্মুহু বড় বড় ঢেউ আছড়ে পড়ছে সমুদ্রের পাড়ে। সেইসঙ্গে বাতাসের আওয়াজ আর বিষম সমুদ্র গর্জন। তবে দুর্যোগের কোন সম্ভাবনা নেই; আকাশে রোদ ঝলমল করছে, কিন্তু সূর্যের তেমন তাপ অনুভূত হচ্ছে না।

কিছু দূরে লোকজন সমুদ্রের ঢেউয়ে স্নান করছে; আমরা এমতাবস্থায় খানিকক্ষণ সমুদ্রসৈকতে বালির উপরে বসে রইলাম। বালির উপর বসে ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কতক্ষণ কেটে গিয়েছিল জানিনা, সম্বিত ফিরল এক ফেরিওয়ালার ডাকে। সে ডাব বিক্রি করছে। তার থেকে একটি জলভরা ডাব কিনে খেয়ে, আমরা নেমে পড়লাম সমুদ্র স্নানের উদ্দেশ্যে।

ঢেউয়ের প্রকোপ বেশি থাকার কারণে সেইদিন বেশিদূর যেতে পারিনি। কিছুটা যাওয়ার পরই ঢেউ এসে গায়ে আছড়ে পড়ছে, আর সেই ঢেউয়ের ধাক্কায় বালির উপর বারবার পড়ে যাচ্ছি। যারা কখনো সমুদ্র স্নান করে নি, এই অভিজ্ঞতার মাধুর্য কোনদিন বুঝতে পারবে না। 

পুরাতন দীঘার উত্তাল সৈকত:

পৌঁছানোর প্রথমদিন আমাদের কেটেছিল বিশ্রাম আর সমুদ্রস্নানের মধ্যে দিয়েই। তার পরের দিন আমরা পৌঁছে গিয়েছিলাম দীঘার পুরাতন সমুদ্র সৈকত দর্শনের উদ্দেশ্যে। পুরাতন দীঘায় পৌছে দেখলাম সেখানে মানুষজনের ভিড় তুলনামূলকভাবে নতুন দীঘার থেকে বেশি। চারিদিক জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে দোকান, বাজার ও বাড়িঘর। সেখানে সমুদ্রের পাড়ে পৌঁছে দেখলাম এখানে সৈকত বলে তেমন কিছু নেই।

সমুদ্র তার উত্তাল ঢেউয়ে গ্রাস করেছে প্রায় সম্পূর্ণ সৈকতটিকে। সমুদ্রের পাড়ে বড় বড় বোল্ডার ফেলে ঢেউ আটকানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু প্রকৃতির শক্তিকে আটকায় কার সাধ্য। এখানে সমুদ্রের রূপ আরো উত্তাল; ঢেউয়ের গর্জন আরো বেশি।

সমুদ্রের পাড়ে দাড়িয়ে বুঝতে পারলাম উত্তাল ঢেউ এসে পড়ছে ফেলে রাখা বড় বড় বোল্ডার গুলোর গায়ে, আর আছড়ে পড়া সেই ঢেউয়ের ছিটা এসে লাগছে আমাদের গায়ে। অদ্ভুত মোহময়ী এবং ভয়ঙ্কর সমুদ্রের এই অপরূপ রূপ।

তালসারি সৈকতে একটি দুপুর:

আমাদের ভ্রমণের তৃতীয় দিন আমরা পৌঁছে গিয়েছিলাম দীঘার অনতিদূরে অদ্ভুত সুন্দর এক জায়গা তালসারিতে। এইখানে সমুদ্রের ধারে সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে লম্বা লম্বা সব গাছ; অধিকাংশই আমার অচেনা। আমরা তালসারি গিয়েছিলাম দুপুরের খাওয়া-দাওয়া সেরে। সূর্য তখন মধ্যগগন থেকে একটু একটু করে পশ্চিমের দিকে হেলে পড়ছে। গাছগুলির পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যের সেই রূপ দেখতে অদ্ভুত সুন্দর লাগছিল।

সেই দিন দুপুর বেলা তালসারি সৈকতে মানুষের ভিড়ও ছিল প্রায় নগণ্য। সেই কারণেই হয়তো দেখা মিলল তালসারি সৈকতের বিখ্যাত লাল কাঁকড়ার দলের। এই লাল কাঁকড়ার দল দুপুর কিংবা বিকেলে ফাঁকা সমুদ্রসৈকতে উঠে আসে; আবার মানুষের ভিড় দেখলেই কোথায় যে মিলিয়ে যায় তা কে জানে। তালসারির সমুদ্র তুলনামূলকভাবে শান্ত।

সমুদ্রের ঢেউ এখানেও রয়েছে তবে তা নতুন কিংবা পুরাতন দিঘার মতন প্রবল নয়। সেইদিন বিকেলটা আমাদের কেটেছিল তালসারি সৈকতে অলস ভাবে বসে সূর্যাস্ত দর্শনের মধ্যে দিয়ে।

মেরিন মিউজিয়াম ভ্রমণের অভিজ্ঞতা:

বর্তমানে দীঘার একটি অন্যতম আকর্ষণ হলো এখানকার মেরিন মিউজিয়াম। ভ্রমণের চতুর্থ দিন বিকেলবেলা এই মিউজিয়াম দেখার উদ্দেশ্যে আমরা হাজির হলাম। ভিতরে পৌঁছে দেখতে পেলাম এখানে বড় বড় এ্যাকুয়ারিয়ামে কৃত্রিম পরিবেশ সংরক্ষণ করা হয়েছে সমুদ্রের বিভিন্ন জীবকে। তাদের প্রত্যেকের স্থানগত ও বৈশিষ্ট্যগত চরিত্র সম্পর্কে বিশদে ব্যাখ্যা করা রয়েছে প্রত্যেকটি অ্যাকোয়ারিয়ামের সামনে একটি ফলকে।

মিউজিয়ামটি ঘুরে দেখবার পর আমরা যে বুঝতে পারলাম সমুদ্রের অন্তস্থল সম্পর্কে আমরা কত কম জানি। এই মিউজিয়ামেরই একজন কর্মকর্তা তথা গাইড আমাদের বললেন সমুদ্রের তলায় লুকিয়ে আছে স্থলভাগের পৃথিবীর চেয়েও অনেক অনেক বড় একটি পৃথিবী, যার অধিকাংশই আজও মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে।

রসনাপূর্তি:

বাঙালি যেমন ভ্রমণপিপাসু, তেমনি খাদ্যরসিক। তাই বাঙালি কোথাও ভ্রমণে যাবে, আর সেখানকার আঞ্চলিক খাবার জিভে চেখে দেখবে না তা একপ্রকার অসম্ভব। আমিও এই সাধারণ বাঙালী স্বভাবের ব্যাতিক্রম নই। সেকারণে যখনই আমি সমুদ্রে যাই, তখনই সমুদ্র সংলগ্ন অঞ্চলের বিভিন্ন সুস্বাদু খাবার আমায় আকর্ষণ করে। এখানে সবচেয়ে বেশি সুস্বাদু খাবার হল বিভিন্ন প্রকারের মাছ।

বিকেলবেলা সমুদ্রের ধারে গেলে দেখা যাবে সারি সারি দোকান বেঁধে বিক্রি হচ্ছে টাটকা সব মাছ ভাজা। সেই মাছের স্বাদ একবার যে খেয়েছে, সে কখনো ভুলতে পারবে না। আর আমার সারা জীবন মনে থাকবে তালসারি সৈকতে সমুদ্রের ধারে বসে সামুদ্রিক কাঁকড়ার ঝোলের স্বাদ। এছাড়া আমাদের হোটেলের শুটকি মাছের তরকারিটিও স্বাদে ও গন্ধে অতুলনীয় ছিল। আমরা স্থানীয় বাজার থেকে অতি সস্তায় বেশ খানিকটা শুটকি মাছ বাড়ির জন্য কিনে নিয়ে এসেছিলাম।

উপসংহার:

দীর্ঘ পাঁচ দিনব্যাপী এই সমুদ্র ভ্রমণ সেরে আমরা যখন বাড়ি ফিরলাম তখন আমাদের মন সমুদ্র ভ্রমণের এই অভিনব অভিজ্ঞতায় আপ্লুত হয়ে আছে। ফেরার পরও বহু দিন রাতে কানে এসে বাজত হোটেলের ঘর থেকে শুনতে পাওয়া সমুদ্র গর্জনের শব্দ। সমুদ্রের ধারে বসে কাটানো অলস দুপুর গুলির কথা খুব মনে পড়ে যেত।

এই অভিজ্ঞতাকে বুকে নিয়েই রোজকার চিরচেনা ব্যস্ত জীবনে প্রবেশ করলাম। আবার হয়তো কখনো সমুদ্রের অমোঘ আকর্ষণ উপেক্ষা করতে না পেরে পৌঁছে যাব উত্তাল কোন সমুদ্রের ধারে; হয়তো এবার অন্য কোথাও।


একটি সমুদ্র ভ্রমণের অভিজ্ঞতা রচনাটি পড়ে আপনার কেমন লাগলো কমেন্টের মাধ্যমে আমাদের জানান। আমরা সব সময় সচেষ্ট থাকি সবার থেকে সুন্দর ও আপনার মনের মতো করে একটি রচনা তুলে ধরার। এখানে নেই এমন রচনা পাওয়ার জন্য রচনাটির নাম আমাদের কমেন্ট করে জানান। দ্রুততার সঙ্গে আমরা উক্ত রচনাটি যুক্ত করার চেষ্টা করবো। সম্পূর্ণ রচনাটি পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

Print Friendly, PDF & Email

 

বাংলা রচনা নিয়ে এসেছে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের জন্য একটি বিশেষ ই-বুক। একান্ত নির্ভরযোগ্য প্রবন্ধ রচনার উত্তরসহ সাজেশন। অতি সামান্য মূল্যে এই বইটি কিনতে এখানে ক্লিক করুন

রাকেশ রাউত

রাকেশ রাউৎ বাংলা রচনা ব্লগের নির্বাহী সম্পাদক। ইনি শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী একজন মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার। ইনি বাংলা রচনার সম্পাদকীয় দলকে লিড করেন। রাকেশ দীর্ঘ ৫ বছর যাবৎ বাংলা কনটেন্ট এডিটিং এর সাথে যুক্ত আছেন। ইনি বাংলা রচনা ছাড়াও নামকরণ এবং বাংলা জীবনীর মতো নামকরা সাইটের সম্পাদকীয় দলের একজন অন্যতম সদস্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট