একটি শীতের দুপুর রচনা [সঙ্গে PDF]

শীতকাল যাদের প্রিয় ঋতু একবাক্যে স্বীকার করে নেবে যে শীতের দুপুর হলো শীতের দিনের সবচেয়ে মোহময়ী পর্যায়। শীতকালে এই সময় প্রকৃতি এক অদ্ভুত মায়াবী রূপে সেজে ওঠে। এমনই একটি শীতের দুপুর সম্পর্কে আলোচনার উদ্দেশ্য নিয়ে আমাদের আজকের এই প্রতিবেদনের উপস্থাপনা।

একটি শীতের দুপুর রচনা বৈশিষ্ট্য চিত্র

ভূমিকা:

শীতকালের কথা শুনে সাধারণত আমাদের মনে প্রথম ভেসে আসে রুক্ষতা, ঝরে যাওয়া, আর শূন্যতার স্মৃতি। সেই জন্যই হয়তো শীত কাব্যেও উপেক্ষিত। আমাদের ছয় ছয়টা চিত্তহরিণী ঋতুর কাছে শীত সত্যিই হয়তো অতটা সুন্দর নয়। তবে বাংলার ঋতুরঙে শীত শ্রীহীন হলেও সে আমার প্রিয় ঋতু।

ঠিক যেমন আমাদের প্রতিটা মানুষের জীবনে শূন্যতা বা ঝরে পড়া না থাকলে আমরা আনন্দ ও উল্লাসকে উদযাপন করতে পারতাম না, ঠিক তেমনি শীতকাল না থাকলে বাকি পাঁচ ঋতুরঙ্গকে আমরা সাদরে আলিঙ্গন করতে পারতাম না। আমরা যদি আর একটু সংবেদনশীলতার সাথে দেখি, তাহলে বুঝতে পারবো শীত আপন রূপে, আপন অনন্যতায় অনন্য। সম্প্রতি এই শীতকালে আমার এক অনিন্দ্য সুন্দর দুপুরের অভিজ্ঞতা হয়েছিল, যা আমার স্মৃতিপটে চিরকাল অক্ষুন্ন হয়ে থাকবে।

শীতকাল ও দুপুর:

শীতকালে দিনের সবচেয়ে সুন্দর সময় নিঃসন্দেহে শীতের সকাল হলেও, দিনের সবচেয়ে মোহময়ী পর্যায় হলো শীতকালের দুপুর। অন্যান্য ঋতুর দুপুরের মতন শীতের দুপুরগুলি সাধারণত যৌবনহীনা হয়না। বরং শীতকালের দিনে দুপুরগুলিই শীতের যৌবনকে পূর্ণতা দান করে। শীতের দিনে সকাল থেকে চারপাশের আবহাওয়ায় যে শিহরণ লেগে থাকে, তা দূর করে পৃথিবীতে মুহূর্তের আরাম দান করে শীতের দুপুর। গৃহস্থালির কাজ সেরে মানুষ শীতের দুপুরে গিয়ে বসে শীতের মৃদু রোদে শরীরকে তপ্ত করতে। বাঙালি সংস্কৃতিতে শীতের দুপুরে খোলা জায়গায় জমে ওঠে পরিবারের সদস্যদের সমবেত আড্ডা। 

আমার কাছে শীতের দুপুর:

শীতকাল যেমন আমার প্রিয় ঋতু, তেমনি শীতকালের দুপুর হল শীতের দিনে আমার প্রিয় সময়। শীতকালের দুপুরগুলি আমার কাছে একান্তই নিজের। আমার বাড়ির সকলে শীতের দুপুরে উঠোনের রোদে সমবেত হয়ে গল্প-গুজব করেন, কখনো মা গুনগুন করে গান গেয়ে ওঠেন। আর অন্যদিকে আমি বাড়ির সমস্ত কোলাহল থেকে বাইরে ছাদে উঠে রোদে এক কোনায় নির্জন বসে থাকি। দুপুরবেলা খাওয়া-দাওয়ার পর শীতকালে ওই দুই তিন ঘন্টা আমি নিজের সাথে কাটাই।

ওই সময় কখনো আমি কবিতা পড়ি, কখনো পড়ি গল্পের বই, কখনো ডাইরি লিখি আনমনে, আবার কখনো বা শুধুমাত্র আকাশের দিকে চেয়ে চুপচাপ বসে থাকি। শীতকালের আকাশ আমার কাছে বড় সুন্দর। তাতে রোদের তেজ নেই, মেঘের ভিড় নেই- যা আছে তা শুধু নীল নীলিমা। সেই নীল মহাশূন্যের মাঝে আমি যেন কোন এক হারিয়ে যাওয়া অন্তরাত্মার প্রতিলিপি খুঁজে বেড়াই।

শীতকালে গ্রামের বাড়িতে:

তবে এই বছর অন্যান্য বারের মতন শীতকালে আমার বাড়িতে থাকা হয়নি। আশাতীতভাবে এ বছর শীতকালে স্কুল থেকে লম্বা ছুটি পাওয়ার কারণে আমরা বাড়ি থেকে আমাদের গ্রামের বাড়িতে যাওয়া স্থির করলাম। নির্দিষ্ট দিনে সকালবেলা আমরা গিয়ে পৌঁছলাম গ্রামের বাড়িতে।

আমাদের এই দেশের বাড়ি বর্ধমান জেলার একটি ছোট গ্রামে। গ্রামের বাড়িতে আমার ঠাকুরদা, ঠাকুমা, বড় জেঠু ও তার পরিবার এখনো বর্তমান। বর্ধমানের অজপাড়াগাঁয়ের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী আমার জেঠুর পরিবার কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। সেইদিনই গ্রামের বাড়ির অচেনা পরিবেশে শীতের দুপুরে আমার এক অনিন্দ্য সুন্দর অভিজ্ঞতা হয়েছিল। এখনো পর্যন্ত আর কোন শীতের দুপুরে আমার মন এসম সম্পূর্ণ তা লাভ করেনি।

পরিবারের সঙ্গে গল্পগুজব:

গ্রামের বাড়িতে পরিবার বলতে একই বাড়িতে থাকা কোন নির্দিষ্ট সংখ্যক মানুষকে বোঝায় না। আমার গ্রামের মতন অজপাড়াগাঁয়ে শীতকালের দুপুরে সমগ্র পাড়াই আদপে একটি পরিবারের আকার ধারণ করে। আমরা যেহেতু গ্রামের বাইরে থেকে আসা নতুন লোক, তাই দুপুরে খাওয়া-দাওয়া সেরে সকলে মিলে রোদ পোহানোর জন্য জমায়েত বসলো আমাদের গ্রামের বাড়ির মাটির উঠোনে।

শীতের দুপুরের এই আড্ডায় মানুষের কত রকমের গল্প। কেউ রোদে বড়ি শুকোতে দিচ্ছেন, কেউবা রোদে দিচ্ছেন আচার। পরিবারের সঙ্গে এমন জমায়েতের পরিবেশ শহরের যানজটের মধ্যে আমরা কখনোই উপভোগ করতে পারিনা। সেই রোদে বসে দেখতে পেলাম বাড়ির বাইরে গাছের ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো তেরছাভাবে এসে পড়েছে সামনের অগভীর সুপুরি গাছের বনে। 

নির্জন মেঠোপথ:

বাড়ির ভেতর থেকে সুপুরি বনের ভেতর সূর্যের আলোর শোভা দেখে সেই দুপুরে আর ঘরে থাকতে পারিনি। বাড়ির ভাইদের সাথে বেরিয়ে পড়েছিলাম গ্রামের মাঠঘাট ভ্রমণের উদ্দেশ্যে। ইতিপূর্বে গ্রামের এমন রূপ প্রত্যক্ষ করার সুযোগ আমার হয়নি। বনের ভেতর দিয়ে পাতার ফাঁক থেকে এসে পড়া সূর্যালোক ছুঁয়ে ছুঁয়ে আমরা এগিয়ে চললাম দিঘির মাঠের দিকে।

এই দিঘির মাঠ হলো দিগন্তহীন এক ধুধু প্রান্তর, এবং রেল স্টেশনের সাথে গ্রামের যোগাযোগের প্রধানতম রাস্তা। বন পেরিয়ে সেই মেঠো পথে যখন পৌঁছলাম, তখন দেখতে পেলাম শীতের দুপুরে সূর্যের আলো দীঘির জলের ওপর এসে পড়ে জল রুপোর মতন চিকচিক করছে। মাঠের এপাশে-ওপাশে কেউ নেই। শুধু আমরা তিন ভাই হেঁটে চলেছি দিঘির পাশে নির্জন মাঠের আলপথ ধরে।

প্রকৃতির অপরূপ শোভা:

শীতের দুপুরে গ্রাম্য প্রকৃতির শোভা যে এত অপরূপ হতে পারে তা কখনো কল্পনাও করতে পারিনি। প্রকৃতি কি অদ্ভুত নগ্ন রূপে ধরা দেয় এই শীতের দুপুরগুলিতে। মনে আছে, নির্জন মাঠ পরিক্রমা করে সেই সুপুরি বনের ভিতর দিয়ে প্রায় দুপুরের অন্তিম লগ্নে গ্রামের বাড়িতে ফিরে আসার পথে দেখতে পেয়েছিলাম কি অদ্ভুত সুন্দর প্রজাপতি। কানে ভেসে এসেছিল কোকিলের কুহুতান, আরো কত নাম-না-জানা পাখির ডাক। বনের গাছে গাছে উঠেছিল কি অপূর্ব সুন্দর সব জংলি ফুল। ভাই বলল, এদের মধ্যে অধিকাংশের নাম তারাও জানেনা। 

শীতের দুপুর এবং গ্রামবাংলা:

শীতের দুপুরের সাথে গ্রাম বাংলার স্বতন্ত্র সংস্কৃতির একটি গভীর এবং নিরবিচ্ছিন্ন সম্পর্ক রয়েছে। শহরের মতো শীতের দুপুরে গ্রামের পরিবেশ ব্যস্ততাময়, কিংবা রুক্ষ-শুস্ক নয়। বরং গ্রামের মানুষ শীতের দুপুরে শীতলতা থেকে মুহূর্তের মুক্তি খুঁজে নেবার আছিলায় মেতে ওঠে পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে সৌহার্দ্য বিনিময়ে। এতে একদিকে যেমন মানুষের মানুষের সামাজিক বন্ধন সুদৃঢ় হয়, তেমনি বিকশিত হয় বাংলার স্বতন্ত্র গ্রাম্য সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতি যেকোনো নতুন মানুষকেই অচিরে আপন করে নেয়, আর শীতের দুপুরে গ্রামের অপরূপ প্রকৃতি তার সবটুকু দিয়ে চির আলিঙ্গন করে রাখতে চায় নবাগত অতিথিকে।

উপসংহার:

আমাদের গ্রামের বাড়ীতে এমনই বেশ কয়েকটি সুন্দর শীতের দুপুর কাটিয়ে আমরা ফিরে এসেছিলাম চিরাচরিত শহুরে জীবনে। মনে আছে, শহরে ফেরার পর এই ব্যস্ত কোলাহলময় শহুরে পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে বেশ অসুবিধা হয়েছিল আমার। শুধুই মনে পড়তো গ্রামের বাড়িতে শীতের দুপুরে উঠোনে বসে কিংবা সুপুরি বনের ভেতর হারিয়ে গিয়ে শুনতে পাওয়া নাম-না-জানা পাখির ডাক, ভাইদের সাথে হই হই কিংবা পাড়ার পিসি মাসিদের স্নেহময় পরশ। আমার খুব ইচ্ছা, এই বছর শীতে আবার আমি ফিরে যাব আমার সেই গ্রামের বাড়িতে। শীতের দুপুরে গ্রাম্য প্রকৃতি ও সংস্কৃতির সাথে নিজেকে মিলিয়ে দেওয়ার মধ্যে যে আত্মিক প্রসন্নতা রয়েছে তা আর অন্য কোথাও নেই।


একটি শীতের দুপুর সম্পর্কে এই ছিল আমাদের আজকের আলোচ্য প্রতিবেদন। আলোচ্য উপরিউক্ত প্রবন্ধটিতে আমরা সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে সবকটি সম্ভাব্য দিককে যথাসম্ভব যথাযথ মাত্রায় আলোচনার চেষ্টা করেছি। তাছাড়া পরীক্ষার প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে আলোচ্য প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট শব্দসীমা বজায় রাখারও চেষ্টা করা হয়েছে। আশাকরি আমাদের এই প্রয়াস আপনাদের ভাল লেগেছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তা যথাযথভাবে আপনাদের সহায়তা করতে পারবে।

উপরিউক্ত প্রতিবেদনটি সম্পর্কে আপনাদের মতামত কমেন্টের মাধ্যমে বিশদে আমাদের জানান। আপনাদের মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চেষ্টা করব আপনাদের মতামত অনুযায়ী আমাদের লেখনীকে আরও উন্নত করে তোলার। তাছাড়া যদি এমনই অন্য কোন রচনা পড়তে চান সে বিষয়েও আমাদের অবগত করুন। আমরা অতি সত্বর সেই রচনাটি আপনার কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করব। ধন্যবাদ।

Print Friendly, PDF & Email

রাকেশ রাউত

রাকেশ রাউৎ বাংলা রচনা ব্লগের নির্বাহী সম্পাদক। ইনি শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী একজন মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার। ইনি বাংলা রচনার সম্পাদকীয় দলকে লিড করেন। রাকেশ দীর্ঘ ৫ বছর যাবৎ বাংলা কনটেন্ট এডিটিং এর সাথে যুক্ত আছেন। ইনি বাংলা রচনা ছাড়াও নামকরণ এবং বাংলা জীবনীর মতো নামকরা সাইটের সম্পাদকীয় দলের একজন অন্যতম সদস্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

সাম্প্রতিক পোস্ট