একটি বনভোজনের অভিজ্ঞতা | একটি চড়ুইভাতির অভিজ্ঞতা রচনা [PDF]

লিখেছেন: Rakesh Routh

শীতের মরশুমে পরিবার বা বন্ধুদের সাথে বনভোজনের যাওয়ার মজাই আলাদা।নিত্য দিনের কাজ পড়াশোনা সব ভুলে বন্ধু বান্ধব , আত্মীয় স্বজনদের সাথে আনন্দে মেতে ওঠার আর এক নাম বনভোজন বা চড়ুইভাতি।আজকের রচনার বিষয় একটি বনভোজনের অভিজ্ঞতা বা একটি চড়ুইভাতির অভিজ্ঞতা।

একটি বনভোজনের অভিজ্ঞতা রচনা বৈশিষ্ট্য চিত্র

ভূমিকা:

মানুষ চিরকালই সীমাবদ্ধ গণ্ডি পেরিয়ে অজানাকে জানতে অচেনাকে চিনতে আগ্ৰহী। মানুষ অসীম আগ্রহ নিয়ে নৈসর্গিক দৃশ্য অবলোকনের জন্য এক দেশ থেকে অন্য দেশে ছুটে যায়। বনভোজন শারীরিক, মানসিক এবং শিক্ষনীয় ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে।

বনভোজন বলতে আনন্দ-উৎসবের সাথে বনে কিংবা বাড়ীর বাইরে একসাথে অনেক জন মিলে খাবার ভোজন করাকে বোঝায়। সাধারণতঃ মনোরম ও সুন্দরতম স্থানকেই বনভোজনের জন্য নির্বাচিত করা হয়।

তন্মধ্যে পার্ক বা উদ্যান, হ্রদ কিংবা নদীর কিনারের মতো চিত্তাকর্ষক স্থানকেই বনভোজনের স্থান হিসাবে প্রাধান্য দেওয়া হয়। বনভোজন শব্দটা সম্ভবত রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি। তাঁর চিঠিপত্রে আগে পিকনিক শব্দটা দেখতে পাওয়া যেত।

১৯১১ সালে প্রকাশিত নাটক, অচলায়তন-এ হঠাৎ এল নতুন শব্দ বনভোজন। বঙ্গীয় শব্দকোষ–এ শব্দটির অর্থ পাওয়া গেল বনে রন্ধনপূর্বক ভোজন। পরে প্রকাশিত অন্যান্য অভিধানে বিস্তৃত অর্থ দেওয়া হলো - সংঘবদ্ধভাবে বনে বা রম্যস্থানে গিয়ে রন্ধন ও প্রীতিভোজন।

প্রস্তুতি ও যাত্রা:

শীতের মরসুম হল বনভোজনে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সময়। ২৫ শে ডিসেম্বর থেকে ১লা জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় সমস্ত স্কুল-কলেজ গুলিতে ছুটি থাকে। ৩১ শে ডিসেম্বর আমরা আয়োজন করেছিলাম একটি বনভোজনের।

বনভোজনের জন্য স্থান নির্ধারণ করি নদীয়া বেথুয়া ফরেস্ট। ঠিক করা হয় খাবারের মেনু। জলখাবারে মেনু হল লুচি আর আলুরদম। দুপুরের মেনুতে রাখা হয় চিকেন কোরমা, ফ্রাইড রাইস এবং মিষ্টি। আমরা মোট দশজন বন্ধু মিলে এই বনভোজনে অংশগ্রহণ করেছিলাম।

দশজন  মিলে ২০০ টাকা করে চাঁদা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বেথুয়াতে যাবার জন্য গাড়ি ভাড়া করা হয়। বনভোজনে যাওয়ার জন্য সবাই খুব উৎসাহী ছিল, তাই আয়োজন করতে একটুও কষ্ট পেতে হয়নি।

যাত্রাপথের আনন্দ:

 অবশেষে এল বনভোজনের নির্ধারিত দিন। আমরা সকাল বেলায় উঠে চা-বিস্কুট খেয়ে স্নান করে তৈরি হলাম। আমাদের বাড়িতেই সমস্ত বন্ধুরা এল। বনভোজনের রান্নার জন্য গ্যাস, গ্যাসের সিলিন্ডার, হাঁড়ি কড়াই, মাংস, মাংসের মশলা আমরা বাড়ি থেকেই সব বেটে নিয়ে ছিলাম।

এছাড়াও প্রয়োজনীয় সমস্ত জিনিস আমরা গাড়ির মধ্যে তুলে নিলাম। গাড়ি করে রাজকারের খেয়াঘাটে পৌঁছলাম। সেখান থেকে আমরা একটা নৌকাতে, আর গাড়ীটা অন‌্য একটা নৌকাতে করে গঙ্গা পার হয়ে পৌঁছালাম পাটুলী ঘাটে। পাটুলী ঘাটে নেমে, সেখান থেকে গাড়িতে চড়ে যাত্রা শুরু করলাম বেথুয়া ফরেস্টের উদ্দেশ্যে।

গাড়ির  মধ্যে গান বাজতে শুরু করলো 'লাল নীল সবুজের মেলা বসেছে'। গান শুনতে শুনতে সবাই চিপস্ খেলাম। দুপাশে সবুজ গাছ, ঘর বাড়িকে পিছনে ফেলে  পিচের রাস্তার উপর দিয়ে আমাদের গাড়ি ক্রমশ ছুটে চলেছে বনভোজনের স্থানের দিকে। অবশেষে আমরা নির্ধারিত স্থানে পৌঁছলাম।

বনভোজনের নতুন জায়গা দেখার অভিজ্ঞতা:

বেথুয়া ফরেস্টে যখন আমাদের গাড়িটি পৌঁছলো সময় তখন বেলা দশটা। বেথুয়া অরণ্যের প্রবেশ দ্বারের বাম দিকে টিকিট ঘর। মাথা পিছু ৫০ টাকা করে টিকিট। টিকিট কেটে আমরা হৈ হৈ করে ছুটে চললাম অরণ্যের সৌন্দর্য উপভোগ করতে।

যারা শান্ত নির্জনতা পছন্দ করেন তাদের জন্য এমন একটি যায়গা যথার্থ। আপনার সঙ্গী বা সঙ্গিনীর হাত ধরে গুটি গুটি হেঁটে যাওয়া, পাতার ফাঁকে উকি দেওয়া পাখির আওয়াজ, আর বুক ভরা স্নিগ্ধ বাতাসে কাটানো প্রত্যেকটা মুহূর্ত আপনার অনুভূতিকে করে দেবে অসামান্য।

সকালে স্নিগ্ধতা ও সন্ধ্যার পরে এই জায়গাটি কালো রঙের অন্ধকারের সাথে খুব রোমাঞ্চকর হয়ে ওঠে। আমরা এই অভয়ারণ্যে, ময়ূর, বিভিন্ন ধরণের পাখি, নীলগাই, ঘড়িয়াল ইত্যাদি দেখলাম। হরিণ দেখার ভীষণ ইচ্ছে থাকলেও তা পূরণ হলনা শেষ পর্যন্ত।

রন্ধন, ভোজন ও আনন্দ ইত্যাদি:

অরণ্যে ঢোকার পর সেখানে আমাদের পছন্দ মত একটি জায়গা খুঁজে নিলাম যেখানে আমরা সবাই মিলে বসে রান্না করতে পারি। জল খাবারের জন্য লুচি এবং আলুর দম আমরা দোকান থেকে কিনে নিয়ে গেছিলাম।

সবাই যে যার জল খাবারের প্যাকেট নিয়ে খাওয়া শেষ করলাম। তারপর আমরা শুরু করলাম চিকেন কোরমা রান্না করা। আর একটা গ্যাসে ফ্রাইড রাইসের জন্য ভাত বসিয়ে দিলাম। চিকেন কোরমা এবং ফ্রাইড রাইস রান্না করা শেষ হয়ে যাবার পর খেতে বসার আয়োজন শুরু করলাম।

খেতে বসার জন্য সতরঞ্চি নিয়ে গেছিলাম। খাবার প্লেটগুলো রাখা হলো খবরের কাগজের উপর। আমি পম্পা এবং সুস্মিতা সবাইকে খাবার পরিবেশন করলাম। নিজেরাও খাবার নিয়ে সবার সাথে বসে মধ্যাহ্ন ভোজন শুরু করলাম।

খাবার শেষ করার পর আবার পুরো ফরেস্ট ঘুরে দেখলাম। কেউ কেউ এনেছিল সাথে ক্যামেরা, এই মুহুর্তগুলোকে ক্যামেরাবন্দি করার জন্য। তারপর বসল গানের আসর। গান যেমনই হোক না কেন সেখানে ছিল প্রচুর আনন্দ। কেউ নাচে মেতে উঠল আবার কেউ বলল রসালো গল্প। 

উপসংহার:

 বনভোজনের জন্য আনন্দ সাগরে ডুবে ছিলাম সবাই প্রতিটা মুহূর্ত। বনভোজনের মধ্য দিয়ে পুরো দিনটাই হইহই করে কেটে গেল। কখন যে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হয়ে গেল বুঝতেই পারলাম না। ইচ্ছে না করলেও বাড়ি ফিরতে হবে এবার। সব জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে আবার গাড়িতে উঠে বসলাম। পাড়ি দিলাম বাড়ির উদ্দেশ্যে। এই ভাবেই কেটে গেল আমাদের আনন্দমুখর বনভোজনের মুহূর্ত। 


একটি বনভোজনের অভিজ্ঞতা বা একটি চড়ুইভাতির অভিজ্ঞতা প্রবন্ধ রচনাটি পড়ে আপনার কেমন লাগলো কমেন্ট করে জানাবেন।আপনার একটি কমেন্ট আমাদের অনেক উৎসাহিত করে আরও ভালো ভালো লেখা আপনাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ায় জন্য।বানান ভুল থাকলে কমেন্ট করে জানিয়ে ঠিক করে দেওয়ার সুযোগ করে দিন।সম্পূর্ণ রচনাটি পড়ার জন্য আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

Print Friendly, PDF & Email
লেখক পরিচিতি
Rakesh Routh
রাকেশ রাউৎ বাংলা রচনা ব্লগের নির্বাহী সম্পাদক। ইনি শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী একজন মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার। ইনি বাংলা রচনার সম্পাদকীয় দলকে লিড করেন। রাকেশ দীর্ঘ ৫ বছর যাবৎ বাংলা কনটেন্ট এডিটিং এর সাথে যুক্ত আছেন। ইনি বাংলা রচনা ছাড়াও নামকরণ এবং বাংলা জীবনীর মতো নামকরা সাইটের সম্পাদকীয় দলের একজন অন্যতম সদস্য।

পরবর্তী পড়ুন

আমার প্রিয় শিক্ষক রচনা [সঙ্গে PDF]

আমাদের প্রত্যেকের বিদ্যালয়ে অনেক শিক্ষক থাকেন, তাঁরা প্রত্যেকেই আমাদের শিক্ষাদানের মধ্য দিয়ে জীবনের সঠিক পথ প্রদর্শনে সহয়তা করেন। তাঁরা প্রত্যেকেই […]

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রচনা [সঙ্গে PDF]

বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে দেশের সমস্ত মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে যিনি অন্যতম ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনি আর কেউ নন,বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু […]

উন্নয়ন বনাম পরিবেশ রচনা [সঙ্গে PDF]

মানুষ যেদিন প্রথম পাথরে পাথর ঘষে আগুন জ্বালাতে শিখেছিল সেদিন থেকেই শুরু হয়েছিল এক পরিবেশ বনাম উন্নয়ন নামের এক মহাযুদ্ধ। […]

ছাত্র সমাজ ও রাজনীতি বা ছাত্রজীবনে রাজনীতি রচনা [সঙ্গে PDF]

ছাত্ররাজনীতি আসলে ভালো নাকি মন্দ তা নিয়ে বিতর্কের অন্ত নেই। ইতিহাস খুঁজলে দেখা যাবে বিগত এক শতাব্দী ধরে রাজনীতির নামে […]

বাংলার সংস্কৃতি রচনা [সঙ্গে PDF]

সভ্যতা ও সংস্কৃতি, আমাদের জীবনের এই দুটি অংশ পরস্পরের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে রয়েছে যে তা বিশ্লেষণ করা যায় না।সভ্যতার ক্রমবিকাশের […]

ভারতের স্বাধীনতা দিবস রচনা [সঙ্গে PDF]

ভারতমাতার বহু বীর সন্তান অনেক রক্তের বিনিময়ে দীর্ঘ সংগ্রামের পর স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন আমাদের। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ ই আগস্ট ইংরেজ […]

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Proudly Owned and Operated by Let Us Help You Grow Online ©️