দেখে নিন ইংরেজিতেও রচনা

একটি টাকার আত্মকথা রচনা [সঙ্গে PDF]

টাকা হল বর্তমান যুগে মানুষের জীবনধারণের অন্যতম প্রধান অবলম্বন। টাকা ছাড়া একজন মানুষের জীবন অচল তথা মূল্যহীন। কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি মানুষের জীবনে অতি প্রয়োজনীয় এই টাকা যদি নিজের মনের ভাব প্রকাশে সক্ষম হতো, তাহলে তার মুখ দিয়ে উচ্চারিত হতো কোন বাক্যবন্ধ! কোন মহিমায় প্রকাশিত হতো তার জীবনের ভাব! আজকের প্রবন্ধ তেমনি একটি টাকাকে কল্পনার জীবন দান করে তার জীবনপটে আলোকপাতের সংক্ষিপ্ত প্রচেষ্টা করবো আমরা।

একটি টাকার আত্মকথা রচনা বৈশিষ্ট্য চিত্র

ভূমিকা:

এই পৃথিবীতে সব কিছুর জন্ম হয় জীবনের কোনো না কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে। উদ্দেশ্যের লক্ষ্য পূরণ সম্পূর্ণ হলে জীবনের প্রাসঙ্গিকতা আর ঠিক কতখানি থাকে, তা নিয়ে বিতর্ক থেকেই যায়। সৃষ্টির এই মহাযজ্ঞে কোন কিছুই স্থায়ী নয়। আজ যা প্রাসঙ্গিক, কাল সেটাই অপ্রাসঙ্গিক; আজ যা অতি প্রয়োজনীয়, কালকে তাইই মূল্যহীন। স্বাভাবিকভাবেই আজ সকলের কাছে যার সমাদর, দুদিন বাদেই সে চরম অনাদৃত, অবহেলিত। এক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো উদাহরণটি দেওয়া যায় সম্ভবত আমাদের নিজেদের কথা উল্লেখ করেই।

প্রসঙ্গত বলি, আমি হলাম কালের নিয়মে সমাজের কাছে প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলা, মূল্যহীন, প্রায় অচল এক টাকার একটি নোট। এক্ষেত্রে মনে হতেই পারে, আমার মতন একটি জড়বস্তুর হয়তো এমন করে কথা বলার অধিকার নেই; কিন্তু আমার এই দীর্ঘ জীবনে সমাদর, অনাদর, অবহেলা ইত্যাদি যে বিপুল অভিজ্ঞতা আমি সঞ্চয় করেছি, আজ তাইই আমার হয়ে আমার জীবন বৃত্তান্ত রচনা করতে চলেছে।

আমার জন্ম বৃত্তান্ত:

জন্ম আমার আজ থেকে বহু বছর আগে। বর্তমান পৃথিবীতে সৃষ্টির যারা অংশীদার, তাদের অধিকাংশই সেই সময় পৃথিবীর আলো দেখেনি। আমাদের জাতির সকলের মত আমার জন্ম একটি টাকশালের ছাপাখানায়। সেখানে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে, অন্ধকার রহস্যে ঘেরা মুদ্রণ যন্ত্রের অন্তরালে আমি প্রথম পৃথিবীর গন্ধ পেয়েছিলাম। আমায় নিয়ে আমার জন্ম মুহুর্তেই কত ছেঁড়াখোঁড়া হয়েছিল, এখনো মনে আছে।

প্রসঙ্গত বলি, আমাদের জন্ম মুহূর্তে আমরা টাকারা সবাই একসাথে পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে লেগে থাকি। সারি বেঁধে একটি বড় কাগজের পাতাতেই আমাদের সকলের জন্ম হয়। জন্মের অব্যবহিত পরবর্তী মুহূর্তে ধারালো যন্ত্রের আঘাতে নির্দিষ্ট মাপ অনুযায়ী পরস্পর পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন করে আমাদের জন্মকে সার্থক রূপ দেবার চেষ্টা করা হয়। তারপর আরো বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আমরা সেই আঁতুড়ঘরের বাইরে এসে প্রথম পৃথিবীর আলো দেখতে পাই।

অতীতকালের কথা:

যে বছর আমার জন্ম তার পরের বছরেই আমার দেশ তার প্রতিবেশীর সাথে জড়িয়ে পড়েছিল যুদ্ধে। আমার জন্ম ১৯৭০ সালে, অর্থাৎ একাত্তরের ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের ঠিক এক বছর আগে। নিজের জন্মের এই সাল এত নির্ভুলভাবে মনে থাকার কারণ হলো আমার শরীরে মুদ্রিত জন্ম তারিখ। আমার জন্মের পরের বছরই দেশজুড়ে বিধ্বংসী যুদ্ধের আবহ; ব্যাংক থেকে আমার প্রথম স্বত্বাধিকারীর হাতে আমি যখন এসে পৌঁছলাম চারপাশের পরিবেশে তখন বারুদের গন্ধ, আর শোনা যায় পূর্ববঙ্গ থেকে আগত শরণার্থীদের কান্নার স্বর।

জন্মের পর মুহূর্তেই এই ঘোর বাস্তবকে প্রত্যক্ষ করে আমি উপলব্ধি করেছিলাম কত নির্মম এই মানব সভ্যতা। তারপর আমি কত হাত ফিরেছি, কত মানুষের কত সুখ, কত দুঃখ, কত আনন্দের সাক্ষী হয়েছি তার হিসাব রাখতে পারিনি কখনোই। আমি দেখেছি ‘৭৫ এর জরুরী অবস্থায় ভয়ার্ত মানুষকে আমায় পকেটে সম্বল করে দিনযাপন করতে। আমি দেখেছি বন্যা, খরা; আমি জন্ম দেখেছি, আমি মৃত্যু দেখেছি। আমি মানুষের শ্মশানবন্ধু হয়েছি, আবার হয়েছি কবরে জ্বালানোর মোমবাতি কেনার সহায়। 

একটি স্মরণীয় ঘটনা:

আমার জীবন এতই ঘটনাবহুল যে সব ঘটনা মনে রাখার মতন সাধ্য কিংবা দুঃসাধ্য কোনটাই আমার নেই। তবুও কিছু কিছু ঘটনার কথা মনের গহনে প্রোথিত থেকে যায় চিরকাল। আমার জীবনেও এমন ঘটনার উদাহরণ বিরল নয়। তেমনি একটি ঘটনার কথা আজও প্রায়ই মনে পড়ে। তখন আমি জীবনের অনেকখানি পার করে এসেছি। আমার স্বত্বাধিকারী সে সময় এক বড় অফিসের পদস্থ কর্মচারী। একদিন অফিস থেকে বাড়ি ফিরে তিনি জানতে পারলেন তার একমাত্র সন্তান বিদ্যালয়ে পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছে।

সেদিন সেই পিতার চোখে আমি যে আনন্দাশ্রু দেখেছিলাম, তা ভোলার নয়। সম্ভবত ইতিপূর্বে তার সন্তানকে কোন এক প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল। সকল প্রতিকূলতা কাটিয়ে বিদ্যালয়ের পরীক্ষায় তার এই ফলাফল একজন পিতাকে কতখানি আনন্দ দেয়, তা সেদিন বুঝতে পেরেছিলাম। তারপর সেই মানুষটি তাঁর একমাত্র কন্যাকে কাছে ডেকে নিজের পকেট থেকে আমায় বার করে তার হাতে তুলে দিয়ে বলেছিলেন, “এইটা তোমার ভালো ফলাফলের প্রথম পুরস্কার”। সেই ছোট্ট বালিকার উজ্জ্বল চোখে সেদিন আমি যে আনন্দ দেখেছিলাম, তা বলে বোঝানো যায়না।

এখন আমি:

সেই ছোট্ট বালিকা অনেক দিন অবধি আমায় তার ব্যাগের ভেতর সযত্নে রেখে দিয়েছিল। কিন্তু টাকার সার্থকতা তো সংরক্ষণে নয়, বরং তার ব্যবহারে। আমার সেই ছোট্ট স্বত্বাধিকারীরও আমাকে ব্যবহারের দিন এলো অবশেষে। তার হাত থেকে বহু হাত ঘুরে বর্তমানে আমি এসে পড়ে রয়েছি একটি মুদিখানার দেরাজের এক কোণে। দীর্ঘ ৫০ বছরের এই জীবনে আমার শরীরে অসংখ্য জীর্ণতার ছোপ লেগেছে, শরীর হয়েছে মলিন।

বিভিন্ন মানুষ আমার শরীরে আঁকিবুকি কেটেছে বহু বার, তাদের সেই আঁকিবুকির কারুকাজ আমার গায়ে চিরদিনের জন্য স্থায়ী হয়ে গিয়েছে। আমার নানা পাশে এখন ফুঁটো, ছেঁড়াখোঁড়া। আমার দিকে এখন আর মানুষের চোখ যায় না, শুধু একান্ত প্রয়োজনে খুচরো পয়সার অভাবে মানুষ হাতে তুলে আমায় ব্যবহার করে।

আমার অতীত ও বর্তমান:

নিজের অতীত ও বর্তমানের মধ্যে এমন তুল্যমূল্য আলোচনা করার দুঃসাহস দেখানো হয়তো আমার মতন অচল টাকার পক্ষেই সম্ভব। জীবনের এই দীর্ঘ অবসরে অন্ধকার দেরাজের একটি কোণে পড়ে আমি এখন ভাবি জীবনে আমি কি ছিলাম, কি হয়েছি। এইতো সময়ের খেলা; সময়ের দোলাচলে পরম মূল্যবানও হয়ে যায় মূল্যহীন। যে আমি মানুষের কাছে একদিন আনন্দের বার্তা বাহক হয়ে আসতাম, সেই আমি বর্তমানে মানুষের কাছে অযাচিত, অগ্রহণীয়।

যে আমাকে ব্যবহার করে মানুষ একদিন তার খুশির সওদা করতে পারত, সেই আমার ব্যবহার আজ প্রায় উঠে যেতে বসেছে। যে আমাকে একদিন হাতে পেয়ে খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল এক বালিকার চোখ, সেই আমিই এখন মানুষের ভ্রূকুঞ্চনের কারণ। তবু আমি নিজের এই জীবন নিয়ে এতোটুকু আফসোস করি না। কারণ আমি জানি এই তো সৃষ্টির নিয়ম, জীবনের উদ্দেশ্য সাধনের পর অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়া। আমি তো এই মহাসৃষ্টিরই ক্ষুদ্র একটি অংশ মাত্র; নিয়মের বিরূপ হব কি উপায়ে! 

উপসংহার:

এই পৃথিবীতে যার যা উদ্দেশ্য নিয়ে আবির্ভাব হয়, সেই উদ্দেশ্য পূরণের মধ্যেই তার জীবনের সার্থকতা নিহিত থাকে। সৃষ্টির এই রঙ্গমঞ্চে আমার জন্ম হয়েছিল মানুষের উপাদানের মূল্য হিসেবে। আমি আমার সমগ্র জীবন দিয়ে, যতটুকু সম্ভব নিজের জীবনের সেই উদ্দেশ্যকে সার্থক করার চেষ্টা করে গিয়েছি প্রতি মুহূর্তে।

তারপর এখন আমি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাই, কিংবা মানুষের কাছে মূল্যহীন হয়ে পড়ি; কোন কিছুতেই আমার আর দুঃখ নেই। আমি শুধু চাই মানুষের জীবনে নিজের জীবন দিয়ে যে ভূমিকাটুকু আমি পালন করে এসেছি, সেটুকুকে মানুষ মনে রাখুক চিরকাল। বাকি আমি জানি, খুব শীঘ্রই এ বিশ্ব থেকে লোপ পাবে আমার অস্তিত্ব, লুপ্ত হবে আমার চেতনা। কবির ভাষায়- 

মিটিয়ে দেব লেনা দেনা,
বন্ধ হবে আনাগোনা এই হাটে–
তখন আমায় নাইবা মনে রাখলে,
তারার পানে চেয়ে চেয়ে নাইবা আমায় ডাকলে।


একটি টাকার জীবনের অভিজ্ঞতার ওপর যতটুকু আলোকপাত করা সম্ভব, উক্ত প্রবন্ধটিতে আমাদের সাধ্যমত তার সবটুকু প্রচেষ্টা আমরা করেছি। তদুপরি এই প্রবন্ধে পরীক্ষার প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে নির্দিষ্ট শব্দসীমা বজায় রাখারও চেষ্টা করা হয়েছে। আশাকরি আমাদের এই প্রয়াস আপনাদের ভাল লেগেছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তা যথাযথভাবে আপনাদের সহায়তা করতে পারবে।

উপরিউক্ত প্রতিবেদনটি সম্পর্কে আপনাদের মতামত কমেন্টের মাধ্যমে বিশদে আমাদের জানান। আপনাদের মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চেষ্টা করব আপনাদের মতামত অনুযায়ী আমাদের লেখনীকে আরও উন্নত করে তোলার। তাছাড়া যদি এমনই অন্য কোন রচনা পড়তে চান সে বিষয়েও আমাদের অবগত করুন। আমরা অতি সত্বর সেই রচনাটি আপনার কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করব। ধন্যবাদ।

Print Friendly, PDF & Email

রাকেশ রাউত

রাকেশ রাউৎ বাংলা রচনা ব্লগের নির্বাহী সম্পাদক। ইনি শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী একজন মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার। ইনি বাংলা রচনার সম্পাদকীয় দলকে লিড করেন। রাকেশ দীর্ঘ ৫ বছর যাবৎ বাংলা কনটেন্ট এডিটিং এর সাথে যুক্ত আছেন। ইনি বাংলা রচনা ছাড়াও নামকরণ এবং বাংলা জীবনীর মতো নামকরা সাইটের সম্পাদকীয় দলের একজন অন্যতম সদস্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট