দেখে নিন ইংরেজিতেও রচনা

একটি বাজারের আত্মকথা রচনা [সঙ্গে PDF]

আমাদের নিত্যদিনের জীবনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ন এক জায়গা হল আমাদের নিকটবর্তী বাজার। ব্যাস্ত বাজারে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের যাওয়া আসা, এদের কেউ ক্রেতা কেউ বিক্রেতা। ক্রেতা হোক বা বিক্রেতা উভয়ের কাছেই বাজারের গুরুত্ব অপরিসীম কিন্তু এই বাজারের কথা ভাবার অবকাশ কারোরই নেই। এমন এক ব্যাস্ত বাজারের গল্প নিয়ে আজকের উপস্থাপন একটি বাজারের আত্মকথা রচনা

একটি বাজারের আত্মকথা রচনা

ভূমিকা:

শহরের মানুষের রোজকার জীবনের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা হল নিকটবর্তী বাজার। আমি কলকাতার অনতিদূরে পানিহাটি নামক একটি শহরতলীর এমনই একটি বাজার, আজ নিজের দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা চয়নের উদ্দেশ্যে এই প্রতিবেদনের উপস্থাপনা করছি।

প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকার শত শত লোক সকাল ও সন্ধেবেলায় আমার কাছে আসে। তাদের মধ্যে কেউ ক্রেতা কেউ বা বিক্রেতা। কেউ আমার পিঠের ওপর দোকান গড়ে তুলে নিজের সংসারের নিমিত্ত অর্থ উপার্জন করে। আবার কেউ সকালে কিংবা বিকেলে সেইসব দোকানদারদের কাছ থেকে নিজের সংসারের জন্য নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনে নিয়ে যায়।

সারাদিন আমার শরীরের ওপর নানা প্রকার বিকিকিনি চলে। আমি নিশ্চল নিশ্চুপ হয়ে চেয়ে থাকে মানুষের মুখের দিকে। কখনো আবার তাদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করি। কিন্তু আমার ভাষা কেউ বুঝতে পারে না। আমি এখানকার মানুষের সংসারের নিত্য দিনের একটি অঙ্গ হয়ে ওঠা সত্ত্বেও কেউ আমায় একবারও ডেকে জিজ্ঞেস করে না আমি কেমন আছি। এই অভিমানেই আজকে আপন জীবন কাহিনীর এই উপস্থাপনা। 

আমার জন্ম কাহিনী:

আমার জন্ম অতি সম্প্রতি কালে নয়। বয়সে আমি বহু প্রাচীন। যদিও জন্ম মুহূর্তে আমি আজকের মতন একটি বাজার ছিলাম না। আমার চারপাশের এলাকায় তখন ছিল মুসলমান মৃৎশিল্পীদের বাস।

তারাই তাদের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর উদ্দেশ্যে এলাকার অনতিদূরে মোল্লা চিরাগ আলী নামে এক ব্যক্তির দান করা জায়গায় নানা নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর একটি ছোট হাট গড়ে তোলে। মোল্লা সাহেবের জমিতে গড়ে ওঠায় লোকমুখে আমার নাম হয় মোল্লারহাট। জন্মের সময় আমার অনতিদূরে ছিল হুগলি নদী যার ধারে মৃৎশিল্পীরা বসবাস করত। আর অন্যপাশে ছিল জঙ্গল।

সেই জঙ্গল পেরিয়ে খানিক দূরে গেলে আরেকটি নদীর পড়তো, তার নাম সোনাই। সেই সোনাই নদীর ধার দিয়ে গড়ে উঠেছিল কিছু গোয়ালাদের বসতি। তাদেরই পদবী অনুসারে সেই এলাকার নাম হয়েছিল ঘোষপাড়া। দুই নদীর দু’পাশ থেকেই দলে দলে মানুষ প্রতিদিনকার নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনাবেচা করতে আমার কাছে উপস্থিত হত। 

আমার ঐতিহ্যময় ইতিহাস:

ছোট একটি হাট থেকে মানুষের আনাগোনা বাড়তে বাড়তে বহরে বৃদ্ধি পেয়ে কবে যে একটি বাজারে পরিণত হয়েছি তা বলতে পারি না। হাট থেকে বাজার হলেও আমার নাম কিন্তু বরাবর সেই একই থেকে গিয়েছে। প্রথম যখন নিজের পরিবর্তিত নতুন রূপকে চিনতে পারলাম তখন আমার কাছে নিত্যদিন অসংখ্য মানুষের আনাগোনা।

এক পাশের জঙ্গল অনেকখানি পাতলা হয়ে এসেছে। চার পাশের এলাকার লোকবসতিও আগের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। সাথে সাথে বৃদ্ধি পেয়েছে আমার জনপ্রিয়তাও। তবে সাধারণ একটি বাজারের মতন আমার ঐতিহাসিক স্মৃতি সামান্য নয়। আমি আমার পাশের রাস্তা দিয়ে সার বেঁধে বসে দেখেছি চাষীদের নীল বিকিকিনির উদ্দেশ্যে। সেই থেকে ওই রাস্তার নাম হয়েছে নীলগঞ্জ।

আমি সেই নিরীহ চাষীদের উপর দেখেছি নীলকর সাহেবদের অত্যাচার। এমনকি দেশভাগের সময় আমি দেখেছি চিরকাল বন্ধুভাবাপন্ন মানুষের ধর্ম নিয়ে দাঙ্গা, হানাহানি ও রক্তপাত। ইতিহাসের এই সকল পরিহাস দেখেও নিশ্চুপ হয়ে স্মৃতিতে বয়ে নিয়ে চলেছি সুবিশাল এক অভিজ্ঞতার ভান্ডারের ভার।

একটি স্মরণীয় ঘটনা:

একদিনের কথা মনে আছে যেদিন হঠাৎ বিকেলের দিকে কি করে জানিনা আমার সর্বাঙ্গে আগুন লেগে গেল। চারপাশে দোকানগুলি থেকে আকাশে দেখা যেতে থাকলেও অগ্নির লেলিহান শিখা। বহু মানুষ অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেল। কেউ বাঁচার উদ্দেশ্যে পালাতে গিয়ে পদদলিত হয়ে মারা গেল। আর আমার সর্বাঙ্গে তখন অসহ্য দহন জ্বালা।

চারপাশের মুমূর্ষু অসহায় মানুষের দৃশ্য দেখে আমি তখন গুমরে মরছি। এক সময় দমকল বাহিনী এসে বড় বড় পাইপ থেকে জল ছিটিয়ে আমার শরীরে জ্বলতে থাকা আগুন নেভালো। যদিও সেই দহনের ফলে তৈরি হওয়া ক্ষতগুলো শুকোতে অনেকদিন সময় লেগেছিল। 

বর্তমানে আমি:

বর্তমানে আমি বহরের বৃদ্ধি পেতে পেতে পুরোদস্তুর শহুরে একটি বাজার। আমার চারপাশের দৃশ্যপটও সম্পূর্ণরূপে বদলে গিয়েছে। দুপাশের রাস্তা দিয়ে ঘন ঘন গুরুগম্ভীর আওয়াজ করে চলে যায় মোটরগাড়ি। অতীতের অনতিদূরে অবস্থিত হুগলি নদীকেও আজ বড় দূর মনে হয়। আরেক পাশে সেই সোনাই নদী এখন অবলুপ্ত। শুধু মাঝেমধ্যে তার অবশিষ্টাংশ রূপে কিছু খাল চোখে পড়ে।

সেই জঙ্গল আজ আর বেঁচে নেই। তার জায়গা নিয়েছে অসংখ্য মানুষের অগণিত বসতি। সেই অতীতের মুসলমান মৃৎশিল্পীর দল আজ আর নেই। দেশভাগের সময় তারা এদেশ ছেড়ে, আমায় ছেড়ে চলে গিয়েছে। ওদিককার ঘোষ গোয়ালাদেরও এখন আর দেখতে পাই না। প্রতিদিনকার আসা মুখগুলির দিকে চেয়ে চেয়ে দেখি সব নতুন মুখ। বুঝতে পারি সময়ের মুখে অনেকখানি পথ পেরিয়ে এসেছি; বয়স হচ্ছে আমারও। 

উপসংহার:

আমি ব্যস্ত শহরতলীর সদাব্যস্ত একটি বাজার। নিজের জীবনকথা নিয়ে কাব্য করবার অবকাশ আমার নেই।  কিন্তু কেউ যখন আমার কথা স্মরণ করে না, তখন আত্মবিস্মরণের আশঙ্কা থেকেই নিজেকে নিজের জীবনের কাহিনী স্মরণ করতে হয়। তা না হলে মানুষের স্মৃতির অতলে হারিয়ে যেতে যেতে কোন দিন আমিই যে আত্মবিস্মৃতির অন্ধকারে ডুবে যাব সেটাও হয়তো মোল্লার হাট থেকে ‘মোল্লারহাট’ বাজার হয়ে ওঠার মতোন বুঝতে পারব না।


একটি বাজারের আত্মকথা রচনাটি পড়ে আপনার কেমন লাগলো কমেন্টের মাধ্যমে আমাদের জানান। আমরা সব সময় সচেষ্ট থাকি সবার থেকে সুন্দর ও আপনার মনের মতো করে একটি রচনা তুলে ধরার। এখানে নেই এমন রচনা পাওয়ার জন্য রচনাটির নাম আমাদের কমেন্ট করে জানান। দ্রুততার সঙ্গে আমরা উক্ত রচনাটি যুক্ত করার চেষ্টা করবো। সম্পূর্ণ রচনাটি পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

Print Friendly, PDF & Email

রাকেশ রাউত

রাকেশ রাউৎ বাংলা রচনা ব্লগের নির্বাহী সম্পাদক। ইনি শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী একজন মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার। ইনি বাংলা রচনার সম্পাদকীয় দলকে লিড করেন। রাকেশ দীর্ঘ ৫ বছর যাবৎ বাংলা কনটেন্ট এডিটিং এর সাথে যুক্ত আছেন। ইনি বাংলা রচনা ছাড়াও নামকরণ এবং বাংলা জীবনীর মতো নামকরা সাইটের সম্পাদকীয় দলের একজন অন্যতম সদস্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট