দেখে নিন ইংরেজিতেও রচনা

উৎসবে ধর্মনিরপেক্ষতা রচনা [সঙ্গে PDF]

বর্তমান বিশ্বে বিভিন্ন স্থানে উৎসব এবং ধর্মের যোগাযোগ নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে একাধিক উত্তপ্ত বিতর্কের। উৎসবের সার্বিক চরিত্র প্রকৃতপক্ষে কেমন হওয়া উচিত: ধর্মভিত্তিক নাকি, ধর্মনিরপেক্ষ, নাকি অন্য কোন প্রকার তা নিয়ে বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক মতানৈক্য রয়েছে। এই সকল ধারণা এবং মতানৈক্যকে মূল্যমান নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে থেকে বিশ্লেষণ করে প্রাসঙ্গিকভাবে উপস্থাপন করার উদ্দেশ্যেই এই প্রতিবেদনটির অবতারণা।

উৎসবে ধর্মনিরপেক্ষতা রচনা বৈশিষ্ট্য চিত্র

ভূমিকা:

ধর্ম যার যার, উৎসব সবার“- বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশে এই উক্তিটি যে কোনো উৎসবের সময় বারবার ফিরে ফিরে আসে। ফিরে ফিরে আসার পাশাপাশি এই উক্তিটি জন্ম দেয় বিভিন্ন বিতর্কেরও।

ভারতীয় উপমহাদেশে একই সাথে অসংখ্য ধর্মের সহাবস্থান এবং বছরভর অসংখ্য উৎসবের বাতাবরণেই এই লাইনটির প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে পাওয়া যায়। তবে উৎসব এবং ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে বিশ্বব্যাপী বিতর্কের অবকাশ এখানেও থেকে যায়। সেই বিতর্ক এবং উৎসবে ধর্মের স্থান তথা ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে যথাসম্ভব সুসংবদ্ধ আলোচনার উদ্দেশ্যই এই প্রতিবেদনের উপস্থাপনা।

উৎসব কি?

উৎসবে ধর্মনিরপেক্ষতাকে বুঝতে হলে উৎসব এবং ধর্মনিরপেক্ষতা এই দুটি পৃথক শব্দকে আলাদা আলাদা করে প্রথমে বোঝা প্রয়োজন। আলোচনার প্রথমে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে উৎসব আসলে কি। সৃষ্টির আদিতে মানুষ যখন বর্তমান যুগের মতন আধুনিকমনস্ক হয়ে ওঠেনি, সেই সময় কখনো অলৌকিক ধারণা, কখনো ভয় কিংবা কখনো নিছক আনন্দের উদ্দেশ্যে মানুষ যে সমবেত উদ্যোগের আয়োজন করত, সেই উদ্যোগগুলিই সময়ের সাথে সাথে মানুষের জীবনযাত্রার অঙ্গীভূত হয়ে যায়।

কালের স্রোতে জীবনযাত্রা হয়ে ওঠে ধর্ম এবং উৎসব হয়ে ওঠে সেই নির্দিষ্ট জীবনযাত্রা বা ধর্মের অঙ্গ। ফলে আধুনিক যুগে উৎসবের উৎস হিসেবে পরিচিতি পায় ধর্ম। তবে প্রকৃতপক্ষে উৎসব হলো কোন একটি নির্দিষ্ট আয়োজনকে কেন্দ্র করে অনেক মানুষের একত্র সমবেত আনন্দের বাতাবরণ। সেই আনন্দের সাথে ধর্মীয় আচার জড়িয়ে থাকতে পারে ঠিকই, কিন্তু আনন্দই তার মুখ্য বিষয়; ধর্ম নয়।

ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণা:

ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণাকে বুঝতে পারলে উৎসবে ধর্মনিরপেক্ষতাকে বোঝা অনেক বেশি সহজ হয়ে যায়।  আর ধর্মনিরপেক্ষতাকে বোঝার প্রয়োজনে সর্বপ্রথম জানা প্রয়োজন ধর্ম আসলে কি। ধর্ম শব্দটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘ধৃ’ ধাতু থেকে। এর অর্থ হল যাকে ধারন করা হয়। মানুষ তার জীবন দিয়ে পরিস্থিতির প্রয়োজন অনুযায়ী নিজের জীবনযাত্রাকে ধারণ করে। অর্থাৎ এই অর্থে মানুষের জীবনযাত্রাই মানুষের ধর্ম।

কিন্তু সময়ের সাথে সাথে ধর্মের এই প্রগতিশীল ধারণা বদলে গিয়ে ধর্ম একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। প্রাচীন পরিস্থিতির ধ্যান ধারণা এবং মতামত অনুযায়ী আধুনিক বিশ্বে চলতে গিয়ে বারবার জীবনযাত্রার সাথে তৈরি হয় ধর্মের সংঘাত। সে কারণেই প্রয়োজন হয়েছে ধর্ম নিরপেক্ষতার ধারণা কে উদ্ভাবন করবার।

ধর্ম নিরপেক্ষতা হলো ব্যক্তিগত স্তরে নিজের ধর্ম পালন এবং অপরের ধর্ম পালনের স্বাধীনতাকে স্বীকার এবং সম্মান প্রদর্শন। তবে এই ধর্ম নিরপেক্ষতা ধারণাকে রাষ্ট্রীয় মতাদর্শের স্তরে প্রযুক্ত করার সময় বেশিরভাগ পশ্চিমী রাষ্ট্রগুলি নিজেকে ধর্ম সংক্রান্ত বিষয় থেকে সম্পূর্ণ পৃথক করে ফেলেছে। সেক্ষেত্রে রাষ্ট্র মানুষের ধর্ম পালনের ব্যাপারে কোন প্রকার হস্তক্ষেপ করে না।

ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে ধর্মনিরপেক্ষতা:

তথাকথিত আধুনিক এই ধর্ম নিরপেক্ষতার ধারণা একান্তই ইউরোপীয় সংস্কৃতি থেকে আগত। ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে ধর্ম বরাবরই জীবনযাত্রার সমার্থক। পৃথিবীর এই অংশে প্রাচীনকাল থেকে ধর্ম কোন নির্দিষ্ট মতাদর্শ অনুযায়ী পরিচালিত হয় না। ধর্ম পালন কে মানুষের তাত্ত্বিক চিন্তা এবং বিশ্লেষণমূলক স্বাধীনতার পর্যায়ে তুলে নিয়ে গিয়েছে ভারতভূমির সংস্কৃতি।

সে কারণেই ভারতবর্ষে প্রাচীনকাল থেকে অসংখ্য ধর্ম থাকা সত্বেও মধ্যযুগের প্রাকমুহূর্ত পর্যন্ত ধর্মীয় মতাদর্শের সংঘাতের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য। সনাতন ভারতীয় ঐতিহ্য মানুষের মুক্তচিন্তার স্বাধীনতায় বিশ্বাস করায় একই সংস্কৃতির মধ্যে বিভিন্ন জীবন-যাত্রার অনুসরণে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন মতাদর্শ এবং ধর্ম। ভারতবর্ষে পাশ্চাত্য ধর্ম নিরপেক্ষতার ধারণা অচল এবং সে কারণে রাষ্ট্রপরিচালনার ক্ষেত্রেও প্রশাসন ধর্মের থেকে বিচ্ছিন্ন নয় বরং নিরপেক্ষ।

ভারতীয় ঐতিহ্য:

সেই সুপ্রাচীন কাল থেকে সাবেকি ভারতীয় জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো উৎসব। সমগ্র ভারতবর্ষ অসংখ্য বৈচিত্র্যমন্ডিত হওয়ার ফলে সারা বছরজুড়ে এখানে উৎসবের আনাগোনা লেগেই থাকত এবং এই সকল উৎসব মূলত ধর্মভিত্তিক হতো না, হত সংস্কৃতিভিত্তিক। সে কারণে ভিন্ন মতাদর্শে বিশ্বাসী ভিন্ন জীবনধারার মানুষেরা একই সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হয় সাংস্কৃতিক উৎসবে অংশগ্রহণ করত।

সেই উৎসবে ধর্মীয় আচারের বাহুল্য ছিল কম, বরং আনন্দ সংস্কৃতির বাহুল্য ছিল বেশি। তবে সময়ের সাথে সাথে ভারতীয় উপমহাদেশে ধর্ম যখন সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন মানুষের মনও সাংস্কৃতিক উৎসবকে সংকীর্ণ ধর্মের পর্যায়ে নামিয়ে আনে; যা অত্যন্ত বিপদজনক এবং পশ্চাৎপদগামী। 

আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণে উৎসব ও ধর্ম:

আন্তর্জাতিক বিশ্ব: বিশেষ করে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলি, ধর্ম পালনের তুলনায় বর্তমানে উৎসবে বেশি গুরুত্ব দেয়। তারা উৎসব এবং ধর্মকে সম্পূর্ণ পৃথক করে দেখতে শিখেছে। তাদের কাছে উৎসবে ধর্মের ছোঁয়া থাকলেও, সেখানে আনন্দটাই মুখ্য। তবে ইউরোপীয় সংস্কৃতিতে মানসিক চিন্তা ও প্রবণতাকে কম গুরুত্ব দেওয়ার ফলে সেখানকার উৎসবে আনন্দের তুলনায় উদযাপনের উন্মাদনা খানিক বেশি।

এই উন্মাদনা প্রভাবিত করে মানুষের ব্যক্তিগত মানসিক স্তরকেও। তবে ইউরোপের দেশগুলিতে আমরা দেখতে পাই মানুষ সর্ব ধর্ম নির্বিশেষে পালন করছে ইস্টার উৎসব, ক্রিসমাস উইক। বড়দিনে সপরিবারে ধর্মের কথা চিন্তা না করে মানুষ রাস্তায় বের হচ্ছে, যাচ্ছে গির্জা পরিদর্শনে।

এক কথায় তারা ধর্মের কথা ভুলে সর্বতোভাবে অংশগ্রহণ করছে এমন একটি উৎসবে, যার উৎস হিসেবে চিহ্নিত হল খ্রিস্টধর্ম। সংকীর্ণ মানসিকতাকে অতিক্রম করে মানুষের এই উদ্যোগকে শত উন্মাদনার অবস্থান সত্বেও স্বাগত জানাতেই হয়।

ধর্মনিরপেক্ষতা ও উৎসব; বিতর্ক:

উৎসবে ধর্মনিরপেক্ষতা বিষয়টিকে কেন্দ্র করে পৃথিবীতে একটি মানবিক মানসিকতার উদ্ভাবন যেমন হয়েছে, তেমনি উদ্ভূত হয়েছে অসংখ্য বিতর্কও। এ বিতর্কগুলি বর্তমানে শুধুমাত্র বিতর্ক সভার স্তরে আটকে না থেকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করছে ব্যক্তিমানুষকেও। উৎসব ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হওয়া বিতর্কে মানুষ মোটামুটি দুটি ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছে।

তার একদল মনে করে উৎসবের উৎস যখন ধর্ম, তখন উৎসব যার যার, ধর্মও তার তারই হওয়া উচিত। কারণ তাদের মতে এক ধর্মের মানুষ অন্য ধর্মের উৎসবে শারীরিক, মানসিক এবং আর্থিক ভাবে অংশগ্রহণ করলে আদপে ধর্মেরই ক্ষতি হয়। তাদেরই কেউ কেউ আবার মনে করেন সমাজে ধর্মীয় উৎসবের সুসংগত পৃথকীকরণ না থাকলে বৈচিত্র্যের প্রকৃত সহাবস্থান থাকতে পারেনা। এবং যার ফলে সংস্কৃতি অপসংস্কৃতিতে পরিণত হয়।

তবে উৎসবে ধর্মনিরপেক্ষতা বিতর্কে অপর গোষ্ঠী মনে করে উৎসবের প্রকৃত উৎস ধর্ম নয়, বরং জীবনধারা। দীর্ঘ দিনের অভ্যাসে কোন নির্দিষ্ট স্থানের জীবনধারা তথা জীবন সংস্কৃতিই ধর্ম দাঁড়া সংজ্ঞায়িত হয়েছে। মানুষই তখন উৎসব কে যুক্ত করেছে ধর্মের সঙ্গে। প্রকৃতপক্ষে সেই ধর্মের পরিচিতি অপরিবর্তনীয় সঙ্কীর্ণতায় নয়, বরং চিন্তাশীল পরিবর্তনীয় প্রগতিশীলতায়।  তাই উৎসব এর মুখ্য উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আনন্দ, এবং আনন্দ সর্বদাই ধর্মহীন।

উপসংহার:

পৃথিবীজুড়ে বর্তমানকালে চলেছে এক অস্থির সময়। বিশ্বজুড়ে নতুন ধরনের জীবন-যাত্রার ফলে উদ্ভূত হচ্ছে একের পর এক সমস্যা, যে সমস্যাগুলিকে সকলে মিলে সর্বতোভাবে মোকাবিলা করার প্রয়োজন আছে। যে কোন উৎসব সেই সার্বিক ঐক্যের বন্ধন তৈরিতে সহায়তা করে।

এমত পরিস্থিতিতে ধর্মকে অপরিবর্তনীয় এবং সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ করে রাখলে প্রকৃত পক্ষে ক্ষতি সমগ্র সমাজেরই। বরং সৃষ্টির অমোঘ নিয়ম অনুযায়ী উৎসবের হওয়া প্রয়োজন সংস্কৃতিভিত্তিক। তাই কথায় বলে:

সুশিক্ষিতের সংস্কৃতিই তার ধর্ম;
আর অপশিক্ষিতের ধর্মই তার সংস্কৃতি।’


‘উৎসবে ধর্মনিরপেক্ষতা’ শীর্ষক উপরিউক্ত এই প্রবন্ধে আমরা সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে প্রাসঙ্গিক সবকটি দিককে যথোপযুক্ত গুরুত্বসহকারে বিশ্লেষণাত্মক ভঙ্গিতে আলোচনার চেষ্টা করেছি। তাছাড়া পরীক্ষার প্রয়োজন অনুযায়ী উক্ত প্রবন্ধটিতে একটি সাধারণ শব্দসীমা বজায় রাখারও যথাসম্ভব চেষ্টা করা হয়েছে।

আশাকরি আমাদের এই প্রয়াস আপনাদের ভাল লেগেছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তা যথাযথভাবে আপনাদের সহায়তা করতে পারবে। উপরিউক্ত প্রতিবেদনটি সম্পর্কে আপনাদের মতামত কমেন্টের মাধ্যমে বিশদে আমাদের জানান। আপনাদের মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা চেষ্টা করব আপনাদের মতামত অনুযায়ী আমাদের লেখনীকে আরও উন্নত করে তোলার। তাছাড়া যদি এমনই অন্য কোন রচনা পড়তে চান সে বিষয়েও আমাদের অবগত করুন। আমরা অতি সত্বর সেই রচনাটি আপনার কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করব। ধন্যবাদ।

Print Friendly, PDF & Email

রাকেশ রাউত

রাকেশ রাউৎ বাংলা রচনা ব্লগের নির্বাহী সম্পাদক। ইনি শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী একজন মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার। ইনি বাংলা রচনার সম্পাদকীয় দলকে লিড করেন। রাকেশ দীর্ঘ ৫ বছর যাবৎ বাংলা কনটেন্ট এডিটিং এর সাথে যুক্ত আছেন। ইনি বাংলা রচনা ছাড়াও নামকরণ এবং বাংলা জীবনীর মতো নামকরা সাইটের সম্পাদকীয় দলের একজন অন্যতম সদস্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট