দেখে নিন ইংরেজিতেও রচনা

একটি ঝড়ের রাত রচনা / একটি ঝড়ের অভিজ্ঞতা রচনা [সঙ্গে PDF]

অনেক ঝড়ের রাত্রির সাক্ষী থেকেছি আমরা। আশ্বিনের অকাল ঝড় বা কালবৈশাখীর তুলুম তাণ্ডব দেখার অভিজ্ঞতা আমাদের সকলেরই আছে। এমনই ঝড়ের রাতের অভিজ্ঞতা নিয়ে আজকের বিষয় একটি ঝড়ের রাত রচনা / একটি ঝড়ের অভিজ্ঞতা রচনা।

একটি ঝড়ের রাত রচনা

ভূমিকা:

এই পৃথিবীতে যত রকমের প্রাকৃতিক বিপর্যয় আছে তার মধ্যে অন্যতম হলো ঝড়। সেই সুপ্রাচীন কাল থেকে মানুষ ঝড়কে একদিকে যেমন ভয় করেছে, অন্যদিকে তেমন উপাসনা করেছে। ঝড়ের থেকে বাঁচার জন্য অবলম্বন করেছে বিভিন্ন উপায়। কিন্তু ঝড় যখন আসে তার সামনে পড়লে মানুষ আজও অসহায় হয়ে পড়ে। সন্ধান করে একটু নিরাপদ আশ্রয়ের। এই পৃথিবীতে শক্তিশালী ঝড়ের সামনে সবকিছু তছনছ হয়ে যায়।

সাগরের উপর থেকে সৃষ্টি হয়ে ভূমিতে এসে ঝড় যেন পৃথিবীকে বুঝিয়ে দেয় যে মানব সভ্যতা উন্নতির যে শিখরেই যাক না কেন প্রকৃতির কাছে তা আজও অতি তুচ্ছ এবং নগণ্য। যদিও বর্তমানকালে বিভিন্ন আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিকে কাজে লাগিয়ে নানা উপায় অবলম্বন করে সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হচ্ছে।

এই ব্যবস্থায় ঝড়কে প্রতিরোধ করা না গেলেও, অগ্রিম পূর্বাভাসের মাধ্যমে ঝড়ের যথাসম্ভব মোকাবিলা এবং ক্ষতির পরিমাণ বহুল পরিমাণে হ্রাস করা গেছে। কিন্তু তবুও ঝড়ের ধ্বংসাত্মক শক্তিকে রোধ করা আজও অসম্ভব। এমন এক একটি ঝড় মানুষের জীবনে এসে একটি সাজানো-গোছানো জীবনকে তছনছ করে দিতে পারে। তেমনি একটি ঝড় অতি সম্প্রতি এসেছিল আমার জীবনেও, যা আবার সমকালীন জীবনের গতি প্রকৃতিকে ওলট-পালট করে দিয়েছিল। 

ঝড়ের পূর্বাভাস:

আমি ভারতবর্ষের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার কাকদ্বীপ অঞ্চলের একজন বাসিন্দা। ঝড়, নদী বাঁধ ভেঙে যাওয়া, বন্যা ইত্যাদির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে আমি ভীষণভাবে পরিচিত। বছরে অন্তত দুই থেকে তিনবার এই ধরনের সমস্যার সাথে মোকাবিলার জন্য আমাদের এখানকার মানুষকে তৈরি থাকতে হয়।

কিন্তু এই বারের যে বিধ্বংসী দানব আমাদের ওপর দিয়ে বয়ে চলে গেল তার জন্য আমরা মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। কয়েকদিন আগে থেকেই টিভি ও রেডিওতে ঘোষণা শুনতে পেয়েছিলাম আম্ফান নামের একটি ঘূর্ণিঝড় আমাদের পশ্চিমবঙ্গের দিকে ধেয়ে আসছে। সেই ঘোষণা থেকেই জানতে পেরেছিলাম পূর্বের অন্যান্যগুলির তুলনায় অধিক শক্তি নিয়ে এই ঝড় উপকূলে আছড়ে পড়বে। সেই মতন প্রস্তুতিও নিয়ে ছিলাম আমরা সবাই। 

ঝড়ের আগের মুহূর্ত:

প্রতিবার ঝড়ের আগের মুহূর্তগুলি খুব একঘেয়ে এবং গুমোট ধরনের হলেও এইবারের ঝড়ের পূর্বমূহুর্তের পরিবেশ ছিল অস্বাভাবিক রকমের নিস্তব্ধ এবং শুনশান। দুপুর বেলা বৃষ্টির পর থেকে একটা অস্বাভাবিক রকমের গুমোট গরম হাওয়া বয়ে এসে গোটা পরিবেশের মধ্যে হাঁপ ধরিয়ে দিচ্ছিল। তারপর সন্ধ্যে থেকে সেদিন চারপাশে পাখিদের কলকাকলি নেই, ঘরে ফেরা নেই। সন্ধ্যের পর থেকে শোনা যাচ্ছিল না ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। চারিদিক  অস্বাভাবিক রকমের নিস্তব্ধ। কোথাও কোন আওয়াজ নেই, শুধু মাঝেমধ্যে কোথা থেকে শনশন হাওয়ার আওয়াজ এসে মনের মধ্যে একটা অদ্ভুত ভীতির সঞ্চার করছিল। 

আছড়ে পড়লো আম্ফান:

তখন রাত প্রায় পৌনে দশটা। দূর থেকে বয়ে আসা হাওয়ার শব্দ ক্রমশ তীব্র হচ্ছিল। আগে থেকেই বন্ধ করে রাখা ঘরের কাচের জানালার শার্সিতে বাতাসের আঘাতে ঝনঝন শব্দ হচ্ছিল। ঘরের ঘুলঘুলি দিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়া বাতাসের চাঞ্চল্যে অনুভব করছিলাম বাইরে ঘটে চলা ঝড়ের তীব্রতা।

বাবা অন্যঘরে টিভিতে দৈনিক সংবাদ অনুষ্ঠান দেখছিলেন। সেখানে শোনা গেল পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতার দিকে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি চালিয়ে আম্ফান এবার ধেয়ে আসছে দক্ষিণ উপকূলের দিকে। মনে ভয় ক্রমশ পুঞ্জিভূত হচ্ছিল। এমন সময় হঠাৎ আকাশটা বীভৎস আর্তনাদ করে মেঘ গর্জন করে উঠল। তার প্রায় সাথে সাথেই বাইরে একটা বীভৎস আওয়াজ করে আমাদের গোটা পাড়ার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।

অন্ধকারে ঝড়ের তান্ডবলীলা:

বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার পর মা যখন হ্যারিকেন জ্বালালেন, তখন ঝড় শুরু হয়ে গেছে পুরোদমে। সেইসঙ্গে শুরু হয়েছে অঝোর ধারায় বৃষ্টি। চারপাশে ততক্ষণে অথৈ জল জমে গেছে। আমাদের ঘরে জল ঢুকে ভেসে গেছে প্রায়। আমরা কোন রকমে সবাই মিলে খাটের উপর উঠে বসে রয়েছি।

সেই সময় খবর পেলাম বাইরে ইলেকট্রিক ট্রান্সফর্মারে বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে শর্ট-সার্কিট হয়েছে। এই বীভৎস ঝড় জলের মধ্যেও সেই ট্রান্সফর্মার থেকে আগুনের ফুলকি ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। ঘরের বারান্দা দিয়ে সেই ফুলকির আলো আমাদের চোখে পড়ছিল। হাতের মোবাইলের দিকে তাকিয়ে দেখলাম তাতে বিন্দুমাত্র নেটওয়ার্ক নেই। অতএব কোন বিপদে পড়লে ফোন করে সাহায্য চাওয়ার মতন বিকল্পটুকুও হাতে রইল না।

আশ্রয়হীন একটি রাত:

এইভাবে সময়ের সাথে ঝড়ের তীব্রতা বাড়তে বাড়তে একসময় এমন এক পর্যায়ে পৌঁছালো যখন আমাদের ঘরের জানালা বন্ধ রাখা আর সম্ভব হচ্ছিল না। হঠাৎ করে জানলার উপর বীভৎস ঝড়ের ঝাপটা পড়ে জানালার কব্জাগুলি ভেঙে উপড়ে খুলে এলো। খোলা জানালার ভিতর দিয়ে হু হু করে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল ঝড়ো হাওয়া।

এমন সময় বুঝতে পারলাম মাথার ওপরের টিনের ছাউনিটাও টলমল করছে। খানিকক্ষণ পরে ঝোড়ো হাওয়ার বীভৎস চাপে ভীষণ শব্দ করে সেই ছাউনিটুকুও আর রইল না।  ঘরের ভেতর আমরা সবাই ভিজে চুপচুপে। ঝড়ের বীভৎস হাওয়ায় সবাই ঠকঠক করে কাঁপছি, আর অন্যদিকে মাথার উপর ভীষণ আওয়াজে মাঝেমধ্যেই মেঘ গর্জন করে উঠছে।

পাড়ার চারপাশ থেকে বিভিন্ন রকম আওয়াজ কানে আসছে। কোথাও বাড়ি ভাঙার শব্দ, কোথাও গাছ ভেঙে পড়ার শব্দ। আর আমরা আমাদের প্রাণ হাতে করে বিষম ঝড়ের মধ্যেখানে একলা বসে রয়েছি। চারপাশের ঘন অন্ধকার, হ্যারিকেন ঝড়ের দাপটে কোথায় উড়ে গিয়েছে জানিনা।

নিদ্রাহীন রাত্রি:

সেদিনের রাত আমাদের কাছে ছিল অভিশপ্ত। ঘুম তো দূরের কথা, পরবর্তী দিনের সকালের আলো দেখতে পাবো কিনা সে বিষয়ে তখন আমাদের মনে ঘোর সন্দেহ। বাবা কাউকে খাট থেকে তখন নামতে বারণ করেছেন। ঘরের দু’পাশের দরজা-জানালা কিছুই তখন আর আস্ত নেই।

কিছুক্ষণের জন্য ঝড় থামছে, আবার মুহুর্তের মধ্যে দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে আছড়ে পড়ছে আমাদের ওপর। আমাদের সকলের সজাগ দৃষ্টি সে সময় আকাশের দিকে। সকলের সময় জ্ঞান তখন হারিয়ে গিয়েছে। অন্ধকারে ঘড়িতে কটা বাজে তাও দেখতে পাইনি। 

ঝড় পরবর্তী অনুভূতি:

ঝড়ের এই বীভৎস তাণ্ডবলীলা কতক্ষণ চলেছিল জানিনা। হয়তো তখন প্রায় মাঝ রাত, যখন আমাদের উপর দিয়ে ঝড়ের শেষ ঝাপটা বীভৎস বেগে পার হয়ে গেল। ঘরে তখন প্রায় কোমর জল। খাট আসবাবপত্র সব জলের তলায় ডুবে গিয়েছে। বৃষ্টি তখনো টিপটিপ করে পড়ছে, আকাশে বিদ্যুতের ঝলকানি তখনো বর্তমান। বাবা তার মধ্যেই আমাদের নিয়ে অতি সাবধানে রাস্তায় বেরোলেন।

চারদিক থেকে দেখতে পেলাম সকল পরিবার একে একে রাস্তায় নেমে এসেছে। ঝড়ের দাপটে পাড়ার প্রায় সকল বাড়িগুলি বিধ্বস্ত, সকল মানুষ বিপর্যস্ত। শুনতে পেলাম বিপর্যস্ত আশ্রয়হীন মানুষদের জন্য নিকটবর্তী স্কুল বাড়িতে অস্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সবাই মিলে সেখানে চলে গেলাম। 

উপসংহার:

সেদিন রাতে আমাদের সকলের উপর দিয়ে যে দুর্যোগের মেঘ বয়ে গিয়েছিল তা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। এই বীভৎস পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পেতে আমাদের বহু দিন সময় লেগে গিয়েছিল। এই ঝড় এসে যেন আরও একবার আমাদের বুঝিয়ে দিয়ে গেল প্রকৃতির ইচ্ছার কাছে আমরা কতখানি তুচ্ছ এবং অসহায়।

শহরের যে সকল মানুষেরা ঝড়কে নিয়ে কাব্যবিলাস করেন, সেই বিলাসিতা যে একান্তই অন্তঃসারশূন্য আরো একবার আমাদের এই ব্যাপক দুর্দশার মধ্যে দিয়ে প্রমাণ হয়ে গেল। প্রকৃতি স্বভাবতই সুন্দর, কিন্তু প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের রূপ ভয়ংকরী। তাই সেই রূপকে ভয় করা যায়, উপাসনাও করা যায়, কিন্তু কাব্যে আবাহন করা যায় না।


একটি ঝড়ের রাত রচনা / একটি ঝড়ের অভিজ্ঞতা রচনাটি পড়ে আপনার কেমন লাগলো কমেন্টের মাধ্যমে আমাদের জানান। আমরা সব সময় সচেষ্ট থাকি সবার থেকে সুন্দর ও আপনার মনের মতো করে একটি রচনা তুলে ধরার। এখানে নেই এমন রচনা পাওয়ার জন্য রচনাটির নাম আমাদের কমেন্ট করে জানান। দ্রুততার সঙ্গে আমরা উক্ত রচনাটি যুক্ত করার চেষ্টা করবো। সম্পূর্ণ রচনাটি পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

Print Friendly, PDF & Email

রাকেশ রাউত

রাকেশ রাউৎ বাংলা রচনা ব্লগের নির্বাহী সম্পাদক। ইনি শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী একজন মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার। ইনি বাংলা রচনার সম্পাদকীয় দলকে লিড করেন। রাকেশ দীর্ঘ ৫ বছর যাবৎ বাংলা কনটেন্ট এডিটিং এর সাথে যুক্ত আছেন। ইনি বাংলা রচনা ছাড়াও নামকরণ এবং বাংলা জীবনীর মতো নামকরা সাইটের সম্পাদকীয় দলের একজন অন্যতম সদস্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট