দেখে নিন ইংরেজিতেও রচনা

একটি পাহাড় ভ্রমণের অভিজ্ঞতা রচনা [সঙ্গে PDF]

বাঙালি হলো ভ্রমণপিপাসু জাতি। আর সকল ভ্রমণপিপাসু বাঙালির কাছে পাহাড় অত্যন্ত প্রিয় এক গন্তব্য। পশ্চিমবঙ্গের উত্তরে উত্তরবঙ্গ নামে সুপরিচিত অংশের অপরিচিত কিছু স্থানে ভ্রমণ নিয়ে এই প্রতিবেদন একটি পাহাড় ভ্রমণের অভিজ্ঞতা রচনার উপস্থাপনা।

একটি পাহাড় ভ্রমণের অভিজ্ঞতা রচনা বৈশিষ্ট্য চিত্র

ভূমিকা:

রোজকার একঘেয়ে জীবন থেকে কিছুদিন বিরতি নেবার প্রয়োজনে আমরা মাঝেমধ্যেই ছুটে গিয়ে থাকি বিভিন্ন ভ্রমণ গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। জীবনে সকল ব্যস্ততার ফাঁকে সময় করে কিছুদিন বেরিয়ে আসলে চিত্তের সার্থক পুষ্টি লাভ হয়। তাই প্রাচীনকাল থেকেই ভ্রমণ হলো মানুষের জীবনের সর্বোত্তম চিত্তবিনোদনের উপাদান।

বাঙালি স্বভাবতই ভ্রমণপিপাসু জাতি। আমিও তার ব্যাতিক্রম নই। ভ্রমণের জন্য বহু জায়গায় ঘুরে বেড়ালেও আমার সবথেকে পছন্দের গন্তব্য হলো পাহাড়। সেই ছেলেবেলা থেকেই পাহাড় আমায় ভীষণভাবে আকর্ষণ করে। তেমনি এক অমোঘ আকর্ষণ এড়াতে না পেরে অতিসম্প্রতি আমি পাহাড় ভ্রমণের উদ্দেশ্যে ছুটে গিয়েছিলাম। আমার ভ্রমনের সেই মধুর অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করার উদ্দেশ্যেই এই প্রতিবেদনের উপস্থাপনা।

জীবনে ভ্রমণের তাৎপর্য:

আমার পাহাড় ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে আলোচনার পূর্বে আমাদের সকলের জীবনে ভ্রমণের গুরুত্ব বা তাৎপর্য সম্পর্কে কিছু কথা বলা প্রয়োজন। আমাদের জীবনে ভ্রমণের তাৎপর্য বলে শেষ করার মতন নয়।

ভ্রমণ আমাদের শরীর তথা মন উভয়কে বিশেষভাবে প্রভাবিত করতে সক্ষম। ভ্রমনের ফলে একদিকে আমাদের মন যেমন জীবনের ক্লান্তি ও গ্লানি দূর করে সতেজ হয়ে উঠে, অন্যদিকে আমাদের শরীরও সকল জড়তা কাটিয়ে সতেজতায় পূর্ণ হয়ে ওঠে।

এমনকি বিভিন্ন রোগ মুক্তির ক্ষেত্রেও ভ্রমণের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। সে কারণেই প্রাচীন যুগ থেকে এখনো পর্যন্ত চিকিৎসকেরা বহু রোগ থেকে সেরে ওঠে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার পূর্বে ভ্রমণের পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

তাছাড়া ভ্রমণ মানুষকে চিন্তাশীল হতে শেখায়। শেখায় জীবনের প্রতিকূল অবস্থার সাথে যুঝে নিতে। প্রাচীনকালে রাজারা রাজ্য চালনার ক্ষেত্রে কোন বিশেষ প্রতিকূল অবস্থার সম্মুখীন হলে মৃগয়ায় যেতেন। এই মৃগয়াতে শিকার অপেক্ষা ভ্রমণের গুরুত্বই বেশি থাকত।

যাত্রা পরিকল্পনা:

আমি প্রতি বছরই বিশেষ করে শীতকালের দিকে কাছে কিংবা দূরে কোথাও না কোথাও ভ্রমণে যাই। এই ভ্রমণ আমার একঘেয়ে জীবনের চিরাচরিত স্বাদবদলে সাহায্য করে। এই ভ্রমণের উদ্দেশ্যে আমি কখনো লখনৌ কিংবা আগ্রা, কখনো দক্ষিণ ভারত, আবার কখনো কাশ্মীর; বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থানে ছুটে গিয়েছি।

তবে এইবার অনিবার্য কারণবশত হাতে ছুটির দিন ছিল তুলনামূলকভাবে একটু কম। সে কারণে বাধ্য হয়ে বাড়ির কাছাকাছি কোথাও যাওয়ার পরিকল্পনা করতে হলো। বাড়ির কাছাকাছি পাহাড় বলতে বাঙালি সর্বপ্রথম যে নামটি মাথায় আসে তা নিঃসন্দেহে দার্জিলিং।

তবে আমি ইতিপূর্বে দার্জিলিং গিয়েছি বেশ কয়েকবার। সে কারণে এই বার ঠিক করলাম উত্তরবঙ্গেই অন্য কোথাও যাব। তবে কোথায় যাব তা ঠিক করে উঠতে পারলাম না। সে কারণে পরিবার থেকে ঠিক করা হলো নিউ জলপাইগুড়ি অব্দি পৌঁছে যেখানে ইচ্ছা হবে, সেই দিকে চলে যাব।

যাত্রাপথ ও গন্তব্য:

পাহাড় ভ্রমণের উদ্দেশ্যে আমাদের যাত্রা শুরু হলো শিয়ালদহ স্টেশন থেকে রাত আটটার উত্তরকন্যা এক্সপ্রেস চড়ে। রাতের ট্রেনের যাত্রা আমার বরাবরই প্রিয়। আর পরের দিন সকাল যখন হলো তখন বুঝতে পারলাম উত্তরবঙ্গ পৌঁছে গেছি, শীত বেশ জাঁকিয়ে বসেছে এই দিকটায়। গায়ে গরম জামা চাপিয়ে নিতে নিতে নিউ জলপাইগুড়ি এসে থামল আমাদের ট্রেন।

সেখান থেকে গাড়ির সঙ্গে দর কষাকষি করে আমরা আমাদের প্রথম গন্তব্য হিসেবে কালিম্পং এর দিকে রওনা দিলাম। দার্জিলিং বেশ কয়েকবার যাওয়া হলেও, দার্জিলিংয়ের অনতিদূরে এই জায়গাটিতে ইতিপূর্বে কখনো যাইনি।

আমাদের গাড়ি জলপাইগুড়ি শহর ছাড়িয়ে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা ধরে কালিম্পং-এর দিকে রওনা হলো। জলপাইগুড়ি থেকে কালিম্পং পৌঁছাতে সময় লাগলো ঘণ্টা তিনেক। এরমধ্যে আমি খানিকক্ষণ গাড়িতে ঘুমিয়ে নিলাম। চোখ যখন খুলল, তখন কালিম্পং পৌঁছে গেছি। 

ছোট্ট শহর কালিম্পং:

পাহাড়ের রানী দার্জিলিং শহর থেকে বেশ কিছুটা নিচে অবস্থিত ছোট্ট শহর কালিংপং। দার্জিলিং-এর মতন অতখানি গোছানো নয়, কিন্তু খুব ঘরোয়া একটা ছাপ রয়েছে। পাহাড়ের গায়ে ধাপ কেটে কেটে বেশ কয়েকটি স্তরে তৈরি হয়েছে এই শহর। পাহাড়ের নিয়মমাফিক আঁকাবাঁকা ঘরবাড়ি।

সেই ঘরবাড়ি পেরিয়ে কখনো পাহাড়ের গায়ে কাটা ধাপ বেয়ে, খাড়াই হারাই পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে উঠে একটা হোটেল ঠিক করে সেখানে ব্যাগপত্র রেখে একটু মুখ হাত ধুয়ে আমি, বাবা আর বোন শহরটাকে ইতস্ততঃ ঘুরে দেখবার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। মা রইল হোটেলের ঘরে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য।

এই শহরটাকে যতই দেখছিলাম ততই মনটা অদ্ভুত এক আনন্দে ভরে উঠছিলো। কোন ঝাঁ-চকচকে দোকান নেই, ভ্রমণ পিপাসু মানুষদের তেমন ভিড়ভাট্টা নেই; শুধুই পাহাড়ি লোকেদের সাধারণ জীবনযাত্রা মন্থর গতিতে এগিয়ে চলেছে।  

মেঘের উপরে লাভার বৌদ্ধমঠ:

ভ্রমণের প্রথম দিনটা কালিম্পং-এ কাটিয়ে একটা গাড়ি ভাড়া করে আমরা রওনা হলাম পরবর্তী গন্তব্য লাভার উদ্দেশ্যে। লাভা হল কালিম্পং থেকে বেশ খানিকটা উপরে পাহাড়ের গায়ে ছোট্ট একটি গ্রাম। লাভা যাওয়ার পথে গাড়ি থেকে নেমে দেখে নিলাম কালিম্পং মিউজিয়াম, ডেলোর বাংলো, আর খেয়ে নিলাম মোমো। তারপর আবার গাড়ি করে যখন লাভা পৌঁছলাম তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেছে।

এইখানে অনলাইনের মাধ্যমে আগে থেকে বুক করা হোটেলে ব্যাগপত্র রেখে পাহাড়ের মেঘমুক্ত আকাশের গায়ে অপরূপ সুন্দর সূর্যাস্ত দেখার জন্য আমরা হোটেলের ছাদে উঠে এলাম। সেদিন রাতটা হোটেলে কাটিয়ে পরের দিন সকাল হতে না হতেই দেখতে গেলাম লাভার বিখ্যাত বৌদ্ধ মঠ।

পাহাড়ের পাথরের সিঁড়ি আর খাড়াই রাস্তা বেয়ে বেশ খানিকটা উপরে উঠলে তবে এই মঠে পৌঁছানো যায়। কি অপরূপ সুন্দর সেই মঠের উপর থেকে নিচের দৃশ্য। যেদিকে তাকাই পাহাড়ি গাছ মেঘের উপরে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর সমগ্র মঠটিকে ঘিরে রেখেছে পেঁজা তুলোর মতো মেঘ। যেন মেঘের সাম্রাজ্যেই সিংহাসনের মতন এই মঠের অবস্থান।

লোলেগাঁও বেড়ানোর অভিজ্ঞতা:

সেদিন লাভার বুদ্ধমঠ থেকে বেরিয়ে গাড়ি করে আমরা গিয়েছিলাম আর একটি ছোট্ট গ্রাম লোলেগাঁও-এ। এই গ্রামটি তুলনামূলকভাবে লাভার থেকেও অনুন্নত। রাস্তাঘাট তখনো ঠিক করে তৈরি হয়নি। এমনি রাস্তা দিয়ে একটি জঙ্গলের বাইরে আমাদের গাড়ি থামলো। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে জঙ্গলের ভিতরে প্রবেশ করে আমরা পৌছে গেলাম নামের বিখ্যাত ঝুলন্ত সেতুর কাছে।

সত্যি বলতে সেই ঝুলন্ত সেতুর থেকেও ওই জঙ্গলের মনমুগ্ধকর পরিবেশ আমার অনেক বেশি ভালো লেগেছিল। চারিদিক থেকে নাম-না-জানা বিভিন্ন পাখির ডাক, গাছের ফাঁক দিয়ে আলো-আঁধারি প্রকৃতির দৃশ্য আমার চিরকাল মনে থেকে যাবে।

নেওড়া ভ্যালি জাতীয় অরণ্যে একটি রাত:

সেদিনও দেখাও থেকে মন ভরা স্মৃতি নিয়ে লাভা ফিরে হোটেলে রাতটা কাটিয়ে দিলাম। আমাদের পরদিনের গন্তব্য নেওড়া ভ্যালি জাতীয় অরণ্য। পরদিন সকাল সকাল উঠে গাড়ি করে নেওড়া ভ্যালি জাতীয় অরণ্য পৌঁছে একটি ছোট্ট সুন্দর হোমস্টেতে ব্যাগপত্র রেখে আমরা বেরিয়ে পড়লাম জাতীয় অরণ্য ঘুরে দেখার উদ্দেশ্যে।

এখনকার বিখ্যাত জীব হলো রেড পান্ডা। এই রেড পান্ডা আমি ইতিপূর্বেও দার্জিলিংয়ের চিড়িয়াখানায় দেখেছি। আকারে ছোট, খয়রি কিংবা লাল রঙের গাত্রবর্ণ বিশিষ্ট এই প্রাণীগুলি খুব সুন্দর দেখতে। ইতিপূর্বে খাঁচার মধ্যে এদের দেখলেও প্রকৃতির বুকে এদের মুক্ত বিচরণ দেখে মনটা বড় ভালো লাগলো। এছাড়া গোটা অরণ্য জুড়ে চোখে পড়ল নানা গাছগাছালির সমারোহ, আর কানে এলো নাম-না-জানা অসংখ্য পাখির ডাক।

সেইদিন রাতটা আমাদের কেটেছিল নেওড়া ভ্যালি জাতীয় অরন্যের একেবারে ভেতরের দিকে একটা ছোট্ট হোমস্টেতে। কি অদ্ভুত সেই রাতের অভিজ্ঞতা; অরণ্য থেকে ডাক দিচ্ছে নাম-না-জানা রাতচরা পাখি, জানালার একটুখানি ফাঁক দিয়ে ঠান্ডা হাওয়া এসে ঢুকছে ঘরের মধ্যে; এ যেন এক অপূর্ব অ্যাডভেঞ্চার।

উপসংহার:

ভ্রমণ হলো বাঙালি জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সেই ভ্রমণের গন্তব্য যদি হয় পাহাড় আর অরন্য একইসাথে, তাহলে সেই ভ্রমণে এক অনন্য মাত্রা যোগ হয়। আমি ইতিপূর্বে কোনদিন এইভাবে একসাথে পাহাড় আর অরণ্যকে অনুভব করিনি। সে কারণে আমার কাছে এইবারের ভ্রমণের অভিজ্ঞতা চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

আমি ঠিক করেছি এবার থেকে মাঝেমধ্যেই ছুটিতে বাবা-মায়ের সঙ্গে এমনই অ্যাডভেঞ্চার পূর্ণ কোন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাবো। হিমালয়ের আর অরন্যের অমোঘ আকর্ষণে বারবার ছুটে যাব কোন না কোন নাম না জানা পাহাড়ি শহর কিংবা গ্রামের উদ্দেশ্যে।


আমরা চেষ্টা করেছি যথাসম্ভব বিশ্লেষণাত্মক ভঙ্গিতে উপরিউক্ত প্রতিবেদনটির উপস্থাপনা করতে। একটি পাহাড় ভ্রমণের অভিজ্ঞতা রচনাটি পড়ে আপনার কেমন লাগলো তা কমেন্টের মাধ্যমে অতি অবশ্যই আমাদের জানান। আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। যদি এমনই অন্য কোন রচনা পড়তে চান সে বিষয়েও আমাদের অবগত করুন। আমরা অতি সত্বর সেই রচনাটি আপনার কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করব।

Print Friendly, PDF & Email

রাকেশ রাউত

রাকেশ রাউৎ বাংলা রচনা ব্লগের নির্বাহী সম্পাদক। ইনি শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী একজন মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার। ইনি বাংলা রচনার সম্পাদকীয় দলকে লিড করেন। রাকেশ দীর্ঘ ৫ বছর যাবৎ বাংলা কনটেন্ট এডিটিং এর সাথে যুক্ত আছেন। ইনি বাংলা রচনা ছাড়াও নামকরণ এবং বাংলা জীবনীর মতো নামকরা সাইটের সম্পাদকীয় দলের একজন অন্যতম সদস্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট